ছবি: এআই।
সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টার ভবন ভাঙা এবং লিজগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদে হাইকোর্টের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন নিষেধাজ্ঞা (ইনজাংশন) আরও ছয় মাসের জন্য বহাল রাখা হয়েছে। ফলে আগামী বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ভবনটি ভাঙা বা সেখানে ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। বুধবার (২৯ জুলাই) গণমাধ্যমে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জিন্দাবাজার ওভারসিজ সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম মাহিদ।
জানা যায়, গত ২০ জুলাই মহামান্য হাইকোর্ট আবেদনকারীদের পক্ষে পূর্বে দেওয়া আদেশ বহাল রেখে নতুন করে আরও ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ইনজাংশন প্রদান করেন। আদালতের এ আদেশ আগামী ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আগে, গত ২৮ এপ্রিল বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জেলা প্রশাসনের ভবন ভাঙা ও ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদের সিদ্ধান্তের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেন, যথাযথ বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ছাড়া ভবনের প্রকৃত অবস্থা কারিগরি মূল্যায়ন না করে কোনো ধরনের উচ্ছেদ বা ভাঙার কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। পাশাপাশি আবেদনকারী ব্যবসায়ীদের দখল ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর আগে, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তৎকালীন জেলা প্রশাসন বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে লিজ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে দোকান খালি করার নির্দেশ দেয়। এর পরবর্তী সময়ে এই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি আদালত একটি রুল জারি করে জেলা প্রশাসককে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়, বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়া ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও অবৈধ ঘোষণা করা হবে না।
তবে লিজগ্রহীতা ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০১৯ সালে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় বাংলাদেশ ওভারসিজ সেন্টারের নাম ছিল না। ১৯৭৮ সালে প্রবাসীদের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮২ সালে চালু হওয়া এই বাণিজ্যিক ভবনে তারা প্রায় ৪৪ বছর ধরে নিয়মিত ভাড়া ও জমিদারী খাজনা পরিশোধ করে আসছেন। এছাড়া ২০১০ সালে ট্রাস্টের ১০৯তম সভায় ব্যবসায়ীদের স্থায়ী লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও আজ পর্যন্ত কোনো লিখিত স্থায়ী লিজ ডিড দেওয়া হয়নি। তবে এরপরও নিয়মিত ভাড়া গ্রহণ ও রশিদ প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
হাইকোর্টের সর্বশেষ আদেশকে স্বাগত জানিয়ে ওভারসিজ সেন্টার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাহিদুল ইসলাম মাহিদ বলেন, ‘মহামান্য হাইকোর্ট পুনরায় আমাদের পক্ষে আরও ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন ইনজাংশন প্রদান করেছেন, যা আগামী ১৯ জানুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। আদালতের এ আদেশে আমরা অত্যন্ত সন্তুষ্ট এবং আদালতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের উপস্থাপিত নথিপত্র, তথ্য-প্রমাণ ও আইনগত অবস্থান বিবেচনা করেই আদালত দ্বিতীয়বারের মতো আমাদের আইনগত সুরক্ষা দিয়েছেন। শুরু থেকেই আমরা আইন মেনে চলেছি এবং আদালতের প্রতি আস্থা রেখেছি। আমরা বিশ্বাস করি, মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতেও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার সংরক্ষিত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সরওয়ার আলম ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যদের অবগত না করে, কোনো সভা বা আলোচনা ছাড়াই এককভাবে ভবনটি ভেঙে ফেলার উদ্যোগ নেন। এতে ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন এবং কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ব্যাহত হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী মানবেতর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা কখনো উন্নয়নের বিরোধিতা করেননি। তারা আধুনিক, নিরাপদ ও পরিকল্পিত ভবন নির্মাণের পক্ষেই রয়েছেন। তবে ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার, লিখিত চুক্তি, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত না করে কোনো উচ্ছেদ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’
তিনি অভিযোগ করেন, ২০০২ সালে লিজের মেয়াদ শেষ হলেও প্রশাসন পরবর্তী প্রায় দুই দশক নিয়মিত ভাড়া গ্রহণ করেছে। ২০১০ সালে স্থায়ী লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করেই ২০২৫ সালে হঠাৎ ভাড়া ৮ টাকা থেকে ১০০-১৫০ টাকায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিষয়টি নিষ্পত্তির আগেই ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়। এমনকি রুল জারি ও আদালতের আদেশ কার্যকর থাকা অবস্থাতেও ব্যবসায়ীদের ওপর দোকান খালি করার জন্য বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ২০১০ সালের ট্রাস্টের ১০৯তম সভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাদের স্থায়ী লিজ বা মালিকানা প্রদান করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে লিখিত চুক্তি, যথাযথ পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ এবং পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা। তাদের ভাষ্য, উন্নয়ন অবশ্যই হোক, তবে তা আইন, ন্যায়বিচার এবং ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকার সংরক্ষণ করেই বাস্তবায়ন করতে হবে।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া-০৮




