সকালটা ছিল শরতের। কিন্তু রোদ আর গরমে বোঝার উপায় নেই যে শরতের সময় শেষে হেমন্তের আগমন। তবুও সকল প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছি ‘শুটিং স্পটে’। কয়েকবছর ধরে যাতায়াতের সময় চোখ পড়তো স্থানটি। পাশ দিয়ে প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ে যাওয়া হলেও সময়-সুযোগে সেভাবে দেখা আর হয় না। বাইক চলছে আশি/নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় শুটিং স্পটের লক্ষে! শুটিং স্পটের কথা শুনে বাইকের পেছনে বসা সহকর্মী বেশ নড়েচরে বসলেন। ভাগ্যিস, বাইকের হাতল শক্ত হাতেই ধরা ছিল! নয়তো বিধি বাম!

শুটিং স্পটের নাম শুনলে যে কারোরই আগ্রহ থাকে। চোখে ভাসে অভিনয় শিল্পীদের ব্যস্ততা। বহু ঢাকাই ছবির গান ও বিশেষ দৃশ্য ধারণ করা হতো এখানে। এখানেই পা পড়েছে, সেই সময়ের তুমুল জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের।  


সিলেট-তামাবিল সড়ক ধরে যাওয়ার সময় দুই পাশের হাওরগুলোর অদূরে হালকা কুয়াশা পড়ার দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় হেমন্ত এসে গেছে । ভরদুপুরে গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছে রাখাল বালক। হাওরের পানিতে মাছ ধরছে ছেলে-বুড়ো। হরিপুর থেকেই মেঘালয়ের জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের কোলে মেঘের আলিঙ্গন চোখে পড়ছে। পথের দূরত্ব যতই ছোট হচ্ছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে জৈন্তা পাহাড়। সাদাকালো মেঘের নাচন দেখতে দেখতেই অবস্থান জৈন্তাপুর বাজার।

এ যাত্রায় আরেক সহকর্মী রেজওয়ান সাব্বির যুক্ত হলেন । হ্যাঁ, এর আগে অল্প কথায় বলে রাখি- প্রাচীন জৈন্তাপুরের গল্প-ইতিহাস।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস-ঐতিহ্যে গাথা জৈন্তাপুর।  পান-পানি আর নারী এই তিনে জৈন্তাপুরী (জৈন্তাপুর) বলা হয়। জৈন্তার খাসিয়া পানের যেমন সুনাম রয়েছে দেশ-বিদেশে , পাহাড়ঘেঁষা হাওর-বিলের পানিও বেশ স্বচ্ছ-সুন্দর। আর প্রাচীনকালে জৈন্তা রাজ্য ছিল প্রমীলা (শাসিত)। সেই সময়ে জৈন্তারাজ্যে ছিল নারীর রাজত্ব্য। উত্তর এবং পূর্বে পাহাড়-পর্বত  দক্ষিণে এবং পশ্চিমে বেশ কয়েকটি হাওর। উত্তরে মেঘলায় রাজ্য। পাহাড়ঘেঁষা রাজ্যটির নাম সিলেটের জৈন্তাটপুর উপজেলা। ইতিহাসের পাতায় প্রাচীনরাজ্য জৈন্তাপুর। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবেষ্টিত সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার এমন নানা গল্প শুনতে শুনতে বাইক থামলো সিলেট শহর থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরত্ব শ্রীপুর বাজারে।

শ্রী মানে সুন্দর। এর সঙ্গে ‘পুর’ যুক্ত হয়ে দাঁড়ায় ‘শ্রীপুর’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এতটাই ভরপুর, সে জন্যই নাম  তার ‘শ্রীপুর’।  আর সেখানেই অবস্থান সীমান্তবর্তী একটি নদ ‘রাংপানি’। স্বচ্ছ জলের জন্যই এ নাম। মেঘালয়ের জৈন্তা পাহাড়ের রংহংকং জলপ্রপাত থেকে শ্রীপুর রাংপানির উৎপত্তি। অনেকের কাছে শ্রীপুর পাথরকোয়ারি নামেও পরিচিত। পাহাড়ের কোল বেয়ে আসা পাথুর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকাটা নদীটির পানি প্রাকৃতিক রঙ মাখা।

এক যুগ আগেও স্থানটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবেষ্টিত মনোরম পর্যটনকেন্দ্র ছিল। সিলেটে আগত পর্যটকদের কাছে জাফলংয়ের সঙ্গে শ্রীপুর ছিল পছন্দের তালিকায়। জৈন্তাপুর থেকে তামাবিল সড়ক হয়ে তিন কিলোমিটার সামনে আগালেই শ্রীপুরের অবস্থান। একপাশে চা-বাগান আরেক পাশে শ্রীপুর লেক। লেকের উল্টোদিক ধরে ছোট রাস্তায় খানিক এগুলেই মেঘালয়ের জৈন্তা-খাসিয়া পাড়ারের কোল চোখে ভাসে শ্রীপুর ‘রাংপানি’ নদী।

নদীর পাশেই রয়েছে খাসিয়াদের গ্রাম ‘মোকামপুঞ্জি’। খাসিয়ারা গ্রামকে ‘পুঞ্জি’ নামেই ডাকে।  প্রাচীনকাল থেকে এই নদী আর পাহাড় ঘিরে তাঁদের বসবাস। পুঞ্জিতে গেলেই জানা যাবে খাসিয়াদের ইতিহাস-ঐতিহ্য। পান-সুপারিতে গাথা খাসি সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। যার বৈচিত্র এখনো অটুট।

আশি-নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের একাধিক ছবির শুটিং হতো নয়নাভিরাম এ নদী ও এর আপশাশে। সেই সময়ের জনপ্রিয় নায়ক ওয়াসিম-সাবানা অভিনিত ‘বাঞ্জারাম’ ছবির প্রায় শতভাগ চিত্রধারণ হয়েছিল শ্রীপুর রাংপানি ও আশপাশ এলাকায়। ঢাকাই চলচ্চিত্রের ধ্রুবতারা প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ ও মৌসুমী অভিনিত ‘দেনমোহর’ ছবির গানের দৃশ্য ধারণ করা হয় রাংপানি নদীর এই উৎসমুখে। সিলেটের সেই সময়ে মডেল-অভিনেতা মিশফাক আহমদ মিশু’র স্মৃতি সেই দিনগুলো আজও উজ্জ্বল। জানালেন, ১৯৯১ সালে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রবাদ পুরুষ , পরিচালক এহতেশাম সাহেব পরিচালিত- শাবনাজ-নাঈম জুটির প্রথম ছবি ‘চাঁদনী’র গান ও বিশেষ কিছু মহুর্ত শ্রীপুরের বিভিন্ন স্থানে চিত্রধারণ করা হয়। ‘ও আমার জান, তোর বাঁশি যেন যাদু জানেরে...।’ ‘চাঁদনী’ ছবির জনপ্রিয় এই গানের পুরো চিত্রধারণ হয় শ্র্রীপুরে। জনপ্রিয় কন্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের কন্ঠে গাওয়া এই গানের অভিনয়ে অংশ নেন শাবনাজ-নাঈম জুটি। তখন শ্রীপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতোটা ভরপুর ছিল যে, সিনোমাওয়ালারা শুটিংয়ের জন্য সিলেটের এসব জায়গা পছন্দের শীর্ষে রাখতেন।

সরকার ঘোষিত পাথরকোয়ারির জন্য সেই প্রাকৃতিক শ্রী হারাতে থাকে জৈন্তা পাহাড় আর চা-বাগান মোড়ানো শ্রীপুর।  কালের পরিবর্তে  পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নেয় শ্রীপুর থেকে। সেই থেকে শ্রীপুর রাংপানি এই প্রজন্মের অনেকের কাছে অজানাই থেকে যায়। অজানাকে জানার জন্যই এই শ্রীপুর যাত্রা।

পাহাড়ি সরু পথ ধরে নিচে নামতেই রাংপানির দুপাশের শরতের প্রতীক কাশফুল হেলে-দুলে অভ্যার্থনা জানালো। চোখে পড়লো নদীর উৎসমুখে নীল পানি। নদীর কোলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হরেক রঙা পাথর। পাখর তোলা স্থানগুলো দ্বীপের মতো হয়েছে আছে। কোনটিতে জমে আছে পানি। পাশেই পড়ে আছে বালু-পাথরবাহী বারকি নৌকাগুলো। নদী লাগোয়া বাসিন্দারা কেউ কেউ গোসল করছেন সেই পানিতে। পানি কম থাকায় রাংপানির বুকে জাল ফেলে মাছ ধরছেন স্থানীয়রা। একে একে চোখে ভাসতে থাকলো এমন সব দৃশ্যপট। প্রকৃতির বুকে শিল্পীর তুলিতে আঁকা এ যেন এক সুশ্রী নকশিকাঁথা।

পরিবেশবাদী সংগঠন ‘সেভ দ্য হেরিটেজ এন্ড এনভায়রনমেন্ট’ এর সভাপতি আব্দুল হাই আল-হাদী বলেন, গত চার বছর ধরে রাংপানির বুক থেকে পাথর তোলা বন্ধ থাকায় আবারও ধীরে ধীরে নিজের সেই পুরোনো রূপে ফিরতে শুরু করেছে শ্রীপুরের রাংপানি। পর্যটকদের নিরাপত্তা আর পরিবেশ-প্রতিবেশ ঠিক রেখে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় করলে শ্রীপুরের রাংপানি হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। শ্রীপুরের রাংপানির সৌন্দর্যের রং ছড়াবে পর্যটকদের মনে।

দেখা ও ছবি তোলা শেষে পুরোনো সেই শুটিং স্পট থেকে যখন ফিরছি, হেমন্তের কুয়াশায় তখন অস্পষ্ট জৈন্তা পাহাড় । পাহাড়ি মৃদৃ বাতাসে আবারও কাশফুল হেলেদুলে আমাদের বিদায় জানাতে ব্যস্ত।  এমন প্রাকৃতিক রূপের যাদুতে বিমোহিত হয়ে শ্রীপুর থেকে ফিরছি- সেখানে শুটিং হওয়া নব্বইয়ের দশকের ‘চাঁদনী’ ছবির-গান ‘ও আমার জান, তোর বাঁশি যেন যাদু জানেরে....’।
 
*লেখক: প্রথম আলো’র আলোকচিত্র সাংবাদিক।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে