ছবি: সংগৃহিত
সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে হামে সর্বোচ্চ মৃত্যু হাওরের জেলা সুনামগঞ্জে। গত ৬ মাসে এই জেলায় হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন ৫২ জন, যাঁদের ৫১ জনই শিশু বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। হাম ঠেকাতে সরকারের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও টিকাদান শুরুর পর থেকে হাম ও উপসর্গে আক্রান্ত ও মৃত রোগীর সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে।
প্রতিদিন জেলার দুর্গম এলাকা থেকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে হামে আক্রান্ত শিশু রোগী। আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই টিকার আওতায় আসেননি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ । তাই জেলায় হামে মৃত্যু ও সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা যায়,জেলার দুর্গম উপজেলাগুলো থেকে হামের উপসর্গ লালচে র ্যাশ, প্রচন্ড জ্বর আর শ্বাসকষ্টের যন্ত্রণা নিয়ে জেলা সদর হাসপাতালে ছুটে আসছেন একের পর এক শিশু। হাসপাতালের বারান্দা থেকে শুরু করে মেঝে কোথাও খালি নেই। একদিকে শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই শিশুদের আকুতি, অন্যদিকে হাসপাতালের ভেতরের চিকিৎসা সামগ্রীর চরম সংকট রয়েছে বলে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ।
আক্রান্ত শিশুদের সিংহভাগই দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও জামালগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। হাওরের ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা আর যোগাযোগের দুর্গমতাকে জয় করে সময়মতো পৌঁছেনি টিকাদান কার্যক্রম। ফলে যে সুরক্ষাবলয় তৈরি হওয়ার কথা ছিল তাতেই দেখা দিয়েছে বড় ধরনের ফাঁরাক। স্বজনদের দাবি, টিকাদান কর্মসূচির সঠিক তথ্য ও সময়সূচি তারা পাননি।
হাম একটি ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় রোগীদের আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা জরুরি। কিন্তু সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের চিত্র একদম উল্টো পৃথক কোনো আইসোলেশন ব্যবস্থা না থাকায় অন্য শিশু রোগীদের সাথেই মেঝেতে চাদর বিছিয়ে রাখা হচ্ছে নোংরা পরিবেশে হাম রোগীদের।
বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও তা দেয়া হচ্ছে না। এবং সবকিছুই বাহির থেকে কিনে আনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রোগীর স্বজনদের।
চলতি বছরের এপ্রিল মাস থেকে আগষ্ট মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর হাসপপাতালসহ জেলার উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে চিকিৎসা নিয়েছে সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৩ হাজার ১০ জন এবং সুস্থ্য হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২ হাজার ৮৫১ জন।
এরমধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম রোগী সংখ্যা ৩৫১ জন। এবং হামে আক্রান্ত হয়ে সুনামগঞ্জসহ ও সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন সুনামগঞ্জের ৫৩ জন রোগী। মৃত্যুর হারের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে ছাতক উপজেলা। এখন পর্যন্ত এই উপজেলা হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ১৪ জন শিশু রোগী।
এছাড়াও শান্তুিগঞ্জ উপজেলায় ৬ জন, দোয়ারাবাজারে ২ জন, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় ৪ জন, জগন্নাথপুরে ৭ জন, জামালগঞ্জে ১ জন,তাহিরপুর উপজেলা ২ জন, দিরাইয়ে ৬ জন ও সদর উপজেলায় ১১ জন রোগী হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন।
রবিবার ও সোমবার সরজমিনে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালে ৫ম তলার হাম ওয়ার্ডের ভেতরে,মেঝে, বারান্দায় শিশু রোগীতে ঠাসা। এমনও রোগী রয়েছে সপ্তাহের বেশি দিন সময় ধরে শিশুকে নিয়ে ভর্ত রয়েছেন। ভর্তিকৃত রোগীদের বেশির ভাগ স্বজন জানিয়ছেন, তারা তাদের শিশুকে হামরুবেলার বোস্টার টিকা দেননি। টিকাদানের সময় না জানা, টিকাদানে অনীহা ও সামাজিক কুসংসারসহ নানা কারণকে দায়ি করেছেন তারা।
সদর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আলমগীর বলেন, আমাদের বেদে পল্লীতে হামের সংক্রমন বেশি। গ্রামের ১২০-১৩০ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। এখনো হাসপাতালে ২৫ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। যারা আক্রান্ত হয়েছে তাদের বেশির ভাগই টিকার আওতায় আসেনি।
জামালগঞ্জ থেকে হাসপাতালে মেয়ে সন্তান নিয়ে ভর্তি থাকা সুহেনা নামের এক নারী বলেন, গত ৪ দিন ধরে হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে আছি। বাচ্চা শরীরে জ্বর,শ্বাস কষ্ট, খাবারদার খেতে পারে না। টিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন,বাচ্চাকে টিকা দেইনি। কবে টিকা দেয়া হইছে তাও জানি না। কেউ আমাদের বলেও না।
হাসপাতালের এক নার্স বলেন, হাসপাতালে যেসকল শিশুরা ভর্তি হচ্ছে তাদের অনেকেই টিকা দেয়নি। তারা শিশুদের ব্যাপারে অসচেতন। ভালো হয়ে যাওয়ার পর আবারও সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে আসতেছে।
মেডিকেল আবাসিক অফিসার ডাক্তার রফিকুল ইসলাম বলেন, বিগত সময়ের চেয়ে হাসপাতালে হামের রোগী বেড়েছে। ওয়ার্ডের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুন রোগী ভর্তি রয়েছেন। কাঙ্কিত সেবা দিতে আমাদের সমস্যা হচ্ছে। তারপরও ডাক্তার নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
জেলা সিভিল সার্জন ডাক্তার জসীম উদ্দিন জানালেন,পাঁচ বছরের বেশি এবং ৬ মাসের কম যেসব বাচ্চা মারা গেছে তারা মুলত টিকা পায় না এবং অনেক অসচেতন মানুষ আছে যারা টিকা দিতে আগ্রহী না। তবে আমরা চেষ্টা করছি টিকা দেয়ার।
অভিভাকদের সচেতনতা ও সরকারের শতভাগ ঠিকাদান কর্মসূচি যথাযথা বাস্তবায়নে হামের সংক্রমন ও মৃত্যু ঝুঁকি কমবে এমনটাই প্রত্যাশা সচেতন নাগরিকদের।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাহিদনূর/ইকে




