কিশোরী বয়সে মাসিক শুরু হওয়া একজন মেয়ের জীবনের একটি স্বাভাবিক এবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু একটি শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন নয়, বরং শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক পরিপক্বতারও একটি ধাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনও মাসিককে ঘিরে রয়েছে নানান ভুল ধারণা, কুসংস্কার, লজ্জা ও সংকোচ | ফলে অনেক কিশোরী প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করার সময় আমি লক্ষ্য করেছি, অনেক কিশোরী ও তাদের অভিভাবক মাসিকের অনিয়ম নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন | কেউ ভাবেন মাসিক দেরিতে হওয়া মানেই বড় রোগ, আবার কেউ অতিরিক্ত রক্তপাত বা তীব্র ব্যথাকেও স্বাভাবিক ভেবে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেন না | এই দুই ধরনের ধারণাই ক্ষতিকর | তাই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি |
মাসিক সাধারণত ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে শুরু হয় | প্রথম দুই থেকে তিন বছর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মাসিক কিছুটা অনিয়মিত হতে পারে | অনেক সময় ২১ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে চক্র পরিবর্তিত হয় | এটি অনেক ক্ষেত্রেই স্বাভাবিক | তবে যদি টানা তিন মাস মাসিক না হয়, অত্যধিক রক্তপাত হয়, সাত দিনের বেশি রক্তপাত চলতে থাকে, বা অসহনীয় ব্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত |
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অনেক কিশোরী প্রথম মাসিকের সময় ভয় পেয়ে যায়, কারণ আগে থেকে কেউ তাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলেনি | অনেক মা ও সংকোচের কারণে মেয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেন না | অথচ একটি খোলামেলা আলোচনা একটি কিশোরীর আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে | তাই পরিবারের উচিত মেয়েদের মাসিক সম্পর্কে আগে থেকেই বৈজ্ঞানিক ও সহজ ভাষায় ধারণা দেওয়া |
মাসিকের সময় পরিচ্ছন্নতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | পরিষ্কার স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহার করা, সময়মতো পরিবর্তন করা, পরিষ্কার অন্তর্বাস পরা এবং নিয়মিত গোসল করা স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য | এখনও অনেক এলাকায় মাসিকের সময় গোসল করা যাবে না বা রান্নাঘরে যাওয়া যাবে না এ ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে | এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই |
পুষ্টির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | কিশোরীদের শরীর দ্রুত বেড়ে ওঠে | তাই তাদের আয়রন, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের চাহিদা বেশি থাকে | শাকসবজি, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, ফলমূল ও পর্যাপ্ত পানি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা উচিত | অতিরিক্ত জাঙ্ক ফুড, কোমল পানীয় ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতিকর |
অনেক কিশোরী মাসিকের সময় তীব্র ব্যথার কারণে স্কুলে যেতে পারে না | কিছু ব্যথা স্বাভাবিক হলেও, যদি ব্যথা এত বেশি হয় যে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হয়, তাহলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন | একইভাবে অতিরিক্ত রক্তপাত হলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে, যা পড়াশোনা, মনোযোগ ও শারীরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে |
আমার পরামর্শ হলো, প্রতিটি কিশোরী তার মাসিকের তারিখ একটি ক্যালেন্ডার বা মোবাইল অ্যাপে লিখে রাখবে | এতে মাসিকের নিয়মিততা বোঝা সহজ হয় এবং চিকিৎসকের কাছে তথ্য দিতে সুবিধা হয় |
বিদ্যালয়ের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ | নিরাপদ টয়লেট, বিশুদ্ধ পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা একটি কিশোরীবান্ধব শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলে | শিক্ষকরা যদি সংবেদনশীল ও সহায়ক হন, তাহলে কিশোরীরা সমস্যার কথা বলতে আরও স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে |
অভিভাবকদেরও মনে রাখতে হবে, মাসিক নিয়ে সন্তানকে ভয় দেখানো বা লজ্জা দেওয়া নয় বরং তাকে সাহস ও সঠিক তথ্য দিতে হবে | একজন সচেতন মাবাবা একটি কিশোরীর সুস্থ ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন |
একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসক হিসেবে আমি মনে করি, স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ হলো স্বাস্থ্যশিক্ষা | অনেক সমস্যা শুধু সঠিক তথ্য ও সচেতনতার মাধ্যমেই প্রতিরোধ করা সম্ভব | কিশোরীদের জানতে হবে মাসিক কোনো রোগ নয়, এটি সুস্থ জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ | তবে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ |
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে কোনো কিশোরী মাসিক নিয়ে লজ্জা, ভয় বা কুসংস্কারের শিকার হবে না | পরিবার, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং গণমাধ্যম একসঙ্গে কাজ করলে আমরা এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব |
আসুন, আমরা সবাই কিশোরীদের পাশে দাঁড়াই | তাদের সঠিক তথ্য দিই, সম্মান করি এবং এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করি, যেখানে তারা সুস্থ, নিরাপদ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠতে পারে | আজকের সচেতন কিশোরীই আগামী দিনের সুস্থ মা, দক্ষ নাগরিক এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশের শক্তি।
লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চিকিৎসক, এসএমসির ব্লুস্টার স্বাস্থ্যসেবা দানকারী, পল্লী শিশু ফাউন্ডেশন হতে মা ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ও মাসিকজনিত সমস্যার প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।




