চলতি মাসেই বোয়িং ও এয়ারবাসের সঙ্গে পৃথক উড়োজাহাজ ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরের দিকে এগোচ্ছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এর মাধ্যমে জাতীয় পতাকাবাহী এই সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বহর সম্প্রসারণ হতে যাচ্ছে।
সম্ভাব্য এই চুক্তিতে আরো ১১টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। প্রক্রিয়াটির বিষয়ে অবগত বিশ্বস্ত সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, চুক্তি চূড়ান্ত হলে বিমানের গত এপ্রিলে স্বাক্ষরিত ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ সংক্রান্ত চুক্তির পাশাপাশি নতুন করে আরো ১১টি উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। ফলে বিমানের ভবিষ্যৎ বহরে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা উড়োজাহাজের মোট সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ৩৫টিতে, যার মধ্যে ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস।
বর্তমানে মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজ নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থার জন্য এই সম্প্রসারণের মাত্রা বিপুল।
প্রস্তাবিত এয়ারবাস প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে চারটি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি উড়োজাহাজ এবং ছয়টি এ৩২১নিও ন্যারোবডি জেট। অন্যদিকে অতিরিক্ত ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজের সুনির্দিষ্ট মডেল বা তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, এয়ারবাসের প্রস্তাবিত ক্রয়ের বিষয়ে বিমানের টেকনো-ফাইন্যান্স কমিটি গত ৩১ আগস্টের মধ্যে কাজ শেষ করে বিমান বোর্ডের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
বোর্ডের একটি উপকমিটিও তাদের পর্যালোচনা শেষ করেছে। এখন প্রস্তাবিত চুক্তির আগে দুই পক্ষ চূড়ান্ত পর্যালোচনা চালাচ্ছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের আধুনিকায়নে এয়ারবাস ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘বাংলাদেশের হসপিটালিটি খাতের বিকাশে যুক্তরাজ্যের বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী। বাংলাদেশ সরকারের এভিয়েশন হাব প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রায় যুক্তরাজ্য সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এয়ারবাসের চুক্তি সই করতে প্রস্তুত। এখন শুধু তারিখ এবং স্বাক্ষরকারীদের বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষা। এর আগে বিমান ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাস চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। সেই সময়সীমা পার হলেও কর্মকর্তারা এখন সেপ্টেম্বরেই এটি শেষ করার আশা করছেন।’
বোয়িংসংক্রান্ত নতুন বিষয়টি এই সম্প্রসারণকে আরো বড় মাত্রা দিয়েছে। গত এপ্রিলে বিমান ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা) বিনিময়ে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ (আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮) অর্ডারের চুক্তি সই করে, যা ২০৩১ সালের নভেম্বর থেকে ২০৩৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
সাম্প্রতিক আলোচনার সঙ্গে জড়িত সূত্রের মতে, এখন আরো ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ বিবেচনার অধীনে রয়েছে, যা বোয়িংয়ের মোট সংখ্যা ২৫টিতে নিয়ে যেতে পারে। এই সংখ্যাটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ গত অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক সংক্রান্ত বাণিজ্য আলোচনার সময় ২৫টি বোয়িং কেনার আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার আর্থিক দিক বিবেচনা করে ১৪টি উড়োজাহাজ নিয়ে এগোলেও অবশিষ্ট ১১টি উড়োজাহাজের আলোচনা আবার সামনে এসেছে, যখন বিমান একই সঙ্গে এয়ারবাসের চুক্তির দিকেও এগোচ্ছে।
বোয়িং নিয়ে এই প্রতিশ্রুতির কথা ঢাকা নয়, বরং ওয়াশিংটন থেকে প্রথম জনসমক্ষে আসে। গত ৩০ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত এবং ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গোর লেখেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি ‘অসাধারণ চুক্তিতে’ পৌঁছেছেন, যার অধীনে বাংলাদেশ বোয়িং বিমানের জন্য তাদের প্রাথমিক অর্ডার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াবে।’
তিনি লেখেন, ‘এ সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী আরো একটি চুক্তি করেছেন, যেখানে বাংলাদেশ তাদের প্রাথমিক অর্ডারের চেয়ে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করে আরো বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’
তবে পোস্টে নতুন করে কতটি উড়োজাহাজ কেনা হবে, মোট কত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হবে কিংবা চুক্তিটি কবে ও কোথায় হয়েছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেননি তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম প্রাথমিকভাবে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে গোর হয়তো আগের ১৪টি উড়োজাহাজের চুক্তির কথা নির্দেশ করে থাকতে পারেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির পরে স্বীকার করেন যে ‘আরো কেনার ব্যাপারে একটি নীতিগত আলোচনা’ হয়েছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ আরো উড়োজাহাজ সংগ্রহ করবে। তবে দুজনের কেউই নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করেননি।
উড়োজাহাজবহর আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের জন্য বিমানের বাস্তব প্রয়োজন রয়েছে। সংস্থাটির বর্তমান ১৯টি উড়োজাহাজের বহরে পাঁচটি টার্বোপ্রপ রয়েছে, অর্থাৎ মূল জেট উড়োজাহাজের সংখ্যা ১৪ (১০টি ওয়াইডবডি ও চারটি ন্যারোবডি)। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৪৭টি উড়োজাহাজ বহরে যোগ করার লক্ষ্য রয়েছে, কারণ পুরনো উড়োজাহাজগুলো পর্যায়ক্রমে অবসরে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া নতুন উড়োজাহাজগুলো একবারে না এসে পর্যায়ক্রমে যুক্ত হবে।
তবে কেন ২৫টি বোয়িং এবং ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজের মিশ্র বহর বিমানের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত, কোন কোন রুটে এই অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন ক্ষমতা ব্যবহৃত হবে, কোন ধরনের যাত্রী ও রাজস্ব বৃদ্ধির ধারণার ওপর ভিত্তি করে এই সম্প্রসারণ পরিকল্পনা করা হয়েছে, কিংবা বর্তমান বহরের কয়টি উড়োজাহাজ অবসরে যাবে—এ বিষয়ে বিমান এখনো কোনো একত্রিত ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা (বিজনেস কেস) প্রকাশ করেনি।
অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট কৌশলও এখনো প্রকাশ করা হয়নি। চুক্তিভুক্ত ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজের আনুমানিক ঘোষিত মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার। আরো ২১টি বোয়িং ও এয়ারবাস জেট এতে যুক্ত হলে আরো বিলিয়ন ডলার যোগ হবে। যদিও প্রকৃত খরচ নির্ভর করবে দর-কষাকষিতে প্রাপ্ত ছাড়, উড়োজাহাজের মডেল, ইঞ্জিন ও অন্যান্য সহায়ক প্যাকেজের ওপর। এই খরচের কতটা বিমানের নিজস্ব তহবিল, বাণিজ্যিক ঋণ, রপ্তানি-ঋণ সহায়তা, নির্মাতাদের অর্থায়ন, নাকি সরকারি সহায়তা থেকে আসবে এবং শেষ পর্যন্ত সার্বভৌম গ্যারান্টি লাগবে কি না, সেটি এখনো অস্পষ্ট। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে শুধু চুক্তি সই করা নয়, বরং উড়োজাহাজগুলো লাভজনকভাবে পরিচালনা করা। ৪৭টি উড়োজাহাজের বহর দক্ষতার সঙ্গে চালাতে বিমানের প্রয়োজন হবে অনেক বড় রুট নেটওয়ার্ক, ফ্লাইটের ধারাবাহিকতা, ট্রানজিট যাত্রী, শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত পাইলট ও প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
এভিয়েশন বিশ্লেষক এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের এভিয়েশন মার্কেট যেভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তাতে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমানের সামনে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরব রুটে সম্প্রতি ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের সার্বিক মার্কেট শেয়ার এখন ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে। আমরা যদি অন্তত ৪০ শতাংশ মার্কেট শেয়ার অর্জন করতে চাই, তাহলে সিট সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে হবে। এখনো দেশের সব এয়ারলাইনস মিলিয়ে ১০০টি উড়োজাহাজও নেই; অথচ প্রায় দুই কোটি প্রবাসী বিদেশে অবস্থান করছেন। অর্থাৎ আমাদের নিজেদের বিশাল বাজারটি হাতের কাছেই আছে, কিন্তু আমরা তা ধরতে পারছি না।’
তিনি বলেন, ‘এই বাজার ধরতে হলে উড়োজাহাজের বিকল্প নেই। একই সঙ্গে বিমানের চিরাচরিত বিপণন কৌশল বা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। তা ছাড়া উড়োজাহাজ আজ অর্ডার দিলেই কাল পাওয়া যায় না; ডেলিভারি পেতে পাঁচ থেকে ১০ বছর সময় লেগে যায়। এর মধ্যে বিমানের বর্তমান বহরের অনেক উড়োজাহাজই মেয়াদ শেষ হওয়ায় ফেজ আউট (অবসর) করে ফেলতে হবে।’
বিমানের আর্থিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন উড়োজাহাজের প্রি-ডেলিভারি পেমেন্ট দেওয়া তাদের জন্য বড় পরীক্ষা। তবে বিমানের ক্যাশ ফ্লো যদি ইতিবাচক থাকে, তাহলে তা সামাল দেওয়া সম্ভব। শাহজালাল বিমানবন্দরে প্রতিযোগিতামূলক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চালু হলে যদি বিমানের একক আয় কমে যায়, তাহলে আর্থিক চাপ কিছুটা বাড়বে। তবে আশা করা যায়, সরকার বিমানকে অন্তত অর্ধেকাংশ বা প্রধান গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সুযোগ অব্যাহত রাখবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিমান কর্তৃপক্ষের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ জনবল। ৪৭টি উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হবে বিপুলসংখ্যক পাইলট, কেবিন ক্রু, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণকর্মী ও অন্যান্য প্রশিক্ষিত জনবল। একই সঙ্গে উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও গ্রাউন্ড অপারেশন সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।
শুধু উড়োজাহাজ কিনে বহর বড় করলেই হবে না, সেই বহরকে নিয়মিত ওড়ানোর মতো রুট নেটওয়ার্ক ও পরিচালন সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। এতে স্বল্প মেয়াদে সক্ষমতা বাড়লেও লিজের খরচ এবং কেনা উড়োজাহাজের ঋণ পরিশোধের ব্যয় একই সময়ে বিমানের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘বিমানের বহর বাড়ানোর আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সেই উড়োজাহাজগুলো পরিচালনার সক্ষমতা তৈরি করা। নতুন উড়োজাহাজ এলে সেগুলো কোন রুটে চলবে, পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, প্রয়োজনীয় পাইলট ও কেবিন ক্রু আছে কি না এবং রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা কতটা বাড়ানো হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা দরকার। ৪৭টি উড়োজাহাজ পরিচালনার লক্ষ্য নির্ধারণের আগে বিমানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা, জনবল, রুট নেটওয়ার্ক ও আর্থিক সক্ষমতার একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা হয়েছে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/এসডি-১৩
সূত্র : কালের কন্ঠ




