‘বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা মহামারিতে আমেরিকার মত উন্নত দেশে মৃত্যুহার কেন বেশি ছিল?’ এ প্রশ্নের একটি ব্যাখ্য দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. শাহাদ্জ্জুামান।

 


তিনি বলেছেন, ‘‘চায়না, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া-এরকম একনায়কতান্ত্রিক দেশ গুলো করোনা মহামারি রোধে বেশ সফল হয়েছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে। এর কারণ কী? এটার সঙ্গে একটি মজার বিষয় যুক্ত রয়েছে।’’

‘‘আমেরিকার অধিকাংশ মানুষই করোনা ও আরোপিত বিধিনিষেধ মানেনি। কারণ তাদের মূলনীতিটা ছিল- তারা মনে করেছে, এটা মানবাধিকার লঙ্ঘন। ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লঙ্ঘন।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমেরিকার লোকেরা ওই সময় বলতো-‘আমি মাস্ক পরবো কি পরবো না’-এটা আমার সিদ্ধান্ত। করোনা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে তারা সেখানে প্রতিবাদ করেছে; মিছিল করেছে যে, ‘আমি লকডাউনে থাকবো না, মাস্ক পরবো না।’’

এ প্রতিবাদের মূলে তাদের যুক্তি ছিল- ‘ব্যক্তিগত ইচ্ছা, স্বাধীনতা এবং মানবাধিকার’ বলে জানান অধ্যাপক শাহাদুজ্জামান।

বলেন, ‘‘তাদের এই সামষ্টিকতার অভাবেই মৃত্যুহার বেড়েছে। এখন এটা নিয়ে ভাবার সুযোগ আছে। যখন একটা মহাবিপদ ঘটে; যখন পুরো গ্রহ একটি সংকটের ভিতরে পড়ে, তখন ব্যাক্তিগত পছন্দ, ইচ্ছা, স্বাধীনতা ধর্মীয় অনুশাসন গুরুত্বপূর্ণ নাকি সামষ্টিক অধিকার ও দাবি গুরুত্বপূর্ণ সেটা বুঝা জরুরি।’’

 

এছাড়া তিনি বলেন, ‘‘বহু তৃতীয় বিশ্বের দেশ ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে; সেটার একটি বড় কারণ হচ্ছে এই সামষ্টিকতা, সামষ্টিক অধিকার। কারণ এখানে একটি সামষ্টিকতা কাজ করেছে।’’

রবিবার (১৬ অক্টোবর) বিকাল সাড়ে ৩টায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে 'নৃবিজ্ঞানের চোখে করোনা অতিমারির ভিতর বাহির' শীর্ষক সেমিনারে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা কোভিড-১৯ এর সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেন তিনি।

 

এসময় অধ্যাপক শাহাদুজ্জামান গত শতাব্দীগুলোতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বড় বড় মহামারির ইতিহাসও তুলে ধরেন তিনি। এছাড়া এই মহামারিতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের গুরুত্বের পাশাপাশি সামাজিক বিজ্ঞানের গুরুত্বটা বিশেষভাবে তুলে ধরেন তিনি।

বলেন, ‘‘করোনা মহামারি একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা। পুরো সমাজ এই অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গেছে। যখনই কোনো অভিজ্ঞতা সামাজিক অভিজ্ঞতা হয়, তখনি সেখানে উপস্থিত হতে হয় সমাজবিজ্ঞানীদের । তখন একজন নৃবিজ্ঞানীও অবদান রাখতে হয় সেখানে।  সমাজে কি ঘটছে- তা পর্যবেক্ষণ করতে হয়।’’

সামাজ বিজ্ঞানীদের ভূমিকা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘ সমাজবিজ্ঞানীরা তো ভাইরাস নিয়ে কিছু করতে পারবো না। সেটা বায়োমেডিকেল বা ভাইরোলজিস্টরা নিধনের বা প্রতিরোধের ওষুধ, টিকা তৈরির চেষ্টা করবে।’’

 

‘‘কিন্তু আমি একজন সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে, এই বিষয়টি আমি সামাজিক আঙ্গিকে বুঝতে পারছি কি না? সমাজ কিভাবে এটাকে মোকাবিলা করছে? সমাজের উপর এটার কি প্রভাব পড়ছে, এটা থেকে আমি কি শিখতে পারছি?  জীবন দিয়ে, ব্যাক্তি দিয়ে সমাজ দিয়ে এই অসুখটা আমাকে কি জ্ঞান দিচ্ছে? এই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করাই সমাজিবিজ্ঞানীদের কাজ।’’

একজন সমাজবিজ্ঞানী বা নৃবিজ্ঞনীর কাজই হচ্ছে সেই বিষগুলো প্রতিফলিত ও গবেষণা করা বলে তিনি মনে করেন।

এছাড়া তিনি বলেন, ‘‘কোভিড একটি গ্রহের অভিজ্ঞতা। এটা একটি সার্বজনীন অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার নিজস্ব একটি চেহারা আছে। কিন্তু প্রত্যেকটি দেশ নিজেদের মতো করে সেগুলো মোকাবিলা করেছে।

 

‘‘ভয়ের ব্যাপারটা যেটা হয়েছে সেটা কয়েকটি পর্যায়ে হয়েছে। প্রথমে মানুষ মনে করেছে ‘আমরা নিরাপদ। ওই সব লোকদের ধারণা ছিল এটা বিধর্মীদের অসুখ।’’

কোভিডে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেন সাসেক্সের এই অধ্যাপক।

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে যখন করোনা শনাক্ত হয়েছে তখন যে লকডাউনটা দেওয়া হয়েছিলো সেটা ছিল ‘ছুটির’ আকারে। ছুটি বলার কারণে মানুষের মনে তেমন কোনো প্রভাব এটা ফেলতে পারেনি।’’

 

‘‘মানুষ তেমন সচেতন হয়নি। সেটার কারণে কোভিডে আক্রান্ত বেড়েছে। এছাড়া মানুষ যখন কোনো কিছু পরিষ্কার করে বুঝতে পারেনা, তখন আতঙ্কটা বেড়ে যায়।’’

 

সেমিনারে নৃবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আ ফ ম জাকারিয়ার সভাপতিত্বে ও সহকারী অধ্যাপক জাভেদ কায়ছার ইবনে রহমানের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন রজতজয়ন্তী বক্তৃতামালার আহবায়ক অধ্যাপক একেএম মাজহারুল ইসলাম।

 

অনুষ্ঠানে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/নোমান/এসডি-২৩