ছবি : মো. নুরুল ইসলাম

রাত্রির নিস্তব্ধতায় শীতের প্রকোপে জন্ম-যন্ত্রণার নিদারুণ কষ্ট বুকে নিয়ে রাত পোহাচ্ছে ছিন্নমূল মানুষ। এই শহরের বুকে ফেপে উঠা শীত, কম্পমান আঁধারে ভেসে আসা শীতল বাতাস যেনো— শীতরাত্রির এক আদিম নগ্নতা।

 


ছিন্নমূলী খোয়াবে তুলোভরা শীত নিবারক, মলিনমুখী মানুষদের চির আকাঙ্খা। কবে পুরোবে তাদের আবদার।শীতের শোষণে মানুষের কষ্ট আর কতো গুনবে ভোরের রক্তলাল সূর্যের প্রখর আলো। এ যেন সুকান্ত ভট্টচার্যের ‘শীতের সূর্য’ কবিতার বাস্তব চিত্র। কবি লিখেছেন, ‘হে সূর্য! শীতের সূর্য!/ হিমশীতল সুদীর্ঘ রাত তোমার প্রতীক্ষায়/ আমরা থাকি,/ যেমন প্রতীক্ষা করে থাকে কৃষকদের চঞ্চল চোখ,/ ধানকাটার রোমাঞ্চকর দিনগুলির জন্যে।/ হে সূর্য! তুমি তো জানো,/ আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!/ সারারাত খড়কুটো জ্বালিয়ে,/ এক টুকরো কাপড়ে কান ঢেকে,/ কত কষ্টে আমরা শীত আটকাই!’

 

জাপানিজ কবি মাৎসুও বাশোর হাইকু কবিতা যেমন—
শীতের সূর্য
ঘোড়ার পিঠে-
আমার জমে যাওয়া ছায়া।
কথাটির মতো সত্য।

শীতের মৌসুমে নগরীর ছিন্নমূল মানুষের রাত কাটে অবর্ণনীয় কষ্টে। বিভিন্ন স্থানে চোঁখে পড়ে ফুটপাতে শুয়ে থাকা ঘরহীন মানুষের অবয়ব। এসব সহায়-সম্বলহীনদের কেউ হালকা বিছানা বিছিয়ে, কেউবা বিছানা ছাড়াই শুয়ে পড়ে সড়কের কিনারায়, ফুটপাতে অথবা গাছের তলায়, ব্রিজের নিচে। তাদের কেউ শ্রমজীবী, কেউবা নিতান্তই অসহায়।

 

শহরের চৌহাট্টা, রিকাবীবাজার, কাজিরবাজার, বন্দর বাজার, ক্বীন ব্রিজ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে রাতের হিমশীতল আকাশের নিচে শুয়ে আছে অসংখ্য ছিন্নমুল মানুষ। এদের কারোরই ঘর কিংবা থাকার জায়গা নেই, নেই গাঁ ঢাকার মতো সর্বনিম্ন কোনো উষ্ণ আবরণ।

 

কখনো কখনো বিত্তবানদের কেউ কেউ ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ করলেও ছিন্নমূল মানুষের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তাছাড়া বিতরণ করা শীতবস্ত্র খুবই নিম্নমানের হওয়ায়— শীত নিবারণে খুব একটা কার্যকর নয় বলে জানায় ছিন্নমূল মানুষ।

 

বুধবার ভোরে শহর ঘুরে এই চিত্র দেখা যায়। বন্দর বাজার এলাকায় ৩০-৩৫ বছরের এক মহিলা ৩ শিশু সন্তান নিয়ে এই তীব্র শীত উপেক্ষা করে শুয়ে আছেন ফুটপাতে। তবে মা হিসাবে সন্তানের এইটুকু চিন্তা মাথায় রেখে মশারী টাঙাতে ভুলেন নি। মশার প্রকোপ থেকে সন্তানকে বাঁচাত পাশে রেখেছেন মশা নিরোধক কয়েল। সন্তান প্রতি এরকম সুরক্ষা সামর্থ অনুযায়ী সব মায়েরাই করে থাকে, তবে এইক্ষেত্রে, এই অবস্থায় এবং এই করুণ চিত্র হরহামেশাই শহরের আনাছে কানাছে দেখা যায়। আবার এটাও দেখতে পাওয়া যায় যে— রান্নাসরঞ্জামে ভর্তি একটা বাঁশের পাইলা (আসবাব)।

 

অবশ্য ডেঙ্গু প্রকোপের পরিসংখ্যানে  গত বছরের অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৯৩২। এটি গত বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ রোগীর সংখ্যা। আবার অক্টোবরেই ৮৬ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর কোনো এক মাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা এটিই।

 

পাশেই ক্বীন ব্রিজের নিচে গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকতে দেখা যায় কয়েকজন শিশু ও বৃদ্ধকে। শীতে কুঁকড়ে যাচ্ছিল তাদের শরীর। অনেকেই বস্তার ভিতর বা পুরানো  কাঁথা-কম্বলে গাঁ মুড়িয়ে শীত নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতেই প্রতিদিনের রাত কাটছে।

 

বিছানা বিছানোতে ফল বিক্রেতাদের ফেলে দেয়া কাগজের ছেঁড়া কার্টন দিয়ে তৈরি ছিন্নমূল মানুষদের নৈমিত্তিক হিসাবের গড়মিল।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/পল্লব/এসডি-০১