ছবি: সংগৃহিত

বাঁ চোখে অস্ত্রোপচারের পর ব্যান্ডেজ। ডান চোখটি খোলা থাকলেও দৃষ্টি ঝাপসা। স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারছেন না। হাসপাতালে খোঁজ নিতে গেলে এই প্রতিবেদকের হাত ধরে বললেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন।’

 


রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিক্ষার্থী আলিফ চৌধুরীর এই অবস্থা দেখা গেল আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে। গত মঙ্গলবার হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা-কর্মীদের ওপর বিএনপির নেতা-কর্মীদের হামলার সময় চোখে গুরুতর আঘাত পান এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির এই নেতা।

 

আলিফ ছাত্রশক্তির হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার সংগঠক। তিনি উপজেলার হোমল্যান্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। মঙ্গলবার আহত হওয়ার পর উন্নত চিকিৎসার জন্য বুধবার তাঁকে ঢাকায় আনা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে তাঁর বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন তিনি জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

 

বৃহস্পতিবার বিকেলে আলিফের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যায় এই প্রতিবেদক। তাঁর কেবিনে গিয়ে দেখা যায়, ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতা-কর্মী তাঁর দেখাশোনা করছেন। সেখানে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন ও যুগ্ম সদস্যসচিব এস এম সাইফ মোস্তাফিজও ছিলেন।

 

আলিফ চোখ বন্ধ করে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে ছিলেন। এই প্রতিবেদক সামনে গেলে তিনি ডান চোখের পাতা আঙুল দিয়ে খুলে দেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভালোভাবে দেখতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে প্রতিবেদকের হাত ধরে বলেন, ‘আমার জন্য দোয়া করবেন।’

 

কক্ষের বাতি জ্বালানো থাকায় অস্বস্তি হচ্ছিল আলিফের। তিনি আঙুলের ইশারায় বাতি নেভাতে বলেন। পরে বাতি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

 

এ সময় এনসিপির নেত্রী মনিরা শারমিনের সঙ্গে আলিফের কিছু কথা হয়। একপর্যায়ে তিনি মনিরাকে প্রশ্ন করেন, ‘আমার দৃষ্টিশক্তি কি ফিরে আসবে?’ পরক্ষণেই নিজে বলেন, ‘না এলেও সমস্যা নাই।’ পাশাপাশি আঙুলের ইশারায় বোঝান, তিনি ঠিক আছেন।

 

হাসপাতালের কক্ষে উপস্থিত এনসিপি ও ছাত্রশক্তির নেতাদের আলিফ ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলেন, তিনি কারও ওপর হামলা করতে যাননি। তিনি সুস্থ ধারার রাজনীতি চান। রাজনীতির নামে হানাহানি ও মারামারির অবসান চান। তাঁর মতো আর কাউকে যাতে চোখ হারাতে না হয়, সেই প্রত্যাশার কথাও জানান তিনি।

 

বৃহস্পতিবার সকালে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে আলিফের বাঁ চোখে অস্ত্রোপচার হয়। বিকেলে তাঁকে দেখতে যান এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াসহ দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা। পরে হাসপাতালের সামনে তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে আলিফের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরেন এনসিপির চিকিৎসক সংগঠন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের সদস্যসচিব ডা. আবদুল আহাদ। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার সকালে চিকিৎসকদের মেডিক্যাল বোর্ড বসে। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সকালে অস্ত্রোপচার করা হয়। তাঁর ভাষ্য, আলিফের বাঁ চোখের দৃষ্টিশক্তি আর ফিরবে না। ডান চোখেও তিনি ঝাপসা দেখছেন।

 

আলিফের চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত একজন চিকিৎসক প্রথম আলোকে বলেছেন, পর্যবেক্ষণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাঁ চোখের প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আলিফের বাঁ চোখে এক্সটেনসিভ ইনজুরি হয়েছে। সেখানে অস্ত্রোপচার হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের পর প্রকৃত অবস্থা বলা যাবে।’

 

এনসিপির নেতারা জানিয়েছেন, উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী আলিফের বাবা অসুস্থতার কারণে হাঁটতে পারেন না। তাঁর মা প্রতিবন্ধী। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। বড় ভাইও পরিবারটির দায়িত্ব নেওয়ার অবস্থায় নেই। পড়াশোনার পাশাপাশি আউটসোর্সিং ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করে পরিবারের ব্যয় বহন করতেন আলিফ।

 

এদিকে আলিফের চিকিৎসার ব্যয় বহন এবং তাঁকে ও পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়াসহ সরকারের প্রতি তিন দফা দাবি জানিয়েছে এনসিপি। তাদের অন্য দাবিগুলো হলো হবিগঞ্জে হামলায় জড়িত ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা এবং এনসিপিসহ গণতান্ত্রিক বিরোধী দলগুলোকে কথা বলতে দেওয়ার পাশাপাশি এনসিপির জুলাই পদযাত্রাসহ সব কর্মসূচির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইকে