নিজেদের বাসা-বাড়িই কি একেকটি বৃদ্ধাশ্রম বানিয়ে ফেলেছি আমরা?

শত কোটি টাকার মালিক আব্দুস সাত্তার। অর্থ-বিত্ত, প্রাচুর্য—কোনো কিছুরই অভাব ছিল না তাঁর। ছিল সুরম্য অট্টালিকা, ছিল জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জন। অথচ শেষ জীবনে এসে সেই অট্টালিকাটিই যেন তাঁর কাছে পরিণত হয়েছিল এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে।


বয়োবৃদ্ধ স্ত্রী সুরাইয়াকে নিয়ে সেই বিশাল বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। তিলে তিলে গড়ে তোলা সন্তানরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পাড়ি জমিয়েছেন হাজার হাজার মাইল দূরে—কেউ লন্ডনে, কেউ আমেরিকায়। সন্তানদের জীবনে সাফল্য এসেছে, কিন্তু বাবা-মায়ের জীবনে নেমে এসেছে নিঃসঙ্গতা।
 

আব্দুস সাত্তারের ঘটনা নিছক একটি পরিবারের গল্প নয়। বৃহত্তর সিলেটে এমন অসংখ্য অট্টালিকা রয়েছে, যেগুলো বাইরে থেকে বিলাসবহুল ও অভিজাত; অথচ ভেতরে বসবাস করেন একাকী বাবা-মা। সন্তানরা বিদেশে, আর বাবা-মা পড়ে থাকেন দেশের মাটিতে—স্মৃতি, সম্পদ আর অপেক্ষাকে সঙ্গী করে।

আমরা বৃদ্ধাশ্রমের কথা শুনলেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ি। বলি—‘আমাদের সংস্কৃতিতে বৃদ্ধাশ্রম নেই।’ কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, বৃদ্ধাশ্রমের জন্য আলাদা কোনো ভবনের প্রয়োজন হয় না। সন্তানরা যখন বছরের পর বছর বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকে, তখন কোটি টাকার অট্টালিকাটিও একেকটি নিঃসঙ্গ বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হতে পারে।
 

বাবা-মায়ের দেখভালের জন্য হয়তো একজন গৃহকর্মী থাকে, হয়তো কোনো দূরসম্পর্কের আত্মীয় খোঁজখবর নেন। মাসে টাকা যায়, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যায়, ভিডিও কলে কথা হয়। কিন্তু এসব কি সন্তানের শারীরিক উপস্থিতির বিকল্প হতে পারে?

বৃদ্ধ বয়সে মানুষ শুধু অর্থের নিরাপত্তা চায় না; চায় আপনজনের সান্নিধ্য। চায় পাশে বসে দুটো কথা বলার মানুষ। অসুস্থ হলে মাথায় হাত রাখবে এমন একজন। রাতের নিস্তব্ধতায় দরজার ওপাশে আপনজনের উপস্থিতি অনুভব করতে চায়।

আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া এবং গৃহকর্মী তাহমিনার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে সেই নির্মম বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণ করবে তদন্ত। তবে এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—বৃদ্ধ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা, মানসিক শান্তি এবং সঙ্গ দেওয়ার দায়িত্ব আমরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে পালন করছি?
 

নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়, সন্তান বা নিকটাত্মীয় কেউ সেখানে থাকলে এই দুর্ঘটনা ঘটত না। কিন্তু একজন আপনজনের নিয়মিত উপস্থিতি যে একজন বয়স্ক মানুষের নিরাপত্তা ও মানসিক শক্তি বাড়ায়, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে সন্তানদের বিদেশে যেতে হয়—এ বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করছি না। উন্নত জীবনের প্রত্যাশাও অপরাধ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই উন্নত জীবনের মূল্য যদি বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গতা হয়, তাহলে আমাদের সাফল্যের সংজ্ঞাটি কি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন নেই?
আব্দুস সাত্তারের চার সন্তান দেশে ফিরছেন। কিন্তু তাঁদের জন্য এখন অপেক্ষা করছে কী?
বাবা-মায়ের নিথর দেহ।
শোকের স্মৃতি।
জানাজা ও দাফন।
আর হয়তো সারাজীবনের এক অসহনীয় আফসোস—
‘আর একটু আগে যদি পাশে থাকতাম!’
সন্তানদের কাছে তাই অনুরোধ—বাবা-মায়ের জন্য শুধু অর্থ পাঠাবেন না, সময়ও দিন। শুধু ভিডিও কল নয়, সুযোগ পেলেই তাঁদের পাশে দাঁড়ান। কারণ জীবনের শেষ বেলায় বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো আপনার পাঠানো টাকা নয়—আপনার উপস্থিতি।


মনে রাখা দরকার, মৃত্যুর পর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে যত কান্নাই করি না কেন, জীবদ্দশায় বাবা-মায়ের যে একাকিত্ব ছিল, তা আর পূরণ করা যায় না। বৃদ্ধাশ্রম শুধু কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। কখনো কখনো সন্তানের অনুপস্থিতিতে নিজের অট্টালিকাটিই হয়ে ওঠে বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় বৃদ্ধাশ্রম!

 

লেখক: সিনিয়র শিক্ষক ইংরেজি, আমির মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ।