বিপ্লব বিদ্রোহ সাম্য প্রেম মানুষ ও মানবতার কবি সর্বোপরি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমি এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত ৪ দিনব্যাপী "নজরুল মিলন মেলা ও সাংস্কৃতিক সমারোহ" অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম আমরা, বিশিষ্ট নজরুলপ্রেমী ও ত্রিপুরায় নজরুল একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা বিচারপতি বিশ্বজিৎ পালিত মহোদয়ের আমন্ত্রণে।
২৪ মে '২৬ বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় আমরা বাংলাদেশের ৬ জন প্রতিনিধি গন্তব্যে পৌঁছে যাই । আমাদের আবাসিক ব্যবস্থা হয়েছিল শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে তুলাকোনা টিলায় বনলতা রিসোর্টে।
পরদিন ২৫ শে মে '২৬ থেকে আনুষ্ঠানিকতা শুরু। বাংলাদেশের ৬ জন অতিথিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হলো। সম্মাননাপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা হলেন বিশিষ্ট অভিনেত্রী শুভ্রা বিশ্বাস, বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার মউদুদুল আলম, সাংবাদিক ডেইজী মউদুদ, বিশিষ্ট ফ্যাশন ডিজাইনার ও আবৃত্তি শিল্পী আমিনা রহমান, বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী খুলনা বেতারের নিলয় দাস এবং বাচিক শিল্পী ও মঞ্চ উপস্থাপক হিসেবে আমাকে (শাওন পান্থ) সম্মাননা জানানো হলো। একই সাথে শুরু হয় চার দিনব্যাপী মেলা। বাংলাদেশের একটি স্টলসহ বিভিন্ন সামগ্রীর প্রায় ৫০ টি স্টল এতে অংশ নেয়।
উৎসব মঞ্চ এবং মেলাটি ছিল ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ৪/৫ কিঃ মিঃ দূরের পল্লী যোগেন্দ্র নগর রেন্টার্স সোসাইটিতে। উৎসব উপলক্ষে রেন্টার্স সোসাইটির প্রতিটি পথকে সাজানো হয়েছিল নানা রকমের নজরুলের ছবি, পোস্টার, রঙিন ফ্ল্যাগ এবং শৈল্পিক আল্পনায়। আকর্ষণীয় লাইটিং ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণকে সাজানো হয়েছিল বর্ণিল সাজে।
সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চারদিনের কর্মসূচির মধ্যে ছিল, প্রভাতী শোভাযাত্রা, বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিযোগিতা, নজরুল সংগীতের উপর কর্মশালা, একক আবৃত্তি, বৃন্দ আবৃত্তি, নজরুল সংগীত, দলীয় সংগীত, আলোচনা, দলীয় নৃত্য, পুরস্কার বিতরণ ও প্রকাশনাসহ নানান আয়োজন। সমাপনী দিবসে মহকুমা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের অতিথিদের বিভিন্ন উপহার প্রদান ও সম্মাননা জানানো হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমি এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই মিলনমেলা এবং সাংস্কৃতিক সমারোহ অনুষ্ঠানটি ছিল অত্যন্ত আকর্ষণীয়, নান্দনিক। যাতে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন রাজ্যের বিভিন্ন মন্ত্রীবর্গ, মুখ্য সচিব থেকে শুরু করে পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তাগণ। তাঁদের সবার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে কাজী নজরুল ইসলামের অসাধারণ ভূমিকা এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা।
সংস্কৃতি ও নজরুলপ্রেমী বিভিন্ন স্তরের শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংগঠকদের উৎসবমুখর পদচারণায় অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ সত্যিকার অর্থেই এক প্রাণবন্ত বর্ণিল মিলন মেলায় পরিনত হয়েছিল।
বৃহৎ ভারতের ক্ষুদ্র একটি রাজ্য ত্রিপুরায় এত নজরুলপ্রেমী শিল্পী সাহিত্যিক কবি আছেন তা আমার জানা ছিলনা। বিভিন্ন গ্রুপের অসাধারণ দলীয় পরিবেশনা, আবৃত্তি, নৃত্য আমাদের মন ছুঁয়ে গেছে। আমাদের যে ভাবে আন্তরিক আতিথেয়তা, আপ্যায়ণ ও সম্মান জানানো হয়েছে তাতে আমরা কানায় কানায় পূর্ণ।কাজী নজরুল একাডেমি এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সদস্য-সদস্যদের আন্তরিকতার কথা মনে রাখবার মতো। বিচাপতি বিশ্বজিৎ পালিত, তাঁর অর্ধাঙ্গিনী মধুমিতা দি, এবং তাঁদের সন্তান সৌম্যদীপ পালিতের নজরুল প্রীতি, নজরুল চর্চা এবং নজরুলের প্রতি গভীর অনুরাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। বিচাপতি পালিত শুধুমাত্র এক অসাধারণ নজরুল সংগীত শিল্পীই নন, অসাধারণ এক সংগঠকও। তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টায় রেন্টার্স সোসাইটি এলাকাটাই সাংস্কৃতিক পল্লীতে রূপান্তর হয়েছে। তাঁর নিজস্ব বিল্ডিংয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন নজরুল একাডেমি এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন। নির্মাণ করেছেন কাজী নজরুল ইসলামের আবক্ষ মূর্তি। শুধু তাই নয় চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার এত ব্যস্ততার মধ্যেও বিচারপতি দম্পতি বাংলাদেশের অতিথিদের প্রতি সার্বক্ষণ খেয়াল রেখেছেন। একাডেমির সভাপতি চিন্ময় মজুমদারের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ড. মুজাহিদ রহমান আমাদের যাত্রা থেকে শুরু করে বাড়ি ফেরা পর্যন্ত সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছেন আমাদের সাথে টেলিফোনে। মৃণাল কান্তি পন্ডিত, গৌরাঙ্গ দা, চিত্রা দি, ড. কান্তা দি সবার ভূমিকাই মনে রাখার মত।
দেশ-বিদেশের অতিথিদের নিয়ে চার দিনব্যাপী একটি মিলন মেলার আয়োজন, ব্যবস্থাপনা এবং নিখুঁতভাবে সুসম্পন্ন করা সহজসাধ্য কাজ নয়। সেই কাজটি সুচারুরূপে সুসম্পন্ন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো ভারতের আগরতলার রেন্টার্স সোসাইটির কাজী নজরুল ইসলাম একাডেমি এন্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন।
নজরুল একাডেমিকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই এই বিশাল আয়োজনে আমাদেরকে আমন্ত্রণ জানার জন্য, বাংলাদেশকে এই বর্ণাঢ্য উৎসবের সংযুক্ত করার জন্য।অনুষ্ঠান যদিও হয়েছে শেষ, তবুও বহুদিন প্রাণে রয়ে যাবে এ অনুষ্ঠানের রেশ।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/প্রেবি/এসডি-০৯




