সুনামগঞ্জের দিরাই কেন্দ্রীয় শ্মশান পরিচালনা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের অবসান হয়েছে। মূল কমিটিকে পাশ কাটিয়ে গঠিত ৪১ সদস্যের অননুমোদিত কমিটি বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে পাঁচ গ্রামের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নতুন পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ জন্য প্রতিটি গ্রাম থেকে সাতজন করে মোট ৩৫ জন সদস্য মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর ও ২ নভেম্বর দিরাই বাজারের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী জগন্নাথ জিউর মন্দিরে অনুষ্ঠিত পৃথক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দিরাই, দোওজ, দাউদপুর, আনোয়ারপুর ও হারানপুর—এই পাঁচ গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অংশগ্রহণে সভা দুটি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সভায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
৩১ অক্টোবরের সভায় সভাপতিত্ব করেন দিরাই কেন্দ্রীয় শ্মশান কমিটির বর্তমান সভাপতি ও আনোয়ারপুরের বাসিন্দা প্রবীণ মুরুব্বি সুরঞ্জন রায়। সভা পরিচালনা করেন দাউদপুরের বাসিন্দা টিংকু রায়।
সভায় আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ২৪ অক্টোবর দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত ‘দিরাইয়ে কেন্দ্রীয় শ্মশান পরিচালনায় নতুন কমিটি, বহাল আছে আরেকটি কমিটি’ শিরোনামের সংবাদ এবং শ্মশান কমিটির সদস্যদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা। এসব কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বক্তারা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিভ্রান্তি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা এড়াতে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তাঁরা।
সভায় শ্মশান পরিচালনার ইতিহাস তুলে ধরেন বর্তমান সভাপতি সুরঞ্জন রায়। তিনি বলেন, হাওরের মধ্যবর্তী স্থানে শ্মশানের জন্য জমি দান করেন দোওজের বাসিন্দা রাজভল্লব রায়। শ্মশান পরিচালনা কমিটির প্রথম দিকের দায়িত্বে ছিলেন দিরাইয়ের অসিত চৌধুরী। তাঁর মৃত্যুর পর দায়িত্ব পালন করেন দোওজের বাসিন্দা ও জগন্নাথ মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক হরেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ। পরে সভাপতির দায়িত্ব পান আনোয়ারপুরের বাসিন্দা এবং জগন্নাথ মন্দিরের সহসম্পাদক সুরঞ্জন রায়।
সুরঞ্জন রায় বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর পূর্বসূরিদের কাছ থেকে কেউই শ্মশান পরিচালনা-সংক্রান্ত কোনো নথিপত্র পাননি। জগন্নাথ মন্দিরে পাঁচ গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ থাকায় তাঁদের মধ্য থেকেই শ্মশান কমিটির দায়িত্ব পালনের প্রথা চলে আসছে। কিন্তু মূল কমিটিকে না জানিয়ে দিরাই গ্রামের ৪১ জনের সমন্বয়ে পৃথক একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা দুঃখজনক।
বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি সভাপতির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন। তবে সভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা তাঁকে দায়িত্ব থাকার অনুরোধ জানান।
শ্মশানের উন্নয়নে বক্তারা বলেন, হাওরের ঢেউ ও প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে শ্মশানটি টিকিয়ে রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারি সামান্য বরাদ্দ ও ব্যক্তিগত অনুদানের ওপর নির্ভর করে সেখানে কোনোরকমে শবদাহের ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন শ্মশানঘাট নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নও সহজ নয়। তবে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে কিছু অর্থ সহায়তার আশ্বাস পাওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে উন্নয়নকাজ আংশিকভাবে শুরু হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তাঁরা।
বক্তারা বলেন, পাঁচ গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত মূল কমিটির সঙ্গে কোনো আলোচনা বা যোগাযোগ না করেই কেবল একটি গ্রামের ৪১ জনকে নিয়ে পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। অথচ শ্মশানের উন্নয়ন নিয়ে মূল কমিটির কাছে কোনো প্রস্তাব, পরামর্শ, অনুদান কিংবা পরিকল্পনা নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেননি। এ ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা হয়েছে। এ ধরনের নিয়মবহির্ভূত উদ্যোগের নিন্দা জানান তাঁরা।
তবে দিরাই গ্রামের বাসিন্দারা সভায় অনুপস্থিত থাকায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান সাবেক পৌর মেয়র বিশ্বজিৎ রায়সহ কয়েকজন। তাঁদের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ২ নভেম্বর বিকেল তিনটায় দিরাই গ্রামবাসীকে পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়ে পাঁচ গ্রামের সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে পৃথক কমিটি গঠনের কারণ ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেওয়া এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন তাঁরা। সভাপতি এ প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়ে প্রথম দিনের সভা মুলতবি ঘোষণা করেন।
২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত পরবর্তী সভায় পাঁচ গ্রামের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মূল কমিটিকে পাশ কাটিয়ে গঠিত ৪১ সদস্যের কমিটির নিন্দা জানানো হয়। এ সময় ওই কমিটির সদস্যরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন অসীম রায় চৌধুরী, সুরঞ্জিত সূত্রধর, বিশ্বজিৎ রায় বিষু, গৌরাঙ্গ পাল ও মৃদুল কান্তি রায় চৌধুরীসহ অন্যরা।
একটি কমিটি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় সেটিকে পাশ কাটিয়ে আরেকটি কমিটি গঠন বিধিসম্মত নয় বলে মত দেন সন্দীপন দাস, অঞ্জন দাস ও সাবেক পৌর মেয়র বিশ্বজিৎ রায়।
আনোয়ারপুরের বাসিন্দা সুধীজন ও অগ্রজ ব্যক্তিত্ব রানা রঞ্জন রায় বলেন, ভালো উদ্দেশ্য থাকলেও মূল কমিটিকে এড়িয়ে নতুন কমিটি গঠনের সুযোগ নেই। এটি গুরুতর অনিয়ম। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অবক্ষয়ের প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে যাঁরা এ উদ্যোগ নিয়েছেন, তাঁরা সমাজেরই সন্তান। তাই তাঁদের ক্ষমা করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দিতে হবে। আলোচনা ও পারস্পরিক ক্ষমাসুন্দর মনোভাবের মধ্য দিয়ে শেষ পর্যন্ত ৪১ সদস্যের অননুমোদিত কমিটিটি বাতিল করা হয়।
সভায় নতুন কমিটি গঠনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়, পাঁচটি গ্রামের প্রতিটি থেকে সাতজন করে মোট ৩৫ জন সদস্য মনোনীত করা হবে। সংশ্লিষ্ট গ্রামের বাসিন্দারা নিজেরা তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্ধারিত প্রতিনিধির মাধ্যমে তিন দিনের মধ্যে নামের তালিকা বর্তমান সভাপতি সুরঞ্জন রায়ের কাছে জমা দেবেন। পরে মনোনীত ৩৫ জনকে নিয়ে সভা করে তাঁর তত্ত্বাবধানে পূর্ণাঙ্গ নতুন কমিটি গঠন করা হবে। নতুন কমিটি গঠনের পর তিনি সভাপতির দায়িত্ব থেকে অবসর নেবেন।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন মাখন লাল দাস, আশীষ রায়, সুরঞ্জিত রায়, বকুল রায়, নরোত্তম রায়, প্রশান্ত সাগর দাস ও বিষ্ণুপদ সরকারসহ অনেকে। সভা শেষে সভাপতি সুরঞ্জন রায় সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসায় উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি সমাজের প্রচলিত প্রথা, পারস্পরিক সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলার আহ্বান জানান। পরে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। সভা শেষে উপস্থিত সবাই মন্দিরের প্রসাদ গ্রহণ করেন।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/পল্লভ/এসডি-০৭




