জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে কেবল সিলেট-৫ কখনো নিজেদের দখলে নিতে পারেনি বিএনপি। বাকি ৫টি আসন থেকে বিভিন্ন সময় বিজয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন বিএনপির প্রার্থীরা। বিএনপির অধরা আসন সিলেট-৫ আসন থেকে একবার বিজয়ী হয়েছিল জামায়াত। 


২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে আসনটি থেকে বিজয়ী হয়েছিলেন জামায়াতের মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাল্টে গেছে অতীতের অনেক হিসেব। বিএনপির বিপরীতে ইসলামিক বিভিন্ন দল নিয়ে জোট গঠন করেছে জামায়াত। জোটের শরীকদের নিয়ে পুরনো মিত্র বিএনপির বিরুদ্ধে চমক দেখাতে চায় দলটি।


জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অতীত রেকর্ড বলছে, সিলেটে অতীতের সকল নির্বাচনে মুল প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল বিএনপি। নির্বাচনে কোন আসনে বিজয়ী হয়েছে, আবার কোনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হয়েছে দ্বিতীয়। জেলার ৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে কেবলমাত্র সিলেট-৫ আসনে কখনো বিজয়ী হতে পারেনি বিএনপি। 


আসনটি থেকে একাধিকবার নির্বাচন করেও জয়ের দেখা পাননি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক আবুল হারিছ চৌধুরীর মতো প্রভাবশালী নেতা। বিভিন্ন সময় আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে জোটের শরীকদের। এবারও আসনটিতে বিএনপি জোট থেকে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। এই আসন ছাড়া জেলার বাকি ৫টি আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির প্রার্থীরা। 


২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কাছে জেলার সবকটি আসন হারায় বিএনপি। এবার জোটের শরীক দিয়ে সিলেট-৫ ও নিজেদের দলীয় প্রার্থীর মাধ্যমে বাকি আসনগুলো পুণরুদ্ধার করতে চায় বিএনপি। 


অন্যদিকে, ২০০১ সালে বিএনপির সাথে জোটবেধে সিলেট-৫ আসনে বিজয়ী হয়েছিল জামায়াত। এ ছাড়া জেলার কোন আসন থেকে কখনো বিজয়ী হতে পারেনি দলটির কোন প্রার্থী। বিভিন্ন সময় নির্বাচন করলেও দলটির কোন প্রার্থী জয়ের দেখা পাননি। 


আওয়ামী লীগ বিহীন আগামী নির্বাচনে ইসলামী বিভিন্ন দলের সাথে ঐক্য গড়ায় ভোট বেড়েছে জামায়াত জোটে। আর জোটের পালে লাগা হাওয়ায় ভর করে এবার চমক দেখিয়ে ভোটের মাঠ জয় করতে চাইছে জামায়াত। জেলার ৬টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩টি আসনে বিএনপি জোটের সাথে জামায়াত জোটের হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে। 


সিলেট-১ (সদর-নগর) আসনে প্রায় দেড় দশক ধরে মাঠে কাজ করছেন বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। ২০১৮ সালে ‘রাতের ভোট’খ্যাত নির্বাচনে তিনি লক্ষাধিক ভোট পেয়ে চমক দেখিয়েছিলেন। এবারও তিনি ধানের শীষের প্রার্থী। 

অন্যদিকে, সিলেট-১ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াতের মাওলানা হাবিবুর রহমান। এর আগে মাওলানা হাবিবুর রহমান সিলেট-৬ আসন থেকে নির্বাচন করলেও সিলেট-১ আসনে প্রার্থী হিসেবে এবার প্রথম নাম লিখিয়েছেন। নির্বাচনের শুরুতে মাওলানা হাবিবুর রহমান বিএনপির প্রার্থীর চেয়ে অনেক পিছিয়ে থাকলেও শেষ সময়ে এসে দূরত্ব অনেক কমিয়ে এনেছেন বলে মনে করছেন ভোটাররা। তবে ভোটারদের বিবেচনায় আসনটি থেকে বিএনপির খন্দকার মুক্তাদির রয়েছেন এগিয়ে। 


সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে স্বামী ইলিয়াস আলীর প্রতি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের সহমর্মিতায় অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে রয়েছেন বিএনপির তাহসিনা রুশদীর লুনা। জামায়াত আসনটি ছেড়ে দিয়েছে খেলাফত মজলিসকে। দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুহা. মুনতাসির আলী দেয়ালঘড়ি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসনটি শরীক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুসলেহ উদ্দীন রাজুকে ছেড়ে দিয়েছে। রিকশা প্রতীকে তিনি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন বিএনপির মো. আবদুল মালিকের সাথে। আসনটিতে রিকশা ও ধানের শীষের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাচ্ছেন ভোটাররা। 


শহর থেকে সীমান্ত জনপদ সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর-কোম্পানীগঞ্জ) আসনে গিয়ে রীতিমতো ‘ম্যাজিক’ দেখাচ্ছেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। সিলেট শহরের মতো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোটারদের মনজয় করার চেষ্টা করেন। 


এছাড়া মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম চৌধুরী আটঘাঁট বেধে মাঠে নামায় আরিফুল হক চৌধুরীর পাল্লা ভারি হয়ে ওঠেছে। স্থানীয় জমিয়ত নেতাকর্মী ও আলেম-ওলামাদের বড় অংশ আরিফের পক্ষে মাঠে নামায় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতের জয়নাল আবেদীন কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন বলে মনে করছেন ভোটাররা। 


সিলেট-৫ আসনে বিএনপি ও জামায়াত উভয়দলই আসনটি ছেড়ে দিয়েছে শরীক দলকে। বিএনপি জোট থেকে খেজুরগাছ প্রতীকে জমিয়তের কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও জামায়াত জোট থেকে দেয়ালঘড়ি নিয়ে খেলাফত মজলিসের মুফতি আবুল হাসান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্রের ব্যানারে ফুটবল প্রতীকে প্রার্থী হয়েছেন বিএনপির বিদ্রোহী মামুনুর রশিদ (চাকসু মামুন)। আসনটিতে তিন প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন ভোটাররা। 


সিলেট-৬ আসনে এবার নতুন প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। অন্যদিকে, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা উত্তর জামায়াতের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন। আসনটিতে নিজেদের প্রার্থীর জয় নিশ্চিতে জামায়াত সর্বশক্তি ব্যয় করছে। ফলে আসনটিতে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ