সিলেট বিভাগের কোটি মানুষের উন্নত চিকিৎসার ভরসাস্থল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। কিন্তু ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বেপরোয়া আচরণ, চিকিৎসায় অবহেলা, রোগী ও তাদের স্বজনদের গায়ে হাত তোলা, অন্যায়ভাবে মারধর করে পুলিশে সোর্পদ এবং কথায় কথায় কর্মবিরতির কারণে দিন দিন হাসপাতালটি সেবার সুনাম হারাচ্ছে।
চিকিৎসার জন্য বাধ্য হয়ে হাসপাতালে আসা রোগীরা সেবার চেয়ে দুর্ব্যবহারের অভিজ্ঞতাই বেশি নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হামলা, মারধর ও কর্মবিরতির ঘটনায় বিভিন্ন সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করলেও শেষ পর্যন্ত শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়নি কাউকে।
কর্মবিরতির নামে হাসপাতালকে অচল করে দেওয়ার ভয়ে কঠোর অবস্থানে যান না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। সচেতন মহলের দাবি, বিচারহীনতার কারণেই ইন্টার্ন চিকিৎসকরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেছেন। যে কারণে হাসপাতালে রোগীরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন।
গত ২৮ অক্টোবর রাতে অপারেশনে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাওয়ায় সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলামের এক রোগীর স্বজনদের উপর হামলা চালান সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। হাসপাতালে আটকে রেখে বেধড়ক মারপিট করেন তারা। একই সময় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার দরগাপাশা গ্রামের ইতালী প্রবাসী নূর আলমের মা ও তাঁর কয়েক স্বজনকেও মারধর করেন ইন্টার্নরা। খবর পেয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালনে হাসপাতালে যান সাংবাদিক রেজা রুবেল ও নিবেন্দু তালুকদার। মারধরের ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করতে গেলে ইন্টার্নরা তাদের উপরও হামলা চালান। স্যালাইনের স্ট্যান্ড ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে পিটিয়ে তাদেরকে রক্তাক্ত করা হয়। পরে নিজেরাই অস্ত্রোপচার করে কোন ব্যবস্থাপত্র না দিয়েই তাদেরকে ওটি থেকে বের করে দেন।
ভর্তির জন্য হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গেলে সংশ্লিষ্টরা জানান ইন্টার্নদের ধর্মঘটের কারণে সবধরণের সেবা বন্ধ রয়েছে। ওইদিন রাত প্রায় দুইটা পর্যন্ত ইন্টার্নরা সেবাকার্যক্রম বন্ধ রেখে রোগীদের জিম্মি করে রাখেন। এসময় অনেক রোগী হাসপাতাল ছেড়ে যান। আবার অনেকে ভর্তি হতে এসে ফিরে যান। মারধরের পর রোগীর কয়েকজন স্বজনকে তারা উল্টো পুলিশে তুলে দেন। অথচ পরে তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করেননি ইন্টার্নরা। তোলপাড় করা এই ঘটনার ৬ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোন তদন্ত কমিটি বা জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি।
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি রাতে হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাথে রোগীর স্বজনদের কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। এতে রোগীর ৫ স্বজন আহত হন। মারধরের পর তিনজনকে পুলিশে সোর্পদ করেন ইন্টার্নরা।
এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৫ সদস্যের কমিটি গঠন করলেও কাউকে শাস্তি পেতে হয়নি। ওই ঘটনায়ও নিজেদের দোষ ঢাকতে ইন্টার্নরা কর্মবিরতির ডাক দেন। গত ৮ জুলাই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সাথে মারামারিতে লিপ্ত হন ইন্টার্ণ চিকিৎসকরা। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের সামনে কয়েক দফা রোগির স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পরও তারা কর্মবিরতি ডাকেন।
গত বছরের ২৭ এপ্রিল হাসপাতালের ৩১নং ওয়ার্ডে সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক তন্ময় দেবনাথ এক রোগীর স্বজনকে লাথি মারেন। ফেসবুকে সেই ভিডিও ভাইরাল হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এভাবে প্রায়ই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের হাতে মারধরের শিকার হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
রোগীদের মারধর প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সিলেটভিউ-কে বলেন, “রোগীরা মারামারির জন্য নয়, সেবার জন্য হাসপাতালে যান। কিন্তু অনেক ইন্টার্ন তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে তাদের উপর হাত তুলেন, মারধর করে পুলিশে দেন। পরে তারা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ধর্মঘট ডাকেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কঠোর ব্যবস্থা নেন না বলেই তারা দিন দিন আরও বেপরোয়া হচ্ছে। এটা থেকে পরিত্রাণ প্রয়োজন।”
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. বদরুল আমিন জানান, কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত কমিটি হয়। কিছু তদন্ত চলমান আছে। আবার কিছু ঘটনা উভয়পক্ষকে নিয়ে বসে মীমাংসা করা হয়েছে।
ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সাথে রোগীর স্বজনদের ঝামেলা প্রসঙ্গে তিনি সিলেটভিউ-কে বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণে চিকিৎসকদের দ্বিগুণ-তিনগুণ রোগীর সেবা দিতে হয়। অনেক চাপ সামলে তাদেরকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। মাঝে মধ্যে কিছু ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কারণে অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটে। তবে এর জন্য সবাই দায়ি নয়। আবার কোন ঘটনার জন্য তারা এককভাবেও দায়ি থাকেন না।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ/এসডি-২১




