ছবি: সংগৃহিত

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের তরুণ যুবকরা বেপরোয়া, বিশেষ করে সুনামগঞ্জের যুবকরা। যেকোনো মূল্যে ইউরোপে প্রবেশের জন্য তারা ছুটছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। সেই অদম্য স্বপ্নের মৃত্যু ঘটছে ভূম্যধ্যসাগরে। কখনো নৌকা ডুবি, কখনোবা পানি ও খাবারের অভাবে শেষ হচ্ছে তাদের জীবন।

 


কিন্তু দালালদের টিকিটিরও নাগাল পাচ্ছেন না ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা। পেলেও তাদের প্রভাব প্রতিপত্তির কাছে অসহায় সবাই। নিরবে শোকের চাদরে ঢেকে চলছে তাদের জীবন। প্রশাসন দালাল প্রতিরোধে সোচ্চার- এমন বুলি আওড়ালেও তাদের তেমন কোনো সাফল্য নেই। আর সাফল্য আসবেইবা কিভাবে, ভুক্তভোগীরা মুখই তাদের বিরুদ্ধে মুখই খোলেন না!

 

সম্প্রতি ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডিতে বাংলাদেশের অন্তত ১১ জনের মৃত্যুর খবরের পর সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ৭, জগন্নাথপুর উপজেলার ৩ ও দিরাই উপজেলার আরও ৩/৪ জন নিখোঁজের খবর প্রকাশ হয়। পরে অবশ্য মিশরের একটি হাসপতালে চিকিৎসা শেষে সেখানে আটক থাকা সিলেট বিভাগের ২৪ জনের ছবিসহ পরিচয় প্রকাশ করেছে মিশরের বাংলাদেশ দূতাবাস। এদের মধ্যে আবার ১২ জনই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিবিয়ায় অবস্থানরত সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই, দোয়ারাবাাজারসহ অন্যান্য উপজেলার কয়েকজন দালাল মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা তাদের প্রভাবশালী স্থানীয় অ্যাজেন্টদের ব্যবহার করে গ্রামাঞ্চল থেকে তরুণ ও যুবকদের ইউরোপের ইতালি স্পেন গ্রিসসহ অন্যান্য দেশে পাঠানোর নামে লিবিয়া নিয়ে যায়। সেখানে তাদের বন্দী করে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। এমনকি, তাদের সেই নির্যাতনের লাইভ ভিডিও দেখিয়ে দেশ থেকে নেওয়া হয় লাখ লাখ টাকা। এরপর আরও বিভিন্ন দালালের হাতে বদল হতে হয় তাদের।  

 

নির্যাতনের বিভিন্ন পর্যায় অতিক্রমের পর তাদেরকে অন্যান্য দেশের অভিভাসন প্রত্যাশিদের সাথে তুলে দেওয়া হয় ঝুঁকিপূর্ণ নৌকায়। সেই নৌকায় তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসী যাত্রা শুরু করেন। এই যাত্রায় সাফল্যের হার প্রায় নেই বললেই চলে। অনহারে অর্ধাহারে নৌকায় যাদের মৃত্যু হয়, তারা হয় সাগরের মাছের খাবার। কখনো নৌকা ডুবে প্রাণ যায় দুঃসাহসিক অভিযাত্রীদের।

 

এমন যাত্রায় ইদানিং সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই ও শান্তিগঞ্জ থানার যুবকরা পঙ্গপালের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। লিবিয়ায় থাকা পাচারকারীদের স্থানীয় অ্যাজেন্টরা অত্যন্ত কৌশলে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সদস্যরা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েন। আর তাই তারা তাদের নাম-ধাম প্রকাশ করেন না। তবে ৩ আগস্টের ট্র্যজেডির পর দোয়ারাবাজারের জসিম দালাল নামে একজনের নাম প্রকাশ্যে আসলেও তার আর কোনো বিস্তারিত পরিচয় জানাতে পারেন নি নিখোঁজ একজনের স্থানীয় অভিভাবক।

 

মাস কয়েক আগে সিলেটের এক নরসুন্দর তার আপন ভাইকে পাঠিয়েছিলেন লিবিয়ায়। উদ্দেশ্যে ছিল স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রা। এরপর মাস দু’য়েক আগের আরেক ট্র্যাজেডিতে তার ভাইয়ের মৃত্যু হয় নৌকায়, ভূমধ্যসাগরে। এই প্রতিবেদক অনেক চেষ্টা করেও তার কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট দালালের পরিচয় উদ্ধার করতে পারেন নি। তার সাফ কথা, আমি জানিনা। ভাই হারিয়েছি। আর নতুন ঝামেলায় জড়াতে চাইনা।

 

৩ আগস্ট ট্র্যাজেডির পর মিশরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শান্তিগঞ্জের যুবক আব্দুল করিম তার অভিভাবককে মোবাইলে নিজেদের দূরবস্থার বিবরণ দিয়েছেন। সেই অভিভাবক সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানালেও যথারীতি দালালদের নামধাম উচ্চারণ করেন নি মোটেও।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানবপাচারকারীদের স্থানীয় অ্যাজেন্টদের কেউ সিলেট মহানগী কেউ বা থাকে ঢাকা নগরীতে। নিজেদের নিরাপদ রাখতে তারা কৌশলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ঢুকিয়ে দেয়। আর সেই আতঙ্কের কারণেই কেউ তাদের নাম প্রকাশের সাহস করেনা।

 

এ ব্যাপারে কথা হয় শান্তিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক জালাল উদ্দীনের সাথে। তিনিও দুঃখ করে বলেন, আমরা অনেক প্রচারণা চালিয়েও এ ব্যাপারে ব্যর্থ। লোকজন দালালদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে। এমন কী তাদের জীবনও?


তিনি বলেন, আমরা এ ব্যাপারে থাানপুলিশের সঙ্গে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তারা যাতে গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এ জাতীয় দালালদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। আগামী আইন-শৃঙ্খলা কমিটি সভায় আমি বিষয়টি তুলে ধরব। এ ব্যাপারে আমাদের স্থানীয় সংসদ সদস্য এম কয়ছর আহমদও সচেতন। আমরা জনগনকে সচেতন করার কাজও করছি।

 

বিষয়টি নিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির কোনো উদ্যোগ আছে কি না জানতে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেনের মোবাইল নম্বরে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নি।

 

তবে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. অলিউল্লাহ জানান, তাদের কাছে দালালদের বিষয়ে কোনো অভিযোগ কেউ দেয়নি। তবে তাদের ধরতে পুলিশ তৎপর।

 

জগন্নাথপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামও জানিয়েছেন সেখানে কোনো অভিযোগ কেউ দেয়নি। তবে তারা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অবৈধভাবে বিদেশ যেতে দালালদের ফাঁদে না পা ফেলতে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তিনি বলেন, দালালদের পাবেন কই? কেউ থাকে ঢাকায়। কেউ থাকে সিলেটে। তাও আবার ভুক্তভোগীরা কোনো পরিচয় প্রকাশ করে না। তবু আমরা চেষ্টা করছি।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইকে-০৮