সংগৃহিত
মেয়াদোত্তীর্ণ, নকল ও নিম্নমানের ওষুধে রীতিমতো সয়লাব সিলেটের বাজার। গ্রামগঞ্জ থেকে পৌর শহর, এমনকি এই বিভাগীয় শহরেও দেদারছে বিক্রি হচ্ছে মানব দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর এসব ওষুধ।
এতে সাধারণ মানুষ প্রতারিত হলেও সচেতনতার অভাবে কর্তৃপক্ষের কাছে তেমন একটা অভিযোগ যায়না। দু’একটা অভিযোগ গেলেও বড়জোর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অভিযান চালায়। মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ পেলে তা জব্দও করে কখনো সখনো। তবে কঠোর ব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, যেমন জরিমনা আদায়- এসব করতে পারেনা তারা। আর তাই সিলেটে নকল, মানহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের ব্যবসা রমরমা। এতে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে সিলেটবাসী।
সম্প্রতি সিলেট মহানগরীর সোবহানীঘাট এলাকায় এরকম একটা ঘটনা ঘটেছে। নাছিমা নামের একজন মহিলাকে ৪ হাজার ৭২০ টাকা দামের একটা বিদেশী কোম্পানীর ওষুধ মাত্র আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করেন সোবহানীঘাটের দি বিএল ফার্মেসি কর্তৃপক্ষ। তিনি সন্দেহবশত তার ডাক্তারকে ওষুধটি দেখানোর পর তিনি আবিষ্কার করেন, সেটি একটি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। কেনার সময় জোরাজুরি করে নাছিমা ম্যামো নিয়েছিলেন। সেই ম্যামো নিয়ে ঘুরেছেন সোবহানীঘাট এলকার বিভিন্ন ফার্মেসিতে। কেউ তার বিষয়টি নিয়ে টু শব্দও করেন নি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে তিনি স্বজনদের পরামর্শে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সিলেট অফিসে অভিযোগ করেন।
তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে বুধবার ওই ফর্মেসিতে অভিযান চালান সিলেটের ড্রাগ সুপার মো. শামীম হোসেন। তিনি স্বীকার করেছেন. অভিযানে দি বিএল ফার্মেসি থেকে বেশ কিছু দামি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ জব্দ করেছেন তারা। তবে কোনো জরিমানা করেন নি বা সেটি তারা করতেও পারেন না। তবে তারা নিয়মিত মামলা করতে পারেন, এতে জরিমানা আরও অনেক বেশী হলেও তারা ওই পথে খুব একটা হাঁটেন বলে মনে হয়না।
এদিক বৃহস্পতিবার আবারও ওই সোবহানীঘাট এলাকার আরেকটা ঔষধ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘ফেমাস ফার্মেসি’তে অভিযান চালায় ভ্রাম্যমান আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভির হোসেন সজিবের নেতৃত্বে এই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই অভিযান চালানো হয়। এসময় এই ফর্মেসিতে নকল মোড়ক, ফিজিশিয়ান স্যাম্পল সংরক্ষণ ও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশী মূল্যে ঔষধ বিক্রির প্রমাণ পেয়ে এই ফার্মেসিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
নগরীর ওসমানী মেডিকেল কলেজ এলাকার ফার্মেসিগুলোতেও চলে এমন প্রতারণা। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দিব্যি চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা ক্রেতাদের হাতে।
সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপ হয় সুনামগঞ্জের দিরাই এলাকার আব্দুল্লাহ মিয়া (৪৫) এর সাথে। ওসমানী মেডিকেল রোডের একটি ফার্মেসি থেকে (নামটিও বলতে পারেন নি) তিনি তিন হাজার টাকার ওষুধ নিয়ে বাড়ী ফিরেছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখেছেন প্রায় ১৭০০ টাকার ওষুধই বিভিন্ন কোম্পানীর মেয়াদোত্তীর্ণ। তিনি অসহায়ের মতো বললেন, কি আর করা যায়।
শুধু নাছিমা বা আব্দুল্লাহ মিয়াই নয়, প্রতিদিন সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা এবং গ্রামগঞ্জেও এভাবে প্রতারিত হচ্ছেন প্রচুর মানুষ। ফার্মেসিগুলোত চলছে এমন ন্যাক্কারজনক বাণিজ্য। আব্দুল্লাহ মিয়া জানেইনা, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর নামে সরকারের একটা দপ্তর আছে এবং সিলেট শহরে তার একটা অফিসও আছে। আছেন একজন ড্রাগ সুপারও।
কথায় কথায় তিনি আরও বললেন, এসব নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করমু। পরে দেখা যাইব, খাজনা থাকি বাজনা বড়ো অইগেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের পাইকারি ওষুধের সবচেয়ে বড় বাজার দক্ষিণ সুরমার কিনব্রিজের মুখ এলাকার ফেমাস মার্কেট। এই মার্কেট থেকে নকল ও নিম্নমানের ওষুধ কেবল সিলেট মহানগরীই নয়, বলতে গেলে সিলেট বিভাগের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি, বিনামূল্যের সরকারি ওষুধও পাওয়া যায় ফেমাস মার্কেটের বিভিন্ন দোকানে। দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যবসা চলছে। বিষয়টা অনেকটা অপেন সিক্রেট।
মাঝে মাঝে ভেজাল বিরোধী অভিযান হয় বটে, ভ্রাম্যমান আদালত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে অভিযান চালিয়ে জরিমানাও করে, অবস্থা আর বদলায় না। আর তাই অবৈধ ও মানহীন ওষুধের বাজার দিনে দিনে আরও রমরমা হচ্ছে, আর প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
মেয়াদোত্তীর্ণ নকল ও মানহীন ঔষধ বিক্রেতাদের শাস্তির আওতায় নেওয়ার বিষয়ে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপ হয় সিলেট জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তানভীর হোসেন সজিবের সঙ্গে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতারিত ক্রেতারা সুনির্দিষ্টভাবে জেলা প্রশাসনের জেনারেল শাখায় তাদের অভিযোগ জানালে আমরা অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। আর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে জরিমানা করতে না পারলেও তারাতো নিয়মিত মামলা করতে পারেন। তাই প্রতারিত গ্রাহকরা তাদের কাছেও অভিযোগ দিতে পারেন।
তিনি এ ব্যাপারে গ্রাহকদের সচেতনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
সিলেটের ড্রাগ সুপার শামীম আহমদ বুধবারের অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, কোনো জরিমানা আদায় না করলেও আমরা দি বিএল ফার্মেসি থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ প্রচুর ওষুধ জব্দ করেছি। এরকম অভিযান আমরা নিয়মিতই করি।
বাংলাদেশ কেমিস্টস অ্যান্ড ড্রাগিস্টস সমিতি সিলেট শাখার তথ্যমতে, সিলেটের মার্কেটে নিবন্ধিত প্রায় ৫০০ ওষুধের দোকান আছে। আর কেমিস্ট আছেন ২ থেকে আড়াই হাজার।
এ সমিতির সিলেট শাখার সভাপতি ময়নুল হক চৌধুরী জানান, অনিবন্ধিত ফার্মেসিগুলোতেই ভেজালওষুধ বেশি বিক্রি হয়। এদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠোর হতে হবে।
নাছিমা, আব্দুল্লাহসহ সাধারণ মানুষ ওষুধের দোকানগুলোতেও আরও কঠোর এবং নিয়মিতভাবে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে মোটা অংকের জরিমানা আদায় করতে পারলে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ হতে পারে বলে মনে করছেন।
নাছিমা ও আব্দুল্লাহর দাবি, অবিলম্বে তেমন পদক্ষেপ চাই।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইকে




