ছবি: এআই।

নদী কিংবা তীর নয়, এবার সমাতলে চোখ পড়েছে বালুখেকোদের। পুকুর খননের নামে সমতল এলাকায় গভীর গর্ত করে চলছে বালু উত্তোলনের মচ্ছব। বালুখেকোদের থাবা থেকে রক্ষা পাচ্ছে না বিদ্যুৎকেন্দ্র, ফসলী জমি, আবাসিক এলাকা ও রিসোর্ট। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা প্রশাসন, থানাপুলিশ ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাজুড়ে এই হরিলুট চলছে।



সূত্র জানায়, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বালু ও পাথরে সমৃদ্ধ। এতোদিন ধলাই নদী (সাদাপাথর) থেকে বালু ও পাথর লুট হতো। কিন্তু প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধির কারণে নদী থেকে পাথর ও বালু লুট কমেছে। তবে থেমে নেই লুটকারীচক্র। এবার তাদের চোখ পড়েছে নদী তীরবর্তী সমতল ভূমিতে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কোম্পানীগঞ্জের পাড়ুয়া, রুস্তুমপুর, ভোলাগঞ্জ, কালাইরাগ ও দুপড়িরপাড় থেকে চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। পাশের ভূমি থেকে গভীর গর্ত করে বালু উত্তোলন করায় ঝুঁকিতে পড়েছে পাড়ুয়া বিদ্যুৎকেন্দ্র। স্থানীয়রা জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রের দেয়ালঘেঁষে ৬০ শতক জায়গা ক্রয় করেন জনৈক রাসেল মিয়াসহ ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট।


গেল দুইমাস ধরে তারা সেখান থেকে বালু উত্তোলন করছেন। প্রথমে পেলোডার ও পরে গভীর গর্ত থেকে লিস্টার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। এতে ঝুঁকিতে পড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। বর্ষায় ভূমিধস হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ক্ষতিগ্রস্থের আশঙ্কা প্রকাশ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইনচার্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন।



স্থানীয়রা আরও জানান, উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদের ছত্রচ্ছায়ায় ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় সেখান থেকে বালু-পাথর লুট হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা  হলে শামীম আহমদের দুটি ফোন নাম্বার বন্ধ ও একটি চালু পাওয়া গেলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।  


এদিকে, উপজেলার রুস্তুমপুরের তিনতলা এলাকায় থানাপুলিশ ‘ম্যানেজ’ করে বালু উত্তোলনের মহোৎসব শুরু হয়। মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে ৬ মাসের ব্যবধানে বিশাল এলাকা গভীর পুকুরে পরিণত হয়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে স্থানীয় লোকজন ইউএনও’র কাছে অভিযোগ দিলেও কাজের কাজ হয়নি।


এছাড়া, ভোলাগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়ির পেছন ও ধলাই সেতু এলাকা থেকে প্রতিদিন ট্রলি দিয়ে চলে বালু উত্তোলন। ফাঁড়ির পেছনে বড় বড় গর্ত করে বালু উত্তোলন করা হয়। ফাঁড়ির পাশঘেঁষা ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল এন্ড রিসোর্টের চেয়ারম্যান আলকাছ আলী বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দিয়েছেন। তারপরও বন্ধ হচ্ছে না রিসোর্টের পেছন থেকে বালু উত্তোলন।



এদিকে দয়ারবাজার সংলগ্ন কালাইরাগ এলাকায় বালু উত্তোলন করে ধ্বংস করা হয়েছে পুরো একটি গ্রাম। বালু উত্তোলনের ফলে জলাশয়ে পরিণত হয়েছে পুরো গ্রাম। অভিযোগ রয়েছে, পূর্ব ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কতিপয় নেতার মদদে এই বালু উত্তোলন চলছে। কয়েকদিন আগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে প্রায় ৩ লক্ষ ঘনফুট বালু জব্দ করে। উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নের দুপড়িরপাড়, শিবনগর ও মনুরপাড় এলাকা থেকেও চলছে বালু উত্তোলন। প্রতিদিন লিস্টার মেশিন দিয়ে নদীর পাড় ভেঙ্গে চলে এই বালু উত্তোলন। দীর্ঘদিন থেকে সেখানে বালু উত্তোলন হলেও প্রশাসনের কোন নজরদারি নেই।


এ প্রসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খান জানান, কোম্পানীগঞ্জের কোথাও অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে বলে তার জানা নেই। বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান করে। অভিযানে পুলিশ সহযোগিতা করে। বর্তমানে কোন স্থানে বালু উত্তোলন হচ্ছে কি-না তা খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান ওসি।


বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের মচ্ছব চললেও নিজের কাছে কোন তথ্য নেই বলে জানান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা  মো. রবিন মিয়া। কোন তথ্য না থাকলে মাঝে মধ্যে অভিযান করেন কিভাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যখন যেখানে পাই, সেখানে অভিযান করি।’

 

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ