কয়দিন হলো ঘরের বাইরে বেরোইনি। স্বাস্থ্যবিধির জন্য ঘর থেকে বের হওয়া বারণ ছিল। ‘ঘরবন্দী’ ১০টি দিন কাটলো এক অসহনীয় যন্ত্রণা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। তৈরি হলো সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার। সেই সময়ের অনুভূতিগুলো কলমের কালিতে কাগজের জমিনে বিছিয়ে দেয়া সম্ভব নয়।

‘ঘরবন্দী’ দিনগুলোতে জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখা প্রতিদিনের রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সীমানাবিহীন আকাশ দেখতে দেখতে হারিয়ে যেতাম জীবনের ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরে। জানালার ওপারের অদৃশ্য বাতাস শিহরিত করতো আমাকে। সন্ধ্যায় জ্বলে ওঠা রাস্তার সারিবদ্ধ সোডিয়াম বাতি, অনেকটা নির্জন রাস্তা, মৃদু বাতাসের সঙ্গে মুষলধারার বৃষ্টি, বৃষ্টির সঙ্গে লেপ্টে থাকা মোহনীয় শব্দ আমাকে নিয়ে যেতো অন্য এক ভুবনে। কল্পনার ডানায় ভর করে চলে যেতাম শৈশব-কৈশোরের দিনগুলোতে।

দূরন্ত সময়গুলোতে বৃষ্টির পানিতে ভিজেছি, খেলেছি। তখন মা ছিলেন। বলতেন- ‘বৃষ্টির পানিতে ভিজিস না বাবা, শরীর খারাপ হবে। জ্বর-কাশি হবে।’ সেই সময়ের অবুঝ মন মানতো না মায়ের বাধা। সাথীদের সঙ্গ দিয়ে ভিজেই যেতাম, খেলেই যেতাম বৃষ্টিতে। সেসব দিন ছিলো এক অপূর্ব আনন্দের। একসময় ফিরে আসতে হয় কল্পনার জগত থেকে। উপলব্ধি করি- আমি শৈশবে নয়, বসে আছি করোনাকালের এক সন্ধ্যায় দূর প্রবাসে চার দেওয়ালের ভেতরে। আজ সেদিনের মতো বৃষ্টি হলেও বিধিনিষেধ ডিঙিয়ে সুযোগ নেই শরীরে বৃষ্টির ছাট লাগানোর। আর ভিজলেও মধুর বকুনি দেওয়ার জন্য বেঁচে নেই জন্মধারিনী মা।

‘ঘরবন্দী’ সময়ে শৈশবে হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আলিঙ্গন করেছি একটি চরম বাস্তবতাকে। মানুষের অবাধ চলাফেরা করার স্বাধীনতা যে কত বড় নিয়ামত- তা ঘরে আবদ্ধ হওয়াতেই বুঝতে পেরেছি। যদিও আমরা এখন আধুনিক যুগের সকল সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছি এবং ভার্চুয়াল যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম,লিঙ্কড ইন, টুইটার, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের খবর রাখছি। ঘরের ভিতরে অবস্থান করেও টেলিফোনের মাধ্যমে ঘন্টার পর ঘন্টা বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজনসহ সবার সঙ্গে আলাপ করছি। কিন্তু একটা সময় এসব মাধ্যমে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ভালো লাগে না। ব্যাকুল হয়ে মন খুঁজে প্রাকৃতিক জীবনধারা।

মুক্ত অবস্থায় বাইরে যাওয়ার তৃপ্তি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, সরাসরি কথা বলা আর শপিং করার স্বাধীনতা হারিয়ে নিজেকে খুব অসহায় লাগছিলো। পাশাপাশি যে বিষয়টি আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে সেটি হচ্ছে- অন্যায়-অবিচারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সকল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কথা বলতে গিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী কত লোক আজ বন্দী, নির্যাতিত-নিপীড়িত। কত আছেন নির্জন কারাবাসে। তাদেরকে করা হচ্ছে শারীরিক, মানসিক এবং আবেগীয় নির্যাতন। জানি না তারা এই সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের পরিবার-পরিজন অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করছেন এবং তারা জানেন না তাদের ভাগ্যে কী আছে। তাদের ছেলে-মেয়েরা মা-বাবার আদর-স্নেহ হতে বঞ্চিত থেকে বড় হচ্ছেন। এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একটি শিশু মা-বাবার আদরে বেড়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক, এটা তার অধিকার। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের দায়িত্ব এই অধিকার নিশ্চিত করা। যে শিশুটি এই অধিকার পেতে ব্যর্থ হয় সেই শিশুর চিন্তা-চেতনার বিকাশে বিঘ্ন ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়- এই শিশুরা পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর তাদের উপর অর্পিত সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সামাজিক ভারসাম্যতা বিনষ্ট হয় এবং বিষয়টি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে অন্তরায় হিসাবে কাজ করে।

ভাবনার অতল জগত একসময় আমাকে মুক্তি দিলো, ১০ দিনের বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে বুক ভরে নিলাম আলো-বাতাসের স্বাদ। কিন্তু জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরলেও সেই ভাবনাগুলো সম্ভবত আমাকে তাড়া করবে অনেক দিন। বিশ্বজুড়ে যে সমস্ত নিরপরাধ লোক কারাবন্দী বা নানারকম নির্যাতনের শিকার তাদের সপক্ষে আমি মানবতাবাদীদের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই ‘মুক্ত করে দিন’- ‘তাদের মুক্তি দিন’। ফিরে পাক তাদের হারানো স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার। আর জয় হোক মানবতার।

লেখক : সাবেক তুখোড় ছাত্রনেতা, বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ ও কমিউনিটি নেতা এবং কলামিস্ট