একসময় নদীটি দিয়ে চলত বড় বড় নৌকা। পরিবহন হতো পণ্য। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ হতো বিস্তৃণ এলাকায়। সিলেট ও সুনামগঞ্জের পাঁচ উপজেলার কৃষিতে বড় ভূমিকা ছিল নদীটির। সময়ের স্রোতে শুধু স্রোত নয় পানি ও প্রাণহীন হয়ে পড়েছে একসময়ের ভরা যৌবনের বাসিয়া। নদী থেকে পরিণত হয়েছে মরাখালে।
প্রায় ৪৭ বছর আগে একবার নদীটি খনন করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এবার তার সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে যাচ্ছে বাসিয়া। ২ মে নদীটির খনন কাজের উদ্বোধন করবেন তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খননে বাসিয়ার প্রাণ ফিরলে সিলেটের কৃষিতে ‘জোয়ার’ আসবে। অধিক উৎপাদনের আওতায় আসবে ২০ হাজার হেক্টর জমি। আর সুফলভোগী হবেন ৯০ হাজার কৃষক।
সিলেট সদর উপজেলার মাসুকগঞ্জ বাজার এলাকায় সুরমা নদী থেকে উৎপত্তি বাসিয়া নদীর। এরপর দক্ষিণ সুরমা, ওসমানীনগর, বিশ্বনাথ ও সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরের বরাক হাওর হয়ে মিলেছে কুশিয়ারা নদীতে। পাঁচ উপজেলার উপর দিয়ে প্রায় সাড়ে ৪০ কিলোমিটার বয়ে গিয়ে সুরমাকে কুশিয়ারায় যুক্ত করেছে বাসিয়া। শাখা নদী হলেও একসময় সিলেটের কৃষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বাসিয়া নদীর। বর্ষা মৌসুমে নদীটি দিয়ে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নৌকাবোঝাই করে সিলেট শহরে নিয়ে আসতেন।
এ ছাড়া যাতায়াতের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতো নৌপথটি। শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে সেচ দিয়ে পানি তুলে দুই পাড়ের হাজার হাজার হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হতো। বাসিয়া নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠেছে বিশ্বনাথ উপজেলা সদর। বিশ্বনাথের স্থানীয় অর্থনীতির বড় চালিকা শক্তি ছিল এই নদীটি। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দখল, দুষণ ও খননের অভাবে নাব্যতা হারিয়ে নদীটি পরিণত হয় মরাখালে।
স্থানীয় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় বাসিয়ার গুরুত্ব অনুধাবন করে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার ‘খাল কাটা কর্মসূচীর’ অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন নদীটিকে। ১৯৭৯ সালে তিনি নিজ হাতে খনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেছিলেন। এরপর আর কেউ সুনজর দেননি বাসিয়ায়। ধীরে ধীরে বাসিয়া নদী পরিণত হয় মরাখালে।
স্থানীয়রা বলছেন, বাসিয়া প্রাণ ফিরে পেলে অনেক অনাবাদী জমি আবাদের আওতায় আসবে। এছাড়া পানির অভাবে এখন যেসব জমিতে বছরে একবার ফসল উৎপাদন হচ্ছে সেসব জমিতে দুই থেকে তিনবার চাষাবাদ সম্ভব হবে। শুষ্ক মৌসুমে সেচ দিয়ে শীতকালীন সবজির চাষাবাদেও বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানান, বাসিয়া নদীর ৪০.৫ কিলোমিটারের মধ্যে ভরাট হয়ে যাওয়া ২৩.২৫ কিলোমিটার খনন করা হবে। বাকি অংশে মোটামুটি পানিধারণ ক্ষমতা রয়েছে। তলদেশ ৮ মিটার ও উপরিভাগ ৩০ মিটারের বেশি প্রশস্ত এবং দেড় থেকে দুই মিটার গভীর করে নদীটি খনন হবে। খননের পর পুরো নদীতে পানিপ্রবাহ তৈরি হবে। খনন কাজের দরপত্র মূল্যায়ন বাকি থাকলেও আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি টাকা।
বাসিয়া নদী পরিদর্শনে এসে সম্প্রতি পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বলেছেন, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে বাসিয়া নদী খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খননের পর মাটি পাড়ে না রেখে দূরে ফেলা হবে। যাতে বৃষ্টিতে মাটি পুণরায় নদীতে পড়ে ভরাট না হয়ে যায়।
সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানিয়েছেন, বাসিয়া নদী খননের মাধ্যমে ৯০ হাজার কৃষক সুফল পাবেন। চাষাবাদের আওতায় আসবে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি। এতে সিলেটের কৃষিতে জোয়ার আসবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ




