ফেব্রুয়ারি মাস। বাঙালির কাছে ভাষার মাস, ভাষা শহিদদের স্মরণে শোকের মাস। কিন্তু চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস যেন বিশ্বব্যাপী শোকের পসরা সাঁজিয়ে বসেছে। ৬ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক-সিরিয়ায় ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের আঘাত দিয়ে শুরু। শেষটা এসে থেমেছে দেশের কক্সবাজারে ২৫ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে তুরস্ক-সিরিয়ায় আফটার শক একাধিকবার অনুভূত হয়েছে। তুরস্কে সবশেষ ২৭ ফেব্রুয়ারিতেও নতুন কম্পনে একজনের প্রাণহানির সংবাদ পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে তুরস্ক-সিরিয়ায় ভূমিকম্পে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া
তুরস্ক-সিরিয়ায় প্রাণঘাতি ভয়াবহ ভূমিকম্প আঘাত হানার তিনদিন পর ইন্দোনেশিয়ার উত্তর উপকূল পাপুয়ায় আঘাত হানে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প। ভূমিকম্পে অন্তত চারজন নিহত হয় এবং বেশ কিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
ইন্দোনেশিয়ার মেটিওরোলজি, ক্লাইমাটোলজি এবং জিওফিজিক্যাল এজেন্সি (বিএমকেজি) জানিয়েছে, সেদিন স্থানীয় সময় ১টা ২৮ মিনিটে ভূমিকম্পটি জয়পুরা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে।
জয়পুরার দুর্যোগ প্রশমন সংস্থার প্রধান আসাপ খালিদ একটি প্রেস বিবৃতিতে বলেছেন, ‘একটি ক্যাফে ভেঙে পড়ে এবং সেখানে চারজন মারা যায়। এটি সমুদ্রে পড়েছিল।’ জয়াপুরার বাসিন্দারা বলেছেন, ভূমিকম্প হলে লোকজন বাড়িঘর ও দোকানপাট থেকে দৌড়ে নিরাপত্তার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে। সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্রগুলি এই অঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্থ বিল্ডিংগুলিকে দেখায় এবং এটি একটি নিমজ্জিত বিল্ডিং যা উপকূলীয় জলে তার ছাদ পর্যন্ত তলিয়ে গেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় রিং অব ফায়ারে অবস্থানের কারণে ইন্দোনেশিয়া ঘন ঘন ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির তাণ্ডব দেখা যায়। এই অঞ্চলে টেকটোনিক প্লেট সংঘর্ষ হয়। ভূমিকম্পটি চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এই এলাকায় রেকর্ড করা এক হাজারেরও বেশি ভূমিকম্পের মধ্যে একটি ছিল। বিএমকেজি প্রধান দ্বিকোরিতা কর্নাবতী বলেছেন, ‘২ জানুয়ারি, ২০২৩ সাল থেকে জয়পুরার আশেপাশে ১ হাজার ৭৯টি ভূমিকম্প হয়েছে। এর মধ্যে ১৩২টির কম্পন এ অঞ্চলের বাসিন্দারা টের পেয়েছেন।’
তারপরে ফের দেশটিতে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে ১১ ফেব্রুয়ারি। তালাউদ দ্বীপপুঞ্জের কাছে ১১ কিলোমিটার গভীরতায় ভূমিকম্প আঘাত হানা ভূমিকম্পে প্রাণহানি বা অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির সংবাদ পাওয়া যায়নি।
আফগানিস্তান-সিকিম
১৩ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তান ও সিকিমে আঘাত হানে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প। ন্যাশনাল সেন্টার ফর সিসমোলজি (এনসিএস) অনুসারে, ১৩ তারিখ সকালে আড়াই ঘণ্টার ব্যবধানে সিকিম এবং আফগানিস্তানে ৪ দশমিক ৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সকাল ৬টা ৪৭ মিনিটে আফগানিস্তানের ফয়জাবাদের ১৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্বে এবং ভোর ৪টা ১৫ মিনিটে সিকিমের ইউকসোম শহরের উত্তর-পশ্চিমে ৭০ কিলোমিটার থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে একই মাত্রার ভূমিকম্পগুলো আঘাত হানে।
এক মাসের মধ্যে আফগানিস্তানের এটি দ্বিতীয় ভূমিকম্প। এর আগে ২২ জানুয়ারি সকালে ৪ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। তবে উভয় অংশেই কোনো প্রাণহানি বা সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। সিকিমের ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল ব্রহ্মপুত্র নদীর দক্ষিণ তীরে নগাঁও জেলায় এবং গভীরতা ছিল ১০ কিলোমিটার। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলি উচ্চ ভূমিকম্পের অঞ্চলে পড়ে এবং প্রায়ই এই অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়।
ফিলিপাইন
১৬ ফেব্রুয়ারি ফিলিপাইনের মধ্যাঞ্চলে আঘাত হানে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার মতে, ১৬ তারিখ রাত ২টার পরে ফিলিপাইনের মধ্যাঞ্চলের মাসবেত প্রদেশে ভূকম্পন অনুভূত হয়, রিখটার স্কেলে যার মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ১। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল মাসবেত প্রদেশের মিয়াগা গ্রামে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ৭ মাইল গভীরে।
ভূমিকম্পের সময় আলবানার মতো অনেকেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসেন বলে জানিয়েছে দেশটির সংবাদমাধ্যম। মাসবেত প্রদেশের পুলিশপ্রধান রলি আলবানা বলেন, ‘এটা বেশ শক্তিশালী ভূমিকম্প ছিল।’ তবে এতে উল্লেখযোগ্য কোনো হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি।
নেপাল
২২ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেলে নেপালের পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানে ৫ দশমকি ২ মাত্রার ভূমিকম্প। নেপাল ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, ভূমিকম্পটি স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটে মিনিটে আঘাত হানে এবং এটি কাঠমান্ডু থেকে ৪৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে বাজুরা জেলায় রেকর্ড করা হয়েছিল। তবে ভূমিকম্পে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি বাজুরায় ৫ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে একজন নিহত হয়েছিলেন।
চীন-তাজিকিস্তান
২৩ ফেব্রুয়ারি চীন-তাজিকিস্তান সীমান্তে ৬ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এদিন সকালে তাজিকিস্তানের চীন সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ভূকম্পন অনুভূত হয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) বরাত দিয়ে টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ৩৭ মিনিটে তাজিকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে ৬.৮ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে। ভূপৃষ্ঠ থেকে এর গভীরতা ছিল ২০.৫ কিলোমিটার।
এদিকে চীনের ভূমিকম্প নেটওয়ার্ক কেন্দ্র দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভিকে জানিয়েছে, চীনের জিনজিয়াং সীমান্তের কাছে এবং তাজিকিস্তানে প্রায় ৭.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। চীনা টেলিভিশন সিসিটিভির খবরে বলা হয়েছে, এ ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল চীনের নিকটতম সীমান্ত থেকে প্রায় ৮২ কিলোমিটার দূরে। জিনজিয়াংয়ের পশ্চিমাঞ্চলের কাশগড় এবং আর্টাক্সে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। উপকেন্দ্রের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে এর গড় উচ্চতা ছিল প্রায় ৪ হাজার ৬৫৫ মিটার।
ইউরোপীয়-ভূমধ্যসাগরীয় সিসমোলজিক্যাল সেন্টার (ইএমএসসি) দিচ্ছে ভিন্ন তথ্য। সংস্থাটি বলছে, ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.১। যদিও পরে সেই প্রতিবেদন সংশোধন করে এক বিবৃতিতে ইএমএসসি বলেছে, কম্পনের মাত্রা ছিল ৬.৩।
ইউএসজিএসের অনুমান, এ ভূমিকম্প থেকে ভূমিধসের আশঙ্কা থাকলেও, জনসংখ্যা অধ্যুষিত এলাকা তার সংস্পর্শে আসবে না। সংস্থাটি বলছে, ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল আফগানিস্তান ও চীনের সীমান্তবর্তী আধা-স্বায়ত্তশাসিত পূর্বাঞ্চলীয় গোর্নো-বাদাখশানে হতে পারে। তবে এই ভূমিকম্পে কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
কক্সবাজার
সবশেষ ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে বাংলাদেশের কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন। এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৮। তবে ভূমিকম্পে কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি। শনিবার বিকেল ৪টা ৩৯ মিনিটে এ ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
কক্সবাজার জেলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, রিখটার স্কেলে এ ভূমিকম্পের মাত্রা ৪ দশমিক ৮। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব মিয়ানমারে। কক্সবাজার সীমান্ত থেকে মিয়ানমারের ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইআ-০৬




