সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেছেন, হাওর এলাকার জন্য স্বতন্ত্র পাঠসূচি ও শিক্ষাপুঞ্জি চালু সময়ের দাবী। বাংলাদেশে শিক্ষার হার ক্রমাগত বাড়লেও হাওর এলাকার শিক্ষার হার হতাশাজনক হওয়ায় দেশের সার্বিক শিক্ষার হারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশের এক পঞ্চমাংশ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত হাওর এলাকার শিক্ষার মানোন্নয় করা না হলে বাংলাদেশ শিক্ষায় বাস্তবিক অর্থে পিছিয়ে পড়বে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সেপ্টেম্বরে শিক্ষাবর্ষ শুরু করলেও ব্রিটিশ প্রবর্তিত জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ আমাদের দেশে আজও চালু রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যত প্রনোদনা দেয়া হোক না কেন ফসল বোপন ও তোলার মাসে হাওর এলাকার শিশুদের বিদ্যালয়মূখী করা সম্ভব নয়। কৃষি প্রধান অর্থনীতির দেশে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে কৃষি থেকে বিচ্ছিন্ন করা কাম্যও নয়। জানুয়ারী মাসে সারাদেশের শিশুরা পুরো উদ্যমে শিক্ষামূখী হবে; কিন্তু হাওরের শিশুদের বেশির ভাগই ফসল রোপনে সহায়তা করবে। আবার পরীক্ষার সময় থাকে ফসল তোলার মৌসুম। তাই সারাদেশে না হোক; হাওর এলাকায় পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন সময়ের দাবী।

২৭ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন কনফারেন্স হলে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন, গণ সাক্ষরতা অভিযান এবং এসেড এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘স্টাডি অন এক্সক্লোশন ইন এডুকেশন ইন হাওর এরিয়াস অফ হবিগঞ্জঃ প্রসপেক্টস এন্ড চ্যালেঞ্জেস’ শিরোনাম শীর্ষক গবেষণাকর্মের চূড়ান্ত প্রতিবেধ উপস্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচকের বক্তব্যে  সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক এ কথাগুলো বলেন।


তিনি আরো বলেন, হাওর এলাকার অর্থনীতির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সম্পদ ও আয়ের অসম বন্টন, বিকল্প কর্ম সংস্থানের  অভাব ও প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রভৃতি কারনে সৃষ্ট দারিদ্রও শিক্ষার হারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি বর্ষা ও শুষ্ক দু’ মৌসুমেই স্কুলে যাতায়াত চরম দূর্ভোগ, মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তা ঝুঁকি, কর্মহীন সময়ে শিশুদের কর্মসংস্থানের জন্য  শহর গমন, প্রশাসনের সুষ্ঠু তদারকি এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ বিকল্প উদ্দেশ্যে ব্যবহার ও অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব হাওর এলাকার শিক্ষার হার ও মানের অবনতির জন্য দায়ী। এছাড়া হাওর এলাকার শিক্ষকদের শহরে থাকার প্রবনতা, যথাসময়ে স্কুলে উপস্থিত না হতে পারা, পদায়নের পরপরই বদলীর তদবিরও শিক্ষার প্রসারে বড় বাধা। 


হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি ও শিক্ষা) সাদিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাসনিম জাহানের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যাপক তানসেন আমীন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ, জেলা শিক্ষা গবেষণা কর্মকর্তা জাকারিয়া স্বাধীন, এসেডের প্রধান নির্বাহী জাফর ইকবাল প্রমুখ।


মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক জানান, পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশে একমাত্র হাওর রয়েছে। প্রতিবেশ ও পরিবেশগত গুরুত্ব ছাড়াও হাওরের পর্যটন ও অর্থনৈতিক মূল্য অসীম। বাংলাদেশের ৭ টি হাওর জেলার মধ্যে হবিগঞ্জ অন্যতম। হাওরের উৎপাদিত ফসল ও মৎস হবিগঞ্জের চাহিদা মিটিয়ে দেশ-বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। হবিগঞ্জের পর্যটন খাতের ব্রান্ডিংও করা হয়েছে হাওরের মাধ্যমে। হাওরের বিপুল আর্থ-সামাজিক ও প্রতিবেশগত সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের জন্য হাওর হলো নতুন এক চ্যালেঞ্জ এর নাম। হবিগঞ্জে শিক্ষার সার্বিক চিত্র ভাল হলেও হাওর এলাকায় পশ্চাৎপদতার জন্য সার্বিক চিত্রে ধ্বস নামছে। তাই সরকারের কাছে হাওর এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়ন প্রচেষ্ঠা একটি অগ্রাধিকার খাত। 


উল্লেখ্য ‘স্টাডি অন এক্সক্লোশন ইন এডুকেশন ইন হাওর এরিয়াস অফ হবিগঞ্জঃ প্রসপেক্টস এন্ড চ্যালেঞ্জেস’ শিরোনাম শীর্ষক এ গবেষণাকর্মটি সম্পাদন করেন সিলেট মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক। গত এক বছর তিনি হবিগঞ্জের অন্ততঃ ৫টি উপজেলার হাওর এলাকায় মাঠ পর্যায়ের তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেন। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ছাড়াও রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, সাংবাদিক, আইনজীবি ও নীতি নির্ধারকদের সাক্ষাতকার গ্রহন করেন।

বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ৩ টি ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন করেন। গত সেপ্টেম্বরে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের কনফারেন্স হলে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, হাওর এলাকার উপজেলাসমূহের উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউএনও, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, আইনজীবি ও সমাজকর্মীদের উপস্থিতিতে একটি সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক। এ সেমিনারে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের মন্তব্য ও মতামত নিয়ে পুনরায় মাঠ পর্যায়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াকরন ও বিশ্লেষনের পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়। যা বাংলাদেশের হাওর এলাকার শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডিজেএস/ইআ-০৪