সিলেট মহানগরীতে আবারও আলোচনায় এসেছে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের দৌরাত্ম্য। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান, জরিমানা ও নির্দেশনার পরও শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও গলিপথে প্রতিদিনই চোখে পড়ে এসব রিকশার চলাচল। শুধু তাই নয়, রাতে নগরজুড়ে গোপনে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ চার্জিং স্টেশন। রাতের সিলেটে যখন শহর নিস্তব্ধ, তখনই জেগে ওঠে অবৈধ চার্জিং স্টেশনগুলো। গলিপথ, দোকানঘর আর গ্যারেজে চলছে চোরাই বিদ্যুতের উৎসব। এসব পয়েন্টে দিনের পর দিন বিদ্যুৎ চুরি করে রিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বারবার অভিযান ও সংযোগ বিচ্ছিন্নের পরও নতুন করে গড়ে উঠছে চার্জিং স্পট। এতে যেমন বাড়ছে লোডশেডিংয়ের চাপ, তেমনি অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন নগরবাসী। নগরীজুড়ে অবৈধ চার্জিং স্টেশনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও সম্প্রতি আবারও কিছু কিছু স্টেশনে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 


বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমতি ছাড়া এসব চার্জিং পয়েন্টে চালানো হচ্ছে অসংখ্য চার্জিং বক্স ও তারের জটলা। অনিয়ন্ত্রিত এই চার্জিং প্রক্রিয়া শুধু আইন ভাঙছে না, বরং জনজীবনকেও বিপদে ফেলছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা ও বিদ্যুৎ চুরির বিরুদ্ধে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। সম্প্রতি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রকাশ করেছে ৩৮টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের তালিকা, যেগুলোর বেশিরভাগই নগরীর ব্যস্ত ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে।

 

সম্প্রতি সিলেট বেশ তোড়-জোড়ভাবে অভিযানে নামে প্রশাসন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ ৩৮টি  অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের তালিকা প্রকাশ করেছে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান স্বাক্ষরিত মহানগরীর ব্যাটারীচালিত রিকশার অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট সমূহের তালিকাগুলো হল- সিলেট মহানগরীর কাজিটুলা মক্তব গলি, মহসিন টিলা এলাকার সাহজাহান, মক্তব গলি এলাকার সুজন,  লালাদিঘিরপাড় এলাকার শাহজাহান, হিলভিউ কাজিটুলা এলাকার রিয়াজ, কাজিটুলা এলাকার শহীদ, উত্তর কাজিটুলা এলাকার দানিস, আলম, দারুস সালাম এলাকার শাহেদ, চোকিদেখী এলাকার শহীদ, বাদামবাগিচা বাজার এলাকার সাজ্জাদ, বাদাম বাগিচা ১নং রোড এলাকার সালাম, বাদাম বাগিচা ৩নং রোড এলাকার পরাণ,  বিপ্লব, মুতালিম, পীর মহল্লা বাজার হেলাল, জালালাবাদ আবাসিক এলাকার মহরম, লেচু বাগান এলাকার খোকন, স্টেডিয়াম ৪নং গেইট এলাকার ইয়াসিন, কানিশাইল এলাকার সজিব, কামাল, সাদেক, বিল্লাল, দুর্বার কলাপাড়া এলাকার মখলিস মিয়া, ঘাসিটুলা এলাকার ফুলমিয়া, বেতের বাজার এলাকার আলাউদ্দিন, কলাপাড়া এলাকার হাসিনুর, মোল্লাপাড়া এলাকার সুমন আহমেদ,  লালাদিঘিরপাড় এলাকার সুমন, শামীমাবাদ এলাকার আনিস, মঙ্গলিরপাড় এলাকার আব্দুল বারী, মংলীরপাড় এলাকার লুৎফর, বাইশটিলা এলাকার জিল্লু মেম্বার, বাইশটিলা এলাকার আর্মির রিকশা গ্যারেজ, এয়ারপোর্ট খানা এলাকার থানার সোর্স এর রিকশা গ্যারেজ, বড়শালা বাজার এলাকার রিকশা গ্যারেজ, ফরিদাবাদ হাউজিং এলাকার রিকশা গ্যারেজ, ধোপাগুল এলাকার রিকশা গ্যারেজ এবং আটকেয়ারী এলাকার রিকশা গ্যারেজ।

 

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সিলেট মহানগরীতে এখন পর্যন্ত ৩৮টি অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং পয়েন্টের নাম ও অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। এসব চার্জিং পয়েন্টের তালিকা ইতোমধ্যে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রকাশ করেছে এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা কেবলমাত্র দৃশ্যমান অংশ। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড, গলিপথ ও আবাসিক এলাকার আড়ালে আরও শতাধিক অবৈধ চার্জিং স্টেশন সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।  এসব চার্জিং পয়েন্টে অনেক সময় দোকানঘর, গ্যারেজ বা আবাসিক ভবনের নিচতলা ব্যবহার করা হচ্ছে ব্যাটারি চার্জের কাজে, যেখানে অনুমোদনহীনভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে চলছে চোরাই বিদ্যুৎ ব্যবহার।

 

পুলিশ জানায়, তালিকাভুক্ত ৩৮টির পাশাপাশি যেসব নতুন চার্জিং পয়েন্ট চিহ্নিত হচ্ছে, সেগুলোকেও পর্যায়ক্রমে অভিযানের আওতায় আনা হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে বিশেষ টিম গঠন করে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং বিদ্যুৎ বিভাগের সহযোগিতায় এসব স্থানের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।

 

ট্রাফিক বিভাগ বলছে, অবৈধ চার্জিং স্টেশনগুলো শুধু আইনভঙ্গই করছে না, বরং শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে এবং অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ফলে নগরবাসীর নিরাপত্তা ও নির্বিঘ্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।

 

জানা গেছে, সিলেট মহানগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্যাটারিচালিত রিকশার অভিযান চলছে প্রতিনিয়ত। আর এই অভিযানের ফাক-ফোকর দিয়েও নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে এখনও চোখে পড়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা। আর মহানগরীর বাইরে বিভিন্ন সড়কের অলিগলি এখনও ব্যাটারিচালিত রিকশার দখলে। এই ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জ দেওয়ার আড়ালে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট। এসব পয়েন্টে চলছে চোরাই বিদ্যুৎ ব্যবহার। এতে যেমন লোডশেডিংয়ের চাপ বাড়ছে, তেমনি অগ্নিকাণ্ড ও বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ঝুঁকিতেও পড়ছে নগরবাসী। ক্রমবর্ধমান অনিয়ম ঠেকাতে অবশেষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন।

 

এর আগে ২৪ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে যৌথ অভিযানে ৩৮টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রশাসন ও বিদ্যুৎ বিভাগ। এ সময় এসব পয়েন্টের মিটার খুলে নেয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পরবর্তীতে ২০ অক্টোবর (সোমবার) দ্বিতীয় দফা অভিযানে আরও ১৪টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ওই অভিযানে ১৩টি বৈদ্যুতিক মিটার, ৭৩টি চার্জিং বক্স ও ১৪ লট সার্ভিস তার জব্দ করা হয়। সব মিলিয়ে দুই দফা অভিযানে প্রশাসন মোট ৫২টি অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে এবং কমপক্ষে ১৩টি মিটার, ৭৩টি চার্জিং বক্স ও ১৪ লট সার্ভিস তার জব্দ করেছে।

 

চার্জিং পয়েন্টে অভিযান ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্নের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) ও মিডিয়া অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সিলেট মহানগরীতে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশার চার্জিং পয়েন্টগুলোর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা করছি। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ বিভাগের সহায়তায় চিহ্নিত চার্জিং স্পটগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। শুধু তালিকাভুক্ত নয় নতুন যেসব অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট শনাক্ত হচ্ছে, সেগুলোকেও দ্রুত অভিযানের আওতায় আনা হচ্ছে। নগরীতে কেউই আইন অমান্য করে বিদ্যুৎ চুরি বা ঝুঁকিপূর্ণভাবে চার্জিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধ চার্জিং পয়েন্টগুলো শুধু বিদ্যুৎ চুরির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষতি করছে না, বরং এসব স্থানে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অত্যন্ত বেশি। তাই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এসব কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া