সিলেটের বিশ্বনাথে দখল আর দূষণে প্রায় মরা খালে পরিণত হওয়া এককালের খরস্রোতা ‘খাজাঞ্চী ও মাকুন্দা নদী’ পুনঃখনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, অবৈধভাবে মাটি বিক্রি ও নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো রক্ষা করার পায়তারার বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পুনঃখনন কাজের সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিদের যোগসাজসে অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নিয়ে নদীর তীরে থাকা অবৈধ স্থাপনাগুলো রক্ষা করার জন্য নদীর তীরের ঘাস ছাঁটাই করেই প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছেন বলে অভিযোগ সর্বমহলের।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-সহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের অবহেলার কারণে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে শুরু হওয়ার পর ‘শেষ হয়েও শেষ হয়নি’ বিশ্বনাথ উপজেলা ও পৌর শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া একসময়ের খরস্রোতা নদী বাসিয়ার পুনখনন কাজ ও বাসিয়ার তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কার্যক্রম। ইতিপূর্বে পুনখনন হওয়া চরচন্ডী নদীও এখন প্রায় ছোট্ট একটি নালায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিনেও পুনখনন না হওয়ার কারণে ইতিমধ্যে নিজের অস্থিত্ব হারিয়ে ফেলেছে ‘নীলকন্ঠ ও মাটিজুড়া (একাংশ)-সহ অনেক নদী। বিলীন হওয়ার পথে মাটিজুড়া নদী, রাজার খালসহ উপজেলায় থাকা অসংখ্য নদী-খাল-বিল।
সমাজের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে কারণে শুস্ক মৌসুমে উপজেলা ও পৌর এলাকায় থাকা নদী-নালা, খাল-বিল ও হাওর শুকিয়ে যাওয়ায় বোরো চাষাবাদে পানির জন্য হাহাকার করতে হয় এলাকার হাজার হাজার কৃষকদের। বোরো চাষাবাদের সময়ে হাওরে গেলে কিংবা নদীগুলো পরিদর্শন করলে এমনই দৃশ্যের দেখা মিলবে প্রবাসী অধ্যুষিত বিশ্বনাথ উপজেলার নদী ও কৃষিক্ষেতের।
যে কারণে বিশ্বনাথ উপজেলার উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও কৃষকদের বাঁচানোর লক্ষ্যে ও বোরো চাষাবাদের জন্য পানির চাহিদা মিটাতে ২০২০-২০২১ অর্থ বছরে প্রায় ১৩ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ‘খাজাঞ্চী ও মাকুন্দা নদী’র পুনখননের উদ্যোগ নেয় সরকার। আর ওই পুনঃখনন কাজের টেন্ডার পান ঢাকার ‘এসএ এসআই ইসরাত এন্ড জেভি এন্টারপ্রাইজ’। টেন্ডার পাওয়ার পর ২০২১ সালে অনিয়মের মধ্যেই নদীর প্রায় ১৫ কিলোমিটার অংশের পুনঃখনন কাজও শেষ করা হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ কোটি টাকা।
এদিকে ২০২২ সালের জুন মাসে পুনঃখনন কাজের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে জিরো পয়েন্ট থেকে সোনালী বাংলা বাজার পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার পুনখনন কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু ১০ থেকে ২০ মিটার নদীর তলদেশ পুনখননের নির্দেশনা থাকলেও বৈরাগী বাজার ও বাংলাবাজারের বেশিরভাগ এলাকায় কেবল তীরের ঘাস ছাাঁটাই করেই নদীর পুনঃখনন শেষ করা হচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে।
আর নদী তীরের অবৈধ দোকান ভেঙে ফেলার হুমকি দিয়ে দোকান মালিকদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া পাশাপাশি কিছু অবৈধ দখলদারদের সাথে গোপনে আতাত করে নিজেদের পকেট ভারী করছে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। এমন অভিযোগ বিশ্বনাথ উপজেলার উত্তরাঞ্চলের সহস্রাধিক কৃষক ও নদী তীরের বাসিন্দাদের।
অন্যদিকে সরেজমিনে উপজেলার রামপাশা ইউনিয়নের বৈরাগী বাজারে গিয়ে দেখা গেছে মাকুন্দা নদীর বুকে কৃষকের ধানের চারা এখনও দৃশ্যমান রয়েছে। যে কারণে এমন অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যদিয়ে নদী পুনখনন করা হলে জনগণের কোনো উপকারে হবে না, বরং সরকারের কোটি কোটি টাকা ধ্বংস হওয়া ছাড়া আর কিছুই নয় বলে দাবী স্থানীয় এলাকাবাসীর। সেই সাথে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কিছু অসাধু কর্মকর্তাদের নিরবে অবৈধ দখলদারদেরকে নিরবে অবৈধভাবে বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা জনসম্মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এলাকাবাসীর এমাদ উদ্দিন, সুরুজ আলী, আব্দুর রহিম, হুমায়ুন আহমদ, লিলু মিয়া, আলাই মিয়া, নুরুলহক স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, নদীর তলদেশ পুনখনন না করেই নদীর তীরের ঘাস ছাঁটাই করেই শেষ করা হচ্ছে পুনখনন কাজ। আর স্থানীয় কিছু অসাধু ব্যক্তি ও ঠিকাদারের লোক শাহীন আহমদ মিলে দোকান মালিকদের কাছ থেকে যেমন চাঁদাও নিচ্ছেন, তেমনি অবৈধ দখলদারদের কাজ থেকে অবৈধ স্থাপনা রক্ষা করার নামে চলছে উৎকোচ গ্রহণ।
সকল অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করলেও এ ব্যাপারে কথা বলতে নারাজ পুনঃখনন কাজের সাব ঠিকাদার শাহীন আহমদ।
নদীর পুনঃখনন কাজে অনিয়মের কথা জেনেছেন দাবী করে উপজেলার রামপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলমগীর সঠিকভাবে নদীর পুনখনন কাজ বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় প্রশাসনসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সার্বিক সহযোগীতা কামনা করেছেন।
নদীর পুনঃখনন কাজের অনিয়মের কথা স্বীকার করে সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)’র সহকারী প্রকৌশলী ও পুনঃখনন কাজের এসও সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, সঠিকভাবে খননের জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিাকাদার ও তাদের প্রতিনিধিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১০-১৫ দিন পরে পুনখনন কাজ পরিদর্শন করা হবে, আর ওই পরিদর্শনকালে নদীর পুনখনন কাজে অনিয়ম পরিলক্ষিত হলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আইন মতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া বিষয়টি তিনি বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করেছেন বলেও জানিয়েছেন।
বিশ্বনাথ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌরপ্রশাসক নুসরাত জাহান বলেছেন, অনিয়মের বিষয় নয়, সেলিম জাহাঙ্গীর শুধুমাত্র মাটি বিক্রির বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরও প্রতিনিধি পাঠিয়ে বিষয়টির খোঁজ-খবর নিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এ ব্যাপারে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বলেন, খোঁজ-খবর নিয়ে পুনঃখনন কাজে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি পাওয়া গেলে এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / প্রনঞ্জয় / ডি.আর




