২০১১ সালের কথা। সিলেটের জনপ্রিয় ‘দৈনিক উত্তরপূর্ব’ পত্রিকায় আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। নতুন কর্মক্ষেত্র, চারপাশের সবকিছুই তখন ভীষণ অচেনা। সেই শুরুর দিনগুলোতে আমার পাশের ডেস্কে বসতেন প্রিয় তুহিনুল হক তুহিন ভাই ও মো. ওলিউর রহমান মামু। নতুন অবস্থায় প্রতিদিন ঠিকঠাক অ্যাসাইনমেন্ট করতে না পারা, কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ মিস হওয়া—সব মিলিয়ে পত্রিকার বার্তা সম্পাদক তাপস দা’র কড়া বকা শুনতে হতো আমাকে। যখনই মন খারাপ করে ডেস্কে ফিরতাম, পাশের টেবিল থেকে পরম মমতায় সান্ত্বনার হাত বাড়িয়ে দিতেন তুহিন ভাই। সেই যে শুরু, এরপর থেকে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আমার পেশাগত জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে সময় সিলেটজুড়ে হরতাল-অবরোধের মতো কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতি লেগেই থাকত। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দিনভর মাঠপর্যায়ে একসাথে অ্যাসাইনমেন্ট করেছি আমরা। কাজের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও একাগ্রতা আমাকে প্রতিমুহূর্তে অনুপ্রাণিত করত। তুহিন ভাই শুধু নিজের কাজের প্রতিই দায়িত্বশীল ছিলেন না, আমার ক্যারিয়ারের অগ্রগতির পেছনেও তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
 

সিলেটের জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘সিলেটভিউ’ ও ঢাকার ‘বাংলামেইল’-এ আমি তখন কাজ করি। সিলেটের কোথাও কোনো ঘটনা ঘটলেই সবার আগে তুহিন ভাই আমাকে ফোন দিতেন, সত্যতা নিশ্চিত করতেন। যাতে সবার আগে আমি নিউজটি সিলেটভিউতে আপ করি এবং ঢাকায় অফিসে পাঠাতে পারি, সেজন্য নিজে তথ্য দিয়ে অবিরাম সহযোগিতা করতেন। একজন সহকর্মীর প্রতি এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সহযোগিতা আজকালকার দিনে সত্যিই বিরল।


২০১৬ সালে আমি যখন সিলেট ছেড়ে ঢাকা চলে আসি, তখনও আমাদের যোগাযোগের সুতোটি ছিঁড়ে যায়নি। এক পর্যায়ে তুহিন ভাই ‘বাংলা ট্রিবিউন’-এর সিলেট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময় ঢাকা অফিসে বেতন বৃদ্ধিসহ নিজের পেশাগত নানা বিষয়ে আমার সাথে নিয়মিত পরামর্শ ও যোগাযোগ রাখতেন।
 

দীর্ঘ সময়, ভৌগোলিক দূরত্ব কিংবা জীবনের ব্যস্ততা—কোনো কিছুই আমাদের মধ্যকার আন্তরিকতায় চির ধরাতে পারেনি। আমি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী হওয়ার পর আমাদের যোগাযোগের মাত্রা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গত বছরও তিনি তাঁর চিকিৎসক স্ত্রীকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া তথা উন্নত কোনো দেশে পাড়ি জমানোর বিষয়ে আমার কাছে দীর্ঘ পরামর্শ চেয়েছিলেন। কত নতুন স্বপ্ন বুনছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, অস্ট্রেলিয়া বা উন্নত দেশে যাওয়ার সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই তিনি চিরতরে চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ভোর ৪টার দিকে সিলেট নগরীর সাদারপাড়াস্থ বাসভবনে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত থাকা এই কলমযোদ্ধা শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্নাইলাইহি রাজিউন)। সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের এই সিনিয়র সদস্য ও সিলেটভিউ২৪ডটকম-এর সিনিয়র রিপোর্টারের আকস্মিক বিদায় সিলেটের সাংবাদিক সমাজে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করেছে।

তুহিন ভাইয়ের এই চলে যাওয়া আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। মনের ভেতর এক তীব্র শূন্যতা ও হাহাকার কাজ করছে। হে রাব্বুল আলামিন, তুহিন ভাইকে আপনি ক্ষমা করে দিন। ওপারে ভালো থাকবেন প্রিয় তুহিন ভাই। আল্লাহ আপনাকে জান্নাতুল ফেরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমিন।
 


লেখক: খলিলুর রহমান স্টালিন, প্রবাসী সাংবাদিক।