নিজের ক্রয়কৃত জমির ভাগ না দেয়ায় গ্রাম্য মাতব্বরদের নানা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছেন গ্রামের নয়টি পরিবার। ষড়যন্ত্রের কৌশল হিসাবে সালিশ ডেকে একটি পরিবারকে করা হয়েছে সমাজচ্যুত।
সমাজচ্যুত পরিবারের সাথে সম্পর্ক না রাখতে আত্মীয়স্বজনদের দেয়া হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। এমনকি কথা বললেও সামাজিক দণ্ড পেতে হবে বলে রয়েছে অদৃশ্য আইন। তাই পঞ্চায়েতের এমন সিদ্ধান্ত না মানায় সমাজচ্যুতি বরণ করে গ্রামছাড়া হয়েছেন নয় পরিবারে সদস্যরা। ঘটনাটি জামালগঞ্জ উপজেলার সাচনা বাজার ইউনিয়নের চানপুর গ্রামের।
জানা যায়, এক বছর আগে চানপুর গ্রামের দক্ষিণপাড়া নিবাসী ভরত চন্দ্র তালুকদারের নামে পশ্চিম চানপুর মৌজার ৪৯ নং জেএল সংক্রান্ত ১৮৪ খতিয়ানের ৮২ নং দাগের ১ একর ২ শতক জমি, একই খতিয়ানের ৩৫৯ নং দাগের ২ একর জমি, ৩৮১ নং দাগের ৭ একর ৫৩ শতক সহ মোট ১০ একর জমি রয়েছে। এই জমি তিনি অন্যের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন। জমি কিনতে গ্রামের মাতব্বরদের আপত্তি ছিল। জমি কেনার পর মাতব্বরদের দাবির প্রেক্ষিতে একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্রামবাসীকে কিছু জমি দান করেন ভরত চন্দ্র তালুকদার। জমি দানের পরও মাতব্বরদের দাবি পূরণ হয়নি। শুরু হয় ভরত চন্দ্র তালুকদার ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র। একে একে ৯ পরিববারকে করা হয় সমাজচ্যুত।
সরেজমিনে চানপুর গ্রামে গিয়ে সমাজচ্যুত ৯ পরিবারের প্রায় ১১টি ঘরে তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। তারা কোথায় আছে, কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, এমন নানা প্রশ্নের উত্তর জানতে পাশের বাড়ির বাসিন্দা আরতি বিশ্বাস, বাসন্তী সরকার, শিখা তালুকদারসহ অনেকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে কেউ মুখ খুলতে রাজি নান। সারা গ্রাম পুরুষশূন্য। ঘরে ঘরে আছেন মহিলা। অনেকের সাথে কথা বলার পরও কেউ কিছু বলতে চাননি।
দুপুর ১টায় শালমারা গ্রামে এসে পাওয়া যায় সমাজচ্যুত হওয়া আশু তালুকদার ও রাম চন্দ্র তালুকদারকে। তারা জানান, সমাজচ্যুত হওয়ার পর থেকে প্রাণনাশের ভয়ে অবস্থান নিয়েছেন শালমারা গ্রামে। ঘর-বাড়ির সব মালামাল লুটে নিয়েছে মাতব্বরেরা। গত কয়েকদিন আগে ভাই ভরত চন্দ্র তালুকদারকে রাতের বেলায় শালমারা গ্রামের রাস্তায় একা পেয়ে মারধর করেছে তারা। পরে তাকে শালমারা গ্রামের মানুষ উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেন। বর্তমানে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও বন্ধ রয়েছে। একই কথা বলেন শালমারা গ্রামের অজিত দে। শালমারা গ্রামে অবস্থান নেয়া সুনিত্রা রানী তালুকদার ও অপরজন বাসন্তী তালুকদার। তারাও মারধরের হুমকি দেয়ায় চলে এসেছেন চানপুর গ্রাম ছেড়ে।
বেলা ২টায় নিয়ামতপুর গ্রামে এসে পাওয়া যায় আরও দুইজন মহিলাকে। একজন ভরত চন্দ্র তালুকদারের স্ত্রী মিতালী রানী তালুকদার। অপরজন রামচন্দ্র তালুকদারের স্ত্রী শেফালী তালুকদার। তারা জানান, সমাজচ্যুত করার পর তাদেরকে নানা হুমকি-ধমকি দিচ্ছে মাতব্বরের লোকেরা। আত্মীয়স্বজনদের সাথে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারে না। এই জন্য তারা গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে এসেছেন সন্তানদের নিয়ে।
নির্যাতিতরা জানান, গত এক বছর আগে গ্রাম্য সালিশ ডেকে সুকৌশলে ভরত চন্দ্র তালুকদারকে আরও বেশি জমি দেয়ার জন্য প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাবে ভরত চন্দ্র তালুকদার জমি দিতে রাজি হননি। এতে ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেন মাতব্বর পান্ডব সরকার, চিতু বিশ্বাস, কৃষ্ণ বিশ্বাস, গুরু দাস তালুকদার, নিরঞ্জন সরকার, নিশি সরকার, সুজন হালদার, সুনীল বিশ্বাস, অখিল বিশ্বাস, কাঞ্চন বিশ্বাস ও বিমল বিশ্বাস। এই সালিশে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভরত চন্দ্র তালুকদারকে সমাজচ্যুত করা হয়। বন্ধ হয়ে যায় গ্রামের রাস্তা-ঘাটে চলাফেরা, জল-খাবার ও আগুন পানি। এমনকি যেখানে সেখানে পাওয়া মাত্র মারপিট করার সিদ্ধান্ত দেন মাতব্বরেরা। এমন কঠিন সিদ্ধান্ত ভরত চন্দ্র তালুকদারের স্বজনেরা মেনে নিতে পারেন নি। তাই তাকে সমাজচ্যুত করার পরও জীবীকা নির্বাহে সাহায্য করে আসছিলেন স্বজনেরা। তখন মাতব্বরগণ একে একে ৯টি পরিবারকে সমাজচ্যুত করেন।
তখন শুরু হয় কৌশলে সম্পদ ছিনিয়ে আনার নানা ষড়যন্ত্র। বাড়ি ঘরে বন্দি থাকা লোকজনকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রাণ নাশের হুমকি দেয়া হয়। এক পর্যায়ে ২-৩ জনকে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে মারধর করা হয়। নানা ষড়যন্ত্র ও হয়রানির শিকার হয়ে গ্রাম ছাড়া হয়ে পড়েন ৯টি পরিবার। এদের মধ্যে ভরত চন্দ্র তালুকদার, রাম চন্দ্র তালুকদার, লক্ষণ চন্দ্র তালুকদার, জয় চরণ তালুকদার, জয় চান তালুকদার, আশু তালুকদার, হরে কৃষ্ণ তালুকদার, পলিন্দ্র তালুকদার, বিরেন্দ্র তালুকদার। এরা পেশায় কৃষক, কেউ দিনমজুর, আবার কেউ চাষাবাদ করে জীবীকা নির্বাহ করে আসছেন।
প্রাণনাশের হুমকি দেয়ায় বাড়ি-ঘর ছেড়ে কেউ জামালগঞ্জে আবার কেউ কেউ বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়ও আশ্রয় নিয়েছেন। এই সুযোগে গৃহ পালিত পাতি হাঁস, রাজ হাঁস এবং ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে যায় তারা। সমাজচ্যুত পলিন্দ্র তালুকদারকে দেয়া সরকারী ঘরের কাজও বন্ধ রাখা হয়। এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের স্মরণাপন্ন হলেও বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়নি। এমনকি জামালগঞ্জ থানায়ও ভরত চন্দ্র তালুকদারের অভিযোগ রাখা হয়নি। একে পর এক ঘটনা করে চলেছে মাতব্বরেরা।
কয়েকদিন আগে রাতের বেলায় শালমারা গ্রামের পাশে রাস্তায় একা পেয়ে ভরত চন্দ্র তালুকদারকে বেধড়ক মারপিট করে মাতব্বরেরা। শালমারা গ্রামের মানুষ তাকে উদ্ধার করে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। একের পর এক এমন ঘটনায় পুরোগ্রাম নিরব নিস্তদ্ধ হয়ে পড়েছে। মাতব্বরদের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে নারাজ। অথচ আশপাশের গ্রামের বাসিন্দারা চানপুর গ্রামের কতিপয় মাতব্বরদের বেআইনী কর্মকান্ডে নিন্দা জানিয়ে নানা কথা বলেছেন।
শালমারা গ্রামের একাধিক ব্যক্তি জানান, চানপুরের সমাজচ্যুতদের বাড়ি-ঘর পাহাড়া দেয়ার জন্য কয়েকদিন ধরে কামলাবাজ গ্রামের মো. আবুল মিয়া ও মো. আরিফ মিয়াকে এনে রাখা হয়েছে। তারপরও প্রতিনিয়ত সম্পদের ক্ষতি করে চলেছে মাতব্বরের লোকেরা।
তবে এ ব্যাপারে উল্লেখিত পান্ডব সরকার, চিতু বিশ্বাস, কৃষ্ণ বিশ্বাস, গুরু দাস তালুকদার, নিরঞ্জন সরকারের বাড়িতে গেলে ক্যামেরার উপস্থিতি পেয়ে সটকে পড়েন বাড়ির পুরুষ সদস্যরা। এ ব্যাপারে বাড়িতে থাকা মহিলাদের সাথে কথা বলতে চাইলে এ বিষয়ে কেউ কিছু জানেন না বলে জানান।
এ ব্যাপারে জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিদ দেব বলেন, ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়েছি। এরপর আর আপডেট জানি না। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) রিপন কুমার মোদক বলেন, সমাজচ্যুত হওয়ার বিষয়টি আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। কোনো অভিযোগও আমি পাইনি। অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।
তিনি বলেন- জামালগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন, অভিযোগ দেয়া হয়েছিলো। পুলিশ ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করেছে। তারপরও ওসি ছুটিতে আছেন। তিনি ছুটি কাটিয়ে আসলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / শহীদনূর / ডি.আর




