ছবি: সংগৃহিত
সিলেটের গোলাপগঞ্জে যৌতুকের বলি গৃহবধূ ঝুমকি হত্যার ন্যায় বিচার ও জড়িতদের শাস্তি দাবি জানিয়েছেন নিহতের পরিবার এলাকাবাসীও।
শনিবার (৬ জুন) বিকেলে সিলেট জেলা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। নিহত ঝুমকি রানী দেব’র বাবার পক্ষে সংবাদ সম্মেলন পড়ে শোনান তার চাচা হরিপদ দেব।
তিনি বলেন, এক হতভাগা পিতার কাধে সন্তানের লাশ বড়ই ভারী। প্রিয় সন্তান ঝুমকি দেবকে হারিয়ে তার পরিবার পাগল প্রায়। এমন ঘটনার জন্য তারা প্রস্তুত ছিলেন না। যৌতুকলোভী মানুষরূপী অমানুষদের নির্মম অত্যাচারে মাস্টার্স পাস ঝুমকি রানী দেব অকালে প্রাাণ হারালো।
তার বাবা লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, মাত্র দুই মাস আগে সে স্বামীর ঘরে গিয়েছিলো। ফিরেছে লাশ হয়ে। যে মেয়েকে হাড় খাটা পরিশ্রম দিয়ে, মায়া মমতায় বড় করেছি, সেই মেয়ের লাশ নিজ হাতে শেষকৃত্য করতে হয়েছে। এর চেয়ে দুঃখের কিছু আমার জীবনে নেই।
লিখিত বক্তব্যে সন্নৎ কুমার দেব বলেন, আজ আমি শুধু একাই আপনাদের সামনে হইনি, বাঘা এলাকার সর্বস্তরের মানুষ ঝুমকি দেব হত্যার বিচার চায়।
নিহত ঝুমকী রানী দেব সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানাধীন বাঘা ইউনিয়নের গৌরাবাড়ি গ্রামের সন্নৎ কুমার দের‘র মেয়ে। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র সবজি বিক্রেতা। কিছুদিন পূর্বে আমার আত্মীয় স্বজনের সহযোগীতায় তার একমাত্র ছেলে কৃষ্ণ দেবকে দুবাই পাঠিয়েছেন। তবে ভিসা সংক্রান্ত জটিলতায় সেখানে সে বর্তমানে কর্মহীন অবস্থায় রয়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সে নিজেও রয়েছে বেকায়দায়। আমার একমাত্র উপার্জনের উপর সংসারের ব্যয় নির্বাহ হয়। তিন কন্যার সবাইকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় আমার বড় মেয়ে ঝুমকি দেব বিগত ২০২৪ সালে ইতিহাস বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করে। বিয়ের যোগ্য হওয়ায় ঝুমকি দেবকে গত ৯ মার্চ একই ইউনিয়নের হেতিমগঞ্জ পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত সত্যেন্দ্র দাসের এইচএসসি পাশ ছেলে চঞ্চল দাসের বিয়ে দেন।
সন্নৎ দেব জানান, আমার আর্থিক দৈন্যতার কারণে আমার কন্যার সম পর্যায়ের ডিগ্রিধারী কোন পাত্র না পাওয়ায় আমার মেয়ের চেয়ে কম শিক্ষিত একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো চাকরী করা চঞ্চল দাসের সাথে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। গরীব হলেও মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে বিয়েতে যথাসাধ্য সব মালামাল দিয়েছি। বিয়ের পর কেবল ফিরা যাত্রার দুই দিন নাইওর করতে দিলেও মেয়ে জামাই ও তার পরিবারের সদস্যরা তাকে নাইওর দিত না। বিয়ের অল্পদিন পর হতে মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস, তার অপর দুই ভাই সঞ্জিত দাস ও রঞ্জিত দাস, তাদের স্ত্রী নন্দিনী দাস ও নিপা দাস জেমি এবং একান্নবর্তী চাচাতো ভাই স্বপন দাস পরস্পর যোগসাজশে আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতে শুরু করে। কম দামী ফার্নিচার দেয়ায় মেয়েকে খোঁটা দিত। স্বর্ণের চেইন না দেয়ায় চঞ্চল দাস গালিগালাজ করতো। কমদামী ফার্নিচার বদলে পিত্রালয় থেকে নতুন ফার্নিচার আনার জন্য চাপ দিতো।
সন্নৎ দেব বলেন, সম্প্রতি মেয়ের জামাতা চঞ্চল দাস পরিবারের সদস্যদের প্ররোচনায় দুবাই প্রবাসী পুত্রের নিকট থেকে ৫ লাখ টাকা এনে দিতে মেয়েকে চাপ দেয়। যৌতুক প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করলে মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত। পরিবারের অন্যান্য সদস্যগণও ঝুমকী রানীকে তাদের দাবী আদায়ের জন্য নানারূপ মানসিক নির্যাতন করত। চঞ্চল দাস গংদের এহেন ক্রমিক নির্যাতনের কারণে ঝুমকি দেব বিপর্যস্থ হয়ে পড়ে। ক্রমাগত নির্যাতনের বিবরণ তার দুই বোন অমি দেব ও সুমি দেবকে জানায়। বিষয়টি অসুস্থ বাবাকে জানাতে বারণ করে সে বলতো স্বামী ও পরিবারের সদস্যদের ম্যানেজ করে নিবে।
মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে গত ১২ মে ঝুমকি পিত্রালয়ে বেড়াতে আসে। পিত্রালয়ে অবস্থানকালে প্রায়ই তাকে বিমর্ষ দেখাত। অথচ স্বামীর মঙ্গলের জন্য একটানা ৪ দিন উপবাস থেকে সাবিত্রী ব্রত পালন করে। গত ২২ মে চঞ্চল ঝুমকীকে নিয়ে তার শ্বশুড়ালয়ে যান সন্নৎ দাস। তখন মেয়ে জামাই চঞ্চল দাস শ্বশুড়ের সাথে সাক্ষাৎ করতে অনীহা প্রকাশ করে। ঝুমকীর প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। ওই দিনই প্রথম মেয়ের প্রতি তার স্বামী ও পরিবারের নির্যাতন ও যৌতুক দাবীর বিষয়টি জ্ঞাত হন, দাবি সন্নৎ দেব’র। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দিন ২৪মে তার মেয়ের ব্যবহৃত মোবাইল থেকে ১২টা ৩৮ মিনিটে ফোন আসে। ফোন রিসিভ করে ঝুমকীর বোন অমি দেব। ফোনে ৪ মিনিট কথা বলে। এরপর থেকে তার সাথে পরিবারের সকল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ওই দিন সন্ধ্যা ৭টা ১ মিনিট থেকে ৭টা ৯ মিনিটের সময় ঝুমকীর স্বামী চঞ্চল দাসের বড় ভাই সঞ্চিত দাস তার ব্যবহৃত মোবাইল থেকে কল দিয়ে অমি দেবকে বলে- তুমি তোমার বোনের মোবাইলে ফোন দিয়ে তার খোঁজ নাও।
সঞ্চিত দাস এভাবে পরপর দুইবার ফোন দিয়ে একই কথা বলে। অমি দেব ও সুমি দেব এতে বিচলিত হয়ে ঝুমকি দেবের মোবাইলে বারবার কল দিলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি। এ অবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা ৫৪ মিনিটের সময় সঞ্চিত দাসের মোবাইলে ফোন দিয়ে ঝুমকি দেব গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা খবর দেন তার পিত্রালয়ে।
স্বজনরা গিয়ে দেখতে পান ঝুমকীর স্বামী চঞ্চল দাসসহ পরিবারের সকল সদস্য পলাতক। ঝুমকীর নিথর দেহ তার ভাসুর রঞ্জিত দাসের শয়নকক্ষে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলানো। পা দু’টো খাটের বিছানায় লাগানো, জিহ্বা মুখের ভেতরে ঢুকানো, দুই হাতের কব্জিতে শক্ত করে বাঁধা এবং গলার মাঝামাঝি সমান্তরাল রশির দাগ পরিলক্ষিত হয় সকলের। দরজার নীচের ছিটকিনি লাগানো থাকলেও সেটা যেকেউ খুলতে পারে। ঘরের ভেতর কুছুরি দরজা দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ আছে। তাতে অনুমেয়, হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তার নিথর দেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। লাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, এটি একটি হত্যাকান্ড। চঞ্চল দাসসহ বর্ণিত অভিযুক্ত ব্যক্তিরা যৌতুকের কারণে পরিকল্পিতভাবে মেয়েকে হত্যা করেছেন দাবি করেন এলাকাবাসী। পরবর্তীতে হত্যাকান্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চলছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করতে চাইলেও থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। নিরূপায় হয়ে গত ২ জুন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দন্ডবিধির ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় গোলাপগঞ্জ সি.আর মামলা নং- ২০৫/২০২৬ইং দায়ের করেছেন।
সন্নৎ দেব ও এলাকাবাসীর দাবি, যদি তাদের মেয়ে আত্মহত্যা করেই থাকে, তাহলে এই মৃত্যুর প্রচোরণার জন্য দায়িদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্তি জানান তারা। তবে তাদের দাবি এটি হত্যাকাণ্ড। তাই ঘটনাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসীর পক্ষে অন্তত ২৫/৩০ জন উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলন- আব্দুল কাদির, সেলিম মাহবুবুল আলম, নজরুল ইসলাম, কাদির হোসেন বাবুল, আবুল কালাম বাবুল, ফুরুক আল মাহমুদ, আরমান আলী, বুলবুল আহমদ প্রমুখ।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/প্রেবি/ইকে




