বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন শাখার নবগঠিত কমিটিকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ওঠায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই কমিটিটিকে ‘আওয়ামী লীগ- জামায়াত লিয়াজোঁ’ কমিটি বলে আখ্যায়িত করছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিতর্কিত কমিটি বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।


গত ২০ জুন জকিগঞ্জ উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক হাসান আহমদ ও সদস্য সচিব আমিন চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ৫ নম্বর জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন কৃষকদলের পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট আংশিক কমিটি অনুমোদন করা হয়।


কমিটিতে সভাপতি করা হয় আব্দুল হালিমকে, সিনিয়র সহসভাপতি হারুন রশিদ, সাধারণ সম্পাদক বাবুল হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক ময়নুল হক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হানিফ আহমদকে। একই সঙ্গে এক মাসের মধ্যে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে কমিটি ঘোষণার পরপরই দুই গুরুত্বপূর্ণ পদধারীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
 

অনুসন্ধানে জানা যায়, কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি হারুন রশিদ অতীতে আওয়ামী লীগের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তার একটি ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, তিনি ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন। কমিটি ঘোষণার পর সেই পোস্ট নতুন করে আলোচনায় এলে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

একইভাবে কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্ব পাওয়া বাবুল হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও শুরু হয় বিতর্ক। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট তিনি জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতে ইসলামীর সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও সিলেট জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা আনোয়ার হোসেন খানের সঙ্গে তার সাক্ষাতের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাম ঘোষণার পর সেই ছবিগুলো আবারও ভাইরাল হলে নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দেয়, জামায়াতের দায়িত্বশীল পদে থাকা একজন ব্যক্তি কীভাবে বিএনপির সহযোগী সংগঠন কৃষকদলের গুরুত্বপূর্ণ পদে স্থান পেলেন।
 

কমিটি ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিভিন্ন পোস্ট ও মন্তব্যে নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একই কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। অনেকে কমিটিটিকে ‘আওয়ামী লীগ-জামায়াত লিয়াজোঁ কমিটি’ বলেও অভিহিত করেন।
ফেসবুকে এম লিমন নামের একটি আইডি থেকে শেয়ার করা একটি স্ট্যাটাসে আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে ভোট চাওয়ার ছবি ও ফেসবুক স্ট্যাটাসের স্ক্রিনশট দিয়ে কৃষকদলের আহŸায়ক ও সদস্য সচিবের বিবেক নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।


এই স্ক্রিনশট দ্রæত ভাইরাল হয়ে যায় এবং উপজেলাজুড়ে শুরু হয় কঠোর সমালোচনা যা এখনো চলছে।
তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপির দুঃসময়ে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, মামলা-হামলা, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন না করে বিতর্কিত রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যক্তিদের নেতৃত্বে আনা হয়েছে। তাদের মতে, সাংগঠনিক যোগ্যতা ও ত্যাগের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বলয় ও প্রভাবকে প্রাধান্য দিয়েই এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এ বিতর্ক শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। শুক্রবার (২৬ জুন) বাদ আসর জকিগঞ্জ ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত কর্মিসভাতেও বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা হয়। সভায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, “শুনেছি জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের জাতীয়তাবাদী কৃষকদলের কমিটিতে জামায়াত-আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সত্য হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ধরনের কমিটি হয়ে থাকলে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করা উচিত।”


জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আমিনুর রশীদ রিপন অভিযোগ করে বলেন, বিএনপির ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে নিজেদের গ্রুপ শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে কতিপয় নেতা আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত ব্যক্তিদের কৃষক দলের নবগঠিত কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
তিনি এ ঘটনাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় আখ্যা দিয়ে বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা মাঠে ছিলেন, তাদের অনেককেই বঞ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক।

তিনি আরও বলেন, দলের আদর্শ ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা উপেক্ষা করে এ ধরনের কমিটি গঠন ভবিষ্যতে সংগঠনের জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দলীয় নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

একই মতামত জানিয়েছেন জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা ও উপজেলা বিএনপির মানবাধিকার বিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রউফ ময়নুল।


দলীয় সূত্রগুলোর মতে, কমিটি গঠনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অতীত ও বর্তমান অবস্থান যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেকের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ও পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে, যা তৃণমূলের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

এ নিয়ে কথা হলে নবগঠিত কমিটির সহসভাপতি হারুন রশীদ বলেন, আমি দীর্ঘ ৩০ বছর বিদেশে ছিলাম। আমি অনেককে চিনিনা, আবার অনেকে আমাকেও চিনেনা। তাছাড়া প্রতিহিংসাবসত কেউ কেউ এমন অপপ্রচার চালাতে পারে।


নবগঠিত কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাবলু হোসেন বলেন, আমি সবসময় বিএনপির সঙ্গে জড়িত। তবে একটি শ্রমিক সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জামায়াত নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন আমাকে। সেই ছবি ব্যবহার করে এখন তারা আমাকে জামায়াত নেতা বানিয়ে ফেলছে। এটা স্রেফ অপপ্রচার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, এমন একটা বিষয় হয়েছে শুনেছি, এটা খুবই দুঃখজনক। দলের দুর্দিনের কর্মীদের বঞ্চিত করে সুসময়ে অন্যদলের কর্মীদের মূল্যায়ন করা গঠনতন্ত্র বিরোধী কর্মকাণ্ড। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।


এ বিষয়ে উপজেলা কৃষকদলের আহ্বায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান হাসান আহমদ বলেন, এগুলো অপপ্রচার। কোনো ভিত্তি নেই।

জেলা কৃষক দলের আহবায়ক ইকবাল আহমদ তাপাদারের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি বিস্তারিত জানি। এগুলো একদল লোক মিলে অপপ্রচার করছে। এর কোনোই ভিত্তি নেই।

বিষয়টি তিনি এতই ভালো জানেন যে তদন্তেরও কোনো প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন সিলেটভিউকে।


 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/হাসিব/ইকে