এক বছর আগে রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রকাশ্যে ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে পিটিয়ে ও ইট-পাথর দিয়ে থেঁতলে হত্যার ভিডিও দৃশ্য স্তম্ভিত করেছিল পুরো দেশকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সেই নৃশংসতার ভিডিও ঘিরে দ্রুত বিচারের দাবি উঠেছিল নানা মহল থেকে। কিন্তু ওই হত্যাকাণ্ডের এক বছর পার হলেও এখনো শুরু হয়নি বিচারকাজ। তদন্ত শেষ হয়ে অভিযোগপত্র আদালতে গেলেও মামলাটি এখনো অভিযোগ গঠনের ধাপেই আটকে আছে।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলাটি বর্তমানে অভিযোগ গঠন পর্যায়ে রয়েছে। আগামী রোববার ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে অভিযোগ গঠনের শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ গঠনের পরই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হবে।


অন্যদিকে, ঘটনার পর সরকার মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দিলেও এক বছরেও সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি। বাদীপক্ষের দাবি, এতে বিচার প্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘায়িত হয়েছে।

বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়াউল হক বলেন, মামলাটি বর্তমানে বিচারিক আদালতে রয়েছে। তবে এখনো বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা চাই মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ জুলাই হত্যাকাণ্ডের পরদিন নিহত সোহাগের বড় বোন মঞ্জুয়ারা বেগম কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা করেন।

তদন্ত শেষে একই বছরের ৮ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও আসামিদের নাম-পরিচয়সহ কিছু বানান ও তথ্যগত অসংগতি ধরা পড়ে। পরে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন। এর পর তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন করা হয়। চলতি বছরের জুন মাসে সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হলে সেটি গ্রহণ করা হয়। পরে ২১ জুন মামলাটি ঢাকার মহানগর চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বিচারের জন্য ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। বাদীপক্ষের অভিযোগ, তদন্তে গাফিলতির কারণেই মামলাটিতে দুই দফায় অভিযোগপত্র দিতে হয়েছে। এর ফলেই বিচার শুরু হতে এক বছর লেগে যায়।

যেভাবে ঘটেছিল সেই নৃশংস হত্যা: ২০২৫ সালের ৯ জুলাই পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল কম্পাউন্ডে সংঘটিত হয় বহুল আলোচিত ওই হত্যাকাণ্ড। প্রত্যক্ষদর্শী এবং পরে পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগকে প্রথমে হাসপাতাল চত্বরে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়। পরে তার নিথর দেহ টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরের সড়কে এনে শত শত মানুষের সামনেই চলে আরও বর্বরতা। ভিডিওতে দেখা যায়, মৃত্যুর পরও সোহাগের মরদেহে একের পর এক লাথি, কিল-ঘুসি ও ইট-পাথর দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। একজন হামলাকারী মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

আরেকজন দৌড়ে এসে নিথর দেহের বুকের ওপর লাফিয়ে ওঠে। চারপাশে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে থাকলেও আতঙ্কে কেউ এগিয়ে আসেনি। ঘটনার সময় হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চলছিল এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে আনসার সদস্যরাও ছিলেন। পরে সোহাগকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের তদন্ত থেকে এবং নিহত সোহাগের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মিটফোর্ড এলাকায় পুরোনো বৈদ্যুতিক কেবল ও ভাঙারি ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। নিহত সোহাগ ‘সোহানা মেটাল’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেন। ওই এলাকার তামার তার ও সাদা তারের ব্যবসার একটি বড় অংশ তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। এক সময় সোহাগেরই বন্ধু মাহমুদুল হাসান মহিন ও সারোয়ার হোসেন টিটু ওই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের অংশীদার হতে চেয়েছিলেন। তারা ব্যবসার ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ অথবা নিয়মিত চাঁদা দাবি করেন।

এ নিয়ে বিরোধের জেরেই পরিকল্পিতভাবে সোহাগকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিন তাকে তার দোকান থেকে ডেকে নিয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। নিহতের স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, নিহত সোহাগ এবং হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া মহিন, টিটুসহ আরও কয়েকজন ৩০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং স্থানীয়ভাবে যুবদলের নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। তবে সংগঠনে তাদের আনুষ্ঠানিক কোনো পদ ছিল কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ওই হত্যার ঘটনায় নিহতের বোন মঞ্জুয়ারা বেগম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন। মামলায় মাহমুদুল হাসান মহিন, সারোয়ার হোসেন টিটু, মনির ওরফে ছোট মনির, আলমগীর, মনির ওরফে লম্বা মনির, নান্নু, সজীব, রিয়াদ, টিটন গাজী, রাকিব, সাবা করিম লাকী, কালু ওরফে স্বেচ্ছাসেবক কালু, রজব আলী পিন্টু, মো. সিরাজুল ইসলাম, রবিন, মিজান, অপু দাস, হিম্মত আলী, আনিসুর রহমান হাওলাদারসহ অজ্ঞাতপরিচয় ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়।


সম্পূরক অভিযোগপত্রে হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে ১০ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বর্তমানে ১৩ জন আসামি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। তবে সারোয়ার হোসেন, মনির, অপু, জহির, ইমরান, শারাফাত, হোসেন চৌকিদার ও জিয়াউদ্দিন এখনও পলাতক।


নিহত সোহাগের বড় বোন ও মামলার বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ‘আমার ভাই গত বছর ৯ জুলাই নির্মমভাবে খুন হয়। এক বছর পার হলেও আজও ওই হত্যা মামলার কোনো অগ্রগতি বা বিচারকাজ শুরু হয়নি। এই মামলার অনেক আসামি এখনো পলাতক; অথচ তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে।’

ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যার এক বছরপূর্তিতে পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার, ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল মিটফোর্ড হাসপাতালের গেটের সামনে মানববন্ধন করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। বেলা ১১টায় নিহত সোহাগের পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত এ মানববন্ধনে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকাবাসীসহ শতাধিক মানুষ অংশ নেন।


মানববন্ধনে নিহত সোহাগের ভাগনি বীথি আক্তার বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে, মামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত এক আসামিকে বাঁচাতে একটি মহল পুলিশের সঙ্গে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাকে রক্ষা করেছে। পলাতক আসামিরা আমাদের ব্যবসায় বাধা দিচ্ছে, দখলের চেষ্টা করছে এবং নিয়মিত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। আমরা বর্তমান সরকারের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও দ্রুত বিচার চাই।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক


সূত্র : কালবেলা