ছবি: সংগৃহিত
চালকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব, ভাঙাচোরা ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, অদক্ষ্য চালক, অতিরিক্ত গতি, ওভার টেকিং, নিয়ম না মানার প্রবণতা, যানজটে পড়ে সময় ক্ষেপণ হওয়ায় পরবর্তীতে দ্রুত চালিয়ে তা পুষিয়ে নেয়ার মানসিকতা, চালকদের বেসামাল আচরণের কারণে সিলেটের ওসমানীনগরে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে ঘটছে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা।
এসব দুর্ঘটনায় সড়কেই প্রাণ হারাচ্ছেন যাত্রী ও চলাচলকারীরা। বিগত কয়েকটি দুর্ঘটনা উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে স্থানীয়দের মনে। গত ১৫ দিনে মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে ৪টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৪জন। আহত হয়েছেন প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ।
জানা গেছে, চালকের ঘুম, বিশেষ করে ভোর ও সকালে বড় দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে। তন্দ্রাচ্ছন্নতার কারণেই স্টিয়ারিংয়ে বসেই ঢুলে পড়ছেন অনেক চালক। এছাড়া যত্রতত্র পার্কিং ও হাটবাজার-মহাসড়কের পাশে ভাসমান দোকান হাটবাজারকেন্দ্রিক যানজট দুর্ঘটনার ঝুঁকি সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক যেন দিন-দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মহাসড়কে দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে ।
স্থানীয়দের দাবি, সড়ক নিরাপত্তা আইন ও সচেতনতার অভাব, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং বেপরোয়া গতির কারণে জাতীয় মহাসড়ককের ওসমানীনগর অংশ যেন এখন পরিণত হয়েছে এক একটি ‘মৃত্যুর ফাঁদ’। দীর্ঘদিন ধরেই এসব সমস্যা চিহ্নিত হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়ে গেছে। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
কেন এত দূর্ঘটনা?
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলাকে দুর্ঘটনা ঝুকিপূর্ণ হিসাবে দেখছেন অনেকেই। মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার শেষ দক্ষিণদিকে শেরপুর টোলপ্লাজা এবং উত্তর দিকে শেষ সীমানা নাজির বাজার। উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রতিয়মান ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক। সিলেট থেকে ছেড়ে আসা দূরপাল্লার যানবাহান নাজির বাজার পেরিয়েই গতি বাড়িয়ে দেয়।
আবার ঢাকা থেকে আসা দূরপাল্লার গাড়ি টোলপ্লাজা অতিক্রম করলেই দ্রুত সিলেট ঢুকতে গতি বাড়িয়ে দেন। এতে করে বিপরিত দিক থেকে আসা যানবাহনের মধ্যে মুখমোখি ঘটছে দূর্ঘটনা। নাজির বাজার থেকে শেরপুর পর্যস্ত প্রায় ২৪ কিলোমিটার সড়কে রয়েছে প্রায় ১৯টি দূর্ঘটনা প্রবল স্থান। এসব স্থানে প্রতিনিয়ত ঘটছে সড়ক দূর্ঘটনা। বিগত সময়য়ে একই স্থানে একাধিক দুর্ঘটনায় নিহত হলেও দুর্ঘটনা প্রবল এলাকায় দূর্ঘটনা প্রতিরোধে তেমন কোন উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। একই স্থানে একাধিক দূর্ঘটনা স্থান হওয়ায় এসব স্থানকে ওসমানীনগরে সড়কে ডেঞ্জার জোন বলা হয়।
মহাসড়কের ডেঞ্জার জোন
সাদিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামন, সাদিপুর ভাঙ্গা, বেগমপুর বাজার-কাগজপুর, ১৯ মাইল(তমা কন্ট্রাশন এর সামনে), নাটকিলা, কসের তল, ব্রাম্মণ গ্রাম( পেট্রাল পাম্প সংলগ্ন), গোয়ালাবাজার সরকারি মহিলা কলেজের সামনে (বাঁক), গোয়ালাবাজার, গয়নাঘাট, ইলাশপুর, ওসমানীনগর থানার সামন-তালতলা, তাজপুর বাজার, কাজির গাঁ-চাঁনপুর, কাশিকাপন, ব্রাম্মণ শাসন (বাঁক), ১৩ মাইল, কুরুয়া ও নাজির বাজার পেট্রোল পাম্প এর এর আশ পাশ স্থান। এসব স্থানে বিগত দিনে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই এসব স্থানকে দুর্ঘটনা প্রবল এলাকা বিবেচনায় ডেঞ্জার জোন হিসাবে পরিচিত। প্রতিনিয়ত এসব স্থানে দুর্ঘটনা ঘটলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা গ্রহন না করায় ওসমানীনগরে এসব স্থানে মৃত্যুর মিছিল থামছে না।
এছাড়া, মহাসড়কের ওসমানীনগর অংশে সংকীর্ণ ও বেহাল রাস্তা, ভারী ও দূরপাল্লার গাড়ির বেপরোয়া গতি, এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ ও ধীরগতির সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ইজি বাইক অবাধ চলাচলকেও দায়ি করছেন অনেকেই। এদিকে, ‘ব্যাঙের ছাতার মতো’ গড়ে উঠেছে ইজিবাইক ও অটোরিকশার স্ট্যান্ড । এসব স্ট্যন্ড মহাসড়কের বাজার এলাকা দখল করায় প্রতিনিয়ত ছোট-ছোট দুর্ঘটনা ঘটছে বাজারে। খানাখন্দে বেহাল রাস্তায় গাড়ির চাকা গর্তে পড়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন অনেক সময়। শুষ্ক মৌসুমে গর্ত আর ধুলো ও বর্ষা মৌসুমে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় চালকদের। মহাসড়কের ৬ লেন নির্মাণ কাজও চলছে ধীর গতিতে। যার করাণে এসব সমস্যার প্রতিকার মিলছে না। সমস্যা নিরশনে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সড়ক ও জনপথকে একাধিকবার অবহিত করলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ কার্যত কোন ভূমিকা নিচ্ছে না বলে জানা গেছে।
ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নাহার আশা বলেছেন, এটা হাইওয়ে রোড এখানে আমরা প্রশাসন কিছু করতে পারবো না, সড়ক বিভাগ করতে হবে। ডিবাইডার ও স্পিড ব্রেকার দেয়ার বিষয়ে জানানো হয়েছে, কিন্তু এখনো কোন তা পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনা রোদে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে বার বার অবহিত করা হচ্ছে।
সড়ক বিভাগ সিলেট এর নির্বাহী প্রকৗশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেন বলেন, যে প্রজেক্টের আওতায় ঢাকা সিলেট মহাসড়কের কাজ চলমান রয়েছে তাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে দূর্ঘটনা রোদে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। তবে, দূর্ঘটনায় প্রাণহানি হলেও তেমন কোন উদ্যোগ দৃশ্যমান নেই মহাসড়কে।
এদিকে, সর্বশেষ ওসমানীনগরে তৈলবাহী ট্রাক সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে উল্টোপথে গিয়ে চাপা দিলে ঘটনাস্থলে একই পরিবারের ৩জনসহ ৪ জন নিহত ও অটোরিকশায় থাকা আরো ৩ যাত্রী গুরুত্বর আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ জনের অবস্থাও অশঙ্কাজনক রয়েছে। শনিবার দুপুর দুইটার দিকে গোয়ালালাবাজার ইউনিয়নের ব্রাম্মণগ্রাম এলাকায় এই দূর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকাগামী পদ¥া তৈলবাহী ট্রাক(ঢাকা মেট্রো-ঢ৪৪-০৬৫৪) সিএনজি অটোরিকশা (মৌলভীবাজার-থ-১১-৮৩৫৩)কে উল্টো পথে গিয়ে সামন দিক থেকে চাপা দিলে ঘটনাস্থল থেকে ৭জনকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ৪জনকে মৃত ঘোষণা করেন। দূর্ঘটনায় নিহতরা হলেন, শেরপুর মাঝেরপাড়া গ্রামের ফরিদ মিয়ার পুত্র লালন মিয়া(২৬), জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীরামিশী গ্রামের গফুর মিয়ার পুত্র নিয়ামত(৪৫), নিয়ামতের স্ত্রী উসুফা বেগম(৩০), মেয়ে আয়সা আক্তার(০৫)।
৭ আগস্ট উপজেলার কাশিকাপন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হয়েছে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট থেকে ঢাকাগামী ইউনিক পরিবহনের(ঢাকা মেট্রো- ব- ১৫-২৫৬৩) একটি বাসের সঙ্গে ঢাকা থেকে সিলেটগামী বেঙ্গল স্লিপার(ঢাকা মেট্রো- ব- ১২-৫৯৮৭) কোচের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ইউনিক পরিবহনের ৭ যাত্রী নিহত হন। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুই জন ও সর্বশেষ ১৩ আগস্ট ইউনিক বাসের হেলপার কিশোরগঞ্জের অস্টগ্রাম উপজেলার শরিদপুর গ্রামের সমছু মিয়ার ছেলে আব্দুল হোসেন (৩০) মারা যান। এই ঘটনায় আহত হন ২৪ জন। এই ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি ১৫ দিনে।
কাশিকাপন এলাকায় দূর্ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুনমুন নহার আশা বলেন, সড়ক বিভাগের মতামত লাগবে। তাদের মতামত পাইনি। তারাও কমিটির সদস্য। জেলা প্রশাসক মহোদয় আরেকটি কমিটি করে দিছেন ওই কমিটির সাথে শুপারিশ প্রেরণ করা হবে। শনিবার ব্রাম্মণ গ্রামে দূর্ঘটনায় নিহত ৪ জনকে নগদ ২০ হাজার ও আহতদের ১৫ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, ১০ আগস্ট ব্রাম্মণ গ্রামে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে মামুন পরিবহানের একটি যাত্রীবাহি বাস একটি প্রাইভেটকারকে চাপা দিলে প্রাইভেটকার দুমড়ে মুছড়ে যায়। এসময় প্রাইভেট কারের চালক গুরুতর আহত হন।
১৭ আগস্ট কাশিকানে প্রাইভেটকার এম্বোলেন্স মুখোমুখি সংঘর্ষে নারী শিশুসহ ৫জন আহত হয়েছেন। রাত ৯টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের তাজপুর ইউনিয়নের কাশিকাপন এলাকায় ঢাকাগামী এম্বোলেন্স (ঢাকা মেট্রো -ছ ৭১-১৬৬৮) ও সিলেট গামী প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ ১৭-০৪৩১) মুখোমুখি সংঘর্ষে দূর্ঘটনা ঘটে। এতে প্রাইভেটকারে থাকা শিশু-মহিলাসহ মোট ৫ যাত্রী আহত হন।
দুর্ঘটনা রোদে হাওয়ে পুলিশের ভূমিকার বিষয়ে জানতে শেরপুর হাইওয়ে পুলিশ ফাাঁরি ইনচার্য(ওসি) আনিসুর রহমানের সরকারি মোবাইল ফনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/রনিক/ইকে-০৫




