২০১৯ সালের এপ্রিল মাস। জীবিকার তাগিতে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন থেকে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন এক যুবক। গন্তব্য কুমিল্লার নাঙ্গলকোট। কুমিল্লা এবং লাকসাম স্টেশনের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছলে আচমকা এক দুর্ঘটনার কবলে পরে ট্রেনটি। ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। সাথে সাথে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে কয়েকদিন অতিবাহিত হওয়ার পর কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা জুটেনি তার কপালে।

 


পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ ছিল তার।

 

প্রিয় পাঠক, আজ আপনাদের বলবো হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার জীবনযুদ্ধে জয়ী পা হারানো এক যুবকের গল্প।

 

তিনি উপজেলার ২ নং উত্তরপশ্চিম ইউনিয়নের চানপাড়া মহল্লার মৃত জব্বার মিয়ার পুত্র ওয়াহেদ মিয়া। ২০১৯ সালে দুর্ঘটনার কবলে পড়ার পর সবকিছু মিলিয়ে তিনি যখন রীতিমতো দিশেহারা তখন দেশ-বিদেশে অবস্থানরত তার বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনরা এগিয়ে আসেন তাকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য। আত্মীয়স্বজন এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থারত তার বন্ধুরা চাঁদা তুলে শুরু করেন চিকিৎসা। পঙ্গু হাসপাতাল থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে। শুরু হলো চিকিৎসা। কিন্তু বিধি বাম। চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠলেও চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী বাম পা কেটে ফেলতে হয় তার। চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফিরে এসে আবারও শুরু হয় তার কঠিন জীবন। স্ত্রী, দুই পুত্র, মা এবং এক বোনসহ মোট ছয় জনের সংসার। এবার আবারও তার আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুরা তাদের সহযোগিতার হাত আরও একটু প্রসারিত করেন। তাদের সহায়তা এবং একটি এনজিও থেকে কিছু টাকা লোন নিয়ে বাড়ির সামনে একটি দোকান খুলে বসেন ওয়াহেদ।

 

ভালোই বিক্রি হচ্ছিল। ব্যবসায়ের মুনাফার টাকা দিয়ে কোনো রকম চলছিল সংসার। একদিন দোকানে বসেই ভাবতে লাগলেন তার পূর্বের জীবনের কথা। যে যুবক দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে অনায়াসে ঘুরে বেড়াতেন, রাজমিস্ত্রীর কাজসহ যেকোনো কাজ করতে পারতেন তিনি। ভালো আয় রোজগারও ছিল তার। অথচ আজ তাকে দোকানে বসে দিন কাটাতে হয় তার! তিনি ভাবলেন এভাবে জীবন চলতে পারে না। তাই নতুন করে শুরু হলো তার জীবন যুদ্ধ। ক্রাচে ভর দিয়ে একদিন বের হয়ে গেলেন কাজে। রাজমিস্ত্রীর কাজ। কাটা পা ক্রাচের ওপর রেখে আরও দশজন স্বাভাবিক শ্রমিকের মতই কাজ শুরু করেন ওয়াহেদ। প্রবল মানসিক শক্তি আর মনোবল নিয়ে পুরোপুরি কাজ করলেন এবং অন্যান্যদের সমান মজুরিও পেলেন। এবার মানসিকভাবে আরও শক্তি পান তিনি এবং মনোবল আরও দৃঢ় হয় তার। এরপর থেকে আর থেমে থাকতে হয়নি তাকে। আগের মতই স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে থাকেন। এখন দোকান চালানোর পাশাপাশি কৃষিকাজও করছেন এই যুবক। এবছর প্রায় ৪ একর কৃষি জমি আবাদ করেছেন। শ্রমিকদের সাথে নিজের জমিতে তিনি নিজেও কাজ করেন। সকাল এবং বিকালে বসেন দোকানে। আগামী বৈশাখ মাসে ধান বিক্রি করে ঋণের টাকা পরিশোধের স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

 

এক প্রশ্নের জবাবে ওয়াহেদ জানান, শারীরিক শক্তির পাশাপাশি মানুষের মনোবল এবং মানসিক শক্তির গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। শরীর থেকে একটি পা হারিয়ে গেলেও মনোবল হারান নি ওয়াহেদ। বর্তমানে আর কারও কাছে হাত পাততে হয় না তাকে। সবধরনের কাজও করতে পারেন তিনি। জীবনযুদ্ধে জয়ী এই যুবক সমাজের আরও দশজন সুস্থ স্বাভাবিক যুবকের মতই দিনযাপন করছেন এখন। পঙ্গুত্বের কাছে হার মানেন নি ওয়াহেদ। পা হারানো এই যুবক এখন এলাকাবাসীর কাছে একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ এবং অনেকের কাছে এখন রোল মডেল তিনি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/জসিম/এসডি-০৬