অধিকতর উন্নয়নে চলমান দুই প্রকল্পের অধীনে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে কয়েকটি ভবনের নির্মাণ কাজ। এসব ভবনে কাজ করছেন শতাধিক নির্মাণ শ্রমিক। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোন ধরণের নিরাপত্তা সামগ্রী ছাড়াই এসব নির্মাণ শ্রমিক কাজ করেন।
তবে ভবন নিমার্ণে নিরাপত্তা সামগ্রীর বিষয়ে কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকদের বিপরীত বক্তব্য রয়েছে। তাছাড়া গত সোমবার শাবির নির্মাণাধীন দোতলা ভবন থেকে পড়ে গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালের আইসিউউতে এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।

এতে অভিযোগ রয়েছে, কাজ করার সময় কোনো সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া হয়নি ওই শ্রমিককে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও দায়িত্বপালন ও নজরদারিতে গাফিলতি রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন অনেকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২’শ কোটি ৩৮ লাখ টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-১ এর অধীনে ৫তলা বিশিষ্ট একাডেমিক ভবন ডি এর এক্সটেনশন, ৪তলা বিশিষ্ট আইআইসিটি ভবনকে ১০তলা ভবনে উর্ধ-মুখী বর্ধিতকরণ। এছাড়া বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব ছাত্রী হল, দুই তলা বিশিষ্ট সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ওয়ার্কশপসহ কয়েকটি বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। এছাড়া ৯৮৭ কোটি টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প-২ এর অধীনে একাধিক প্রকল্পের কাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলে জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান প্রকল্পগুলোতে কোন ধরণের নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহার ছাড়াই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন শ্রমিকরা। এতে অধিকাংশ শ্রমিকের শরীরে নেই কোন ধরণের হেলমেট, গামবুট, বেল্ট, হ্যান্ড গ্লাভস কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তা সামগ্রী। এমনকি বহুতল ভবনের সর্বোচ্চ উঁচুতে এসব নিরাপত্তা ছাড়াই কাজ করছেন অনেকেই।

জাতীয় বিল্ডিং কোডে বলা হয়েছে, নির্মাণ কাজ চলাকালীন শ্রমিকদের অবশ্যই মাথায় হেলমেট, সেফটি বেল্ট ও ঢিলেঢালা পোশাক ব্যবহার করতে হবে। তাছাড়া কোন ভবনের নির্মাণ কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারপাশে জাল কিংবা টিন দ্বারা নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের কথাও বলা রয়েছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ নির্মাণ কাজে এমন ব্যবস্থাও নেই। এতে পূর্বে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলেও সোমবার দোতলা ভবনের কার্নিশে রং করার সময় এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এসময় তার গায়ে কেনো ধরণের নিরাপত্তা সামগ্রী ছিল না। নির্মাণে কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অভিযোগ, দোতলা ওয়ার্কশপ ভবনে রং করার সময় তাদেরকে কোনো নিরাপত্তা সামগ্রী দেওয়া হয়নি। যে শ্রমিক মারা গেছেন তিনি হেলমেট ও বেল্ট ছাড়াই বাঁশের মাচার ওপর দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন।
এছাড়া কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক বলেন, ‘ভবন থেকে এক শ্রমিকের মৃত্যুর পর গত দুইদিনে নিরাপত্তাসামগ্রী দিতে তোড়জোড় দেখা গেছে ভবন নির্মাণ কর্তৃপক্ষের। এর আগে গুটিকয়েকজন শ্রমিককে এসব সামগ্রী দেওয়া হত। কিন্তু নির্মাণ শ্রমিকরা নিরাপত্তাসামগ্রী পড়তে স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করলেও তাদেরকে পর্যাপ্ত সামগ্রী দেওয়া হয়না। তবে এর মধ্যে কিছু রয়েছে, যাদের নিরাপত্তা সামগ্রী থাকার পরেও ব্যবহার করেন না।’
এ ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ইঞ্জিনিয়ারদের ভাষ্য, শ্রমিকরা অধিকাংশই সুরক্ষা সামগ্রী পড়তে ‘অভ্যস্ত না’। তারা এসব পড়াকে ‘অস্বস্থিকর’ মনে করে বলে এগুলো ফেলে রাখে।
এছাড়া জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নিরাপত্তা প্রকৌশলী নেই; যিনি নির্মাণ শ্রমিকদেরকে বিষয়টি সবসময় বুঝিয়ে দিবেন। এ কারণে নির্মাণ কাজে শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক বলেন, নির্মাণ কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি রয়েছে। তারা যদি নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষ নজরদারি করত, তাহলে একটি মৃত্যুর ঘটনা হয়তো ঘটতো না। তাছাড়া নির্মাণ শ্রমিকদের অনেককেই কোনো প্রকার ট্রেনিং ও নিরাপত্তা জ্ঞান ছাড়াই তারা কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। এতে আরও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষের উচিত সবসময় নজরদারি করা ও যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া। এছাড়া এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তরের তদারকি বাড়ানো দরকার।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল এন্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের এক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণের টেন্ডার দেওয়ার সময় অবশ্যই ওই ঠিকাদারি বা নির্মাণ কোম্পানির নিরাপত্তাসামগ্রী যথাযথ আছে কি না সেগুলো খোঁজ নিয়ে দেখার প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৌশল দপ্তরের ‘গাফিলতি’ আছে বলে তিনি মনে করেন। কারণ তারা যদি যথাযথ নজরদারি করে, তাছাড়া নিরাপত্তার বিষয়টি বিশেষভাবে তদারকি করে, টেন্ডার দেওয়ার আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠনগুলোর এসব ঠিক আছে কিনা সেগুলো দেখতে হবে।
এ বিষয়ে আরও কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বিষয়টিকে ‘সেনসেটিভ’ বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইআইসিটি বিল্ডিংয়ের কাজে দায়িত্বে থাকা একটি নির্মাতা কোম্পানির সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহিনুজ্জামান বলেন, শ্রমিকরা নিরাপদে কাজ করতে কোম্পানী থেকে তাদের নিরাপত্তা সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। তবে তারা সেগুলো ব্যবহার না করে যত্রতত্র ফেলে রাখে। তাদেরকে সবসময় হেলমেট, গামবুট, সেফটি বেল্ট পড়ার জন্য বলা হয়।
তিনি আরও জানান, যে শ্রমিক মারা গেছে তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে তার পরিবারকে সহযোগিতা চলমান রয়েছে। তারা পরিবারকে স্থায়ীভাবে কীভাবে সহযোগিতা করা যায় সেই বিষয়টিও আলোচনা করা হবে জানান তিনি।
এদিকে নির্মাণ শ্রমিকের সার্বিক বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো ভাবেই তার সাড়া পাওয়া যায়নি। শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার পর গত দুইদিন ধরে তাকে একাধিকবার কল ও খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এছাড়া গত দুইদিন কয়েক দফায় তার দপ্তরে গেলেও প্রধান প্রকৌশলীর দেখা মিলেনি। এমনকি প্রকৌশল দপ্তরের কেনো কর্মকর্তা ও কর্মচারীও ‘প্রধান প্রকৌশলী কোথায় আছেন’ সেটা বলতে পারেনননি। তবে গত কয়েকদিন ধরে তিনি সাংবাদিকদেরকে এড়িয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এছাড় ওই দপ্তরের অন্য কর্মকর্তারাও কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা আমাদের মতো নির্মাণ কাজের সঙ্গে দায়িত্বরতদের বারবার চিঠি দিয়েছে। হেলমেট ছাড়া যেন কোনো শ্রমিক কাজ না করে সেটা বলা হয়েছে। যদি কেউ করতে চায়, তাকে যেন কাজ করতে দেওয়া না হয়। এছাড়া বলেছি, তারা যেন একশ’ভাগ নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করে যেন কাজ করে।
এক্ষেত্রে এখন থেকে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির জারি করা হবে বলে জানান তিনি।
তাছাড়া ভবন থেকে শ্রমিক মারা গেছেন তার পরিবারকে সহযোগিতার জন্যও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তাদের দায়িত্বপালন ও নজরদারিতে গাফিলতার কথা স্বীকার করে উপাচার্য বলেন, ‘একটু অবহেলাতো আছেই।’
‘তবে আমি বিভিন্ন জায়গায় শ্রমিকদেরকে দেখি যে, তারা কত উপরে কাজ করতেছে কিন্তু তারাও হেলমেট পড়তেছে না। বিদেশে নিরাপত্তা সামগ্রী পড়তে দেখেছি, কিন্তু আমাদের শ্রমিকরা এগুলো পড়েনা।’
তিনি বলেন, ‘এছাড়া আমাদের প্রকৌশল দপ্তরে পর্যাপ্ত লোক নেই। আমরা চেষ্টা করতেছি ইউজিসির অনুমোদন সাপেক্ষে আরও লোক নিয়োগ দেওয়ার জন্য।’
‘বিভিন্ন কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার পূর্বে ওই কোম্পানির যথাযথ নিরাপত্তা সামগ্রী আছে কি না’ এ বিষয়টি দেখে কাজ দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘টেন্ডারের কাজটি ইউজিসি করে থাকে। ইউজিসি এ বিষয়গুলো বিবেচনা করে কোম্পানিগুলোকে কাজ দিয়ে থাকে।’’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/নোমান/এসডি-৩৫




