সিলেট বিএনপির জন্য ২০১২ সালের এপ্রিল মাস যেন এসেছিল অশনি হয়ে। মাসের শুরুতে ঢাকা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির দুই নেতা। আর তাদের সন্ধান দাবিতে সোচ্চার হওয়ার দুই সপ্তাহের মাথায় ঢাকার বনানী থেকে নিখোঁজ হন তৎকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সিলেট জেলার আহ্বায়ক এম. ইলিয়াস আলী। এসময় তাঁর সাথে ছিলেন গাড়ি চালক আনসার আলী। 


আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিখোঁজ চারজনের পরিবার তাদেরকে ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠেছিল। ইতোমধ্যে গ্রেফতার হওয়া উচ্চপদস্থ কয়েকজন গোয়েন্দা ও সেনাকর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন ইলিয়াস আলীর পরিণতির কথা। গুমের পর ইলিয়াসকে খুন করা হয়েছে এমন তথ্য দিয়েছেন তারা। কিন্তু ইলিয়াসের শিষ্য বাকি তিনজনের খবর কেউ জানে না। তবে কী ‘গুরু’ ইলিয়াসের ভাগ্য বরণ করতে হয়েছে তিন শিষ্যকে- এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সিলেটবাসীর মনে। 


২০১২ সালের ২২ মার্চ অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে সিলেট নগরের উপশহরে মাহমুদ হোসেন শওকত নামে ছাত্রদলের এক নেতা খুন হন। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামী ছিলেন সিলেট জেলা ছাত্রদলের তৎকালীন সহ-সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার আহমদ দিনার ও তার বন্ধু ছাত্রদলকর্মী জুনেদ আহমদ। শওকত হত্যাকান্ডের পর থেকে দিনার ও জুনেদ আত্মগোপনে ছিলেন। উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিতে তাঁরা ঢাকায় যান। 


২০১২ সালের ৩ এপ্রিল উত্তরা এলাকার এক আত্মীয়ের বাসার সামনে থেকে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদাপোষাকে তাদেরকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থেকেই দিনার ও জুনেদ নিখোঁজ হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আটকের বিষয়টি স্বীকার করেনি। 


দলীয় সূত্র জানায়, দিনার ও জুনেদ ছিলেন সিলেট বিএনপিতে এম. ইলিয়াস আলীর অনুসারী। তাদের সাথে ইলিয়াস আলীর সম্পর্ক ছিল গুরু-শিষ্যের মতো। দিনার ও জুনেদ নিখোঁজের পর তাদের সন্ধান চেয়ে ২০১২ সালের ৮ এপ্রিল সিলেটে সংবাদ সম্মেলন করেন এম. ইলিয়াস আলী। 


ওই সম্মেলনে তিনি দিনার ও জুনেদ নিখোঁজকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে বলে জোরালো দাবি করেন। তাদেরকে ফেরত না দিলে সিলেট থেকে দুর্বার আন্দোলনেরও হুমকি দেন তিনি। ওই সংবাদ সম্মেলনের মাত্র ৯ দিন পর ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে ঢাকার বনানী থেকে গাড়ি চালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী। 


ইলিয়াস আলী নিখোঁজের পর আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে সিলেট। আন্দোলন করতে গিয়ে ইলিয়াস আলীর জন্মস্থান সিলেটের বিশ্বনাথে পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান ৫ জন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪ বছর। নিখোঁজ চারজনের পরিবার আশায় বুক বেঁধেছিলেন সরকার পতন হলে তাঁরা ফিরে আসবেন। 


কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গুমশালা থেকে কয়েকজন উদ্ধার হলেও নিখোঁজ এই চারজনের কোন সন্ধান মিলেনি। সরকার পতনের পর গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন গোয়েন্দা ও সেনা কর্মকর্তার বরাতে উঠে এসেছে ইলিয়াস আলীর পরিণতির বর্ণনা। 


জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছেন ইলিয়াস আলীকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু ছাত্রদল নেতা দিনার, জুনেদ ও গাড়িচালক আনসারের ভাগ্যে কী ঘটেছে তার কোন তথ্য মিলেনি। 


এ প্রসঙ্গে নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের বোন তাহসিন শারমিন তামান্না বলেন, ‘মনেকরেছিলাম হাসিনা সরকারের পতন হলে আমাদের ভাইকে ফিরে পাব। অর্ন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় গুম হওয়া অনেকে ফিরে আসলেও আমাদের ভাইকে পাইনি। গুম কমিশন আমাদের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তদন্ত করেছে, কিন্তু তারাও কোন সন্ধান দিতে পারেনি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও আমাদের গুম পরিবারগুলোকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। যেহেতু কোন খারাপ খবর কেউ দেয়নি, তাই আমরা আশায় আছি একদিন আমাদের ভাই ফিরে আসবে। এখন অপেক্ষা করা ও আল্লাহর সাহায্য চাওয়া ছাড়া কিছু করার নেই।’


সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘নিখোঁজের পর থেকে ইলিয়াস আলী, আনসার আলী, ইফতেখার আহমদ দিনার ও জুনেদ আহমদের সন্ধান দাবিতে বিএনপি আন্দোলন করে আসছি। এদেরকে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার গুম করে রেখেছিল। আমরা এখনো তাদের ফেরার ব্যাপারে আশাবাদী।’

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ