রাশিয়া-ইউক্রেনের কোনো দেশ থেকেই চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা দেশে আমদানি হয় না, কিন্তু শুধু সেই দুই দেশের যুদ্ধের খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এতে খাতুনগঞ্জের পাইকারিতে ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে মণে ৭০০ টাকা। মসুর ডাল ১১৫ টাকা। চিনি মণে ৪০ টাকা।

মূলত ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর জন্য সব সময় একটি অজুহাত খোঁজেন; রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সেই অজুহাতের সর্বশেষ সংস্করণ। অজুহাত বলার কারণ হচ্ছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কয়েক দিন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ভোগ্যপণ্যের দাম কমে আগের অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে।


ভোগ্যপণ্য বিপণনকারী ব্লুমবার্গের তথ্য মতে, ভুট্টা, গম, ওটস, সয়াবিনসহ সব পণ্যের দামই কমেছে। দুই দিনের ব্যবধানে সেসব পণ্যের দাম ৩-৮ শতাংশ পর্যন্ত কমে প্রায়ই আগের অবস্থানে ফিরেছে। যেমন—গমের দাম তিন দিন আগে যেখানে ৯৩০ মার্কিন ডলার ছুঁয়েছিল; সেটি ৮ শতাংশ কমে ৮৫৯ মার্কিন ডলার বিক্রি হচ্ছে। ভুট্টার দাম ৫ শতাংশ কমে ৬৫৫ মার্কিন ডলারে বিক্রি হচ্ছে। দাম কমে আসার মূল কারণ হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের স্থায়িত্ব বেশি হচ্ছে না এটা স্পষ্ট দৃশ্যমান। ফলে গুজবে যে বাজার চড়েছিল সেটি আগের অবস্থানেই ফিরেছে।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অজুহাতে রাতারাতি যে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছেন; সেই বাড়তি দামের পণ্য দেশে এসে পৌঁছাতে অন্তত দুই মাস লাগবে। অথচ দেশে রাতারাতিই এসব পণ্যের দাম বাড়ানো হলো কোনো যুক্তি ছাড়াই।

জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান বাদশা বলেন, ‘আসলে যুদ্ধের কথা বলে অন্য ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে। রাশিয়া থেকে কিছু পণ্য দেশে আসে, সেগুলো সংকট হবে এমন অজুহাতে দাম বেড়েছে ঠিক, কিন্তু সেই অজুহাতে অন্য পণ্যের দাম তো বাড়ার কথা নয়। এখন এসব প্রশ্নের জবাব কে দেবে? সমাধানই বা কী, আমি জানি না। ’

তিনি বলেন, রাশিয়া থেকে সরিষা দানা আমদানি হয় দেশে। যুদ্ধের প্রভাবে সেই পণ্যের দাম বেড়ে রেকর্ড ছুঁয়েছে। মেট্রিক টন দুই হাজার ৫০০ টাকার পণ্য এখন তিন হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেই পণ্যের খোঁজই মিলছে না। মূলত ব্যাংকগুলো রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে নতুন করে ঋণপত্র খুলতে না দেওয়ায় বাজার চড়ে গেছে।

খাতুনগঞ্জের বড় ব্যবসায়ী আর এম এন্টারপ্রাইজের মালিক আলমগীর পারভেজ বলেন, করোনা মহামারির কারণে সমুদ্রপথে জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় পণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে আগেই। সেই সঙ্গে টাকার সঙ্গে ডলারের দাম বেড়ে যাওয়া এবং সর্বশেষ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক পণ্যের বুকিং দর বেড়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভোজ্য তেলসহ অন্য পণ্যের দামে প্রভাব পড়েছে, দামও বেড়েছে।

রাশিয়া-ইউক্রেন থেকে আগের বছরগুলোতে দেশে গম আমদানি বেশি হলেও ২০২১ সাল থেকে সেটি কমে এসেছে। সরকারি-বেসরকারি দুইভাবে সেই দুটি দেশ থেকে গম আমদানি হয় খুব কম। এর পরও দেশে গমের দাম বেড়েছে। এমনকি ভারত থেকে আসা গমও যুদ্ধের অজুহাতে বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিজনেস ইনসাইডারের হিসাবে, ২৫ ফেব্রুয়ারি গম বিক্রি হচ্ছে টনপ্রতি ২৯০ ইউরো। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিক্রি হয়েছিল টনপ্রতি ৩১৬ ইউরো আর ২৩ ফেব্রুয়ারি বিক্রি হয়েছিল টনপ্রতি ২৮৭ ইউরো।

যুদ্ধের অজুহাতে ছোলার দাম বাড়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে রমজানে বাড়তি চাহিদার কারণেই বেড়েছে দাম। খাতুনগঞ্জে এখন অস্ট্রেলিয়ার ছোলা বিক্রি হচ্ছে ভালো মানের কেজি ৬২ টাকা আর মাঝারি মানের ছোলা কেজি ৫৮ টাকায়।

খাতুনগঞ্জ আমদানিকারক পায়েল ট্রেডার্সের মালিক আশুতোষ মহাজন বলছেন, যুদ্ধের সঙ্গে তো ছোলার দামে কোনো সম্পর্ক নেই। এখন কেউ যদি এমন অজুহাত দিয়ে দাম বাড়তি বিক্রি করে, সেখানে আমি কী বলব? মূলত রমজান ঘিরে ছোলার বাড়তি চাহিদা থাকে বলেই একটু দাম বাড়ে। এখন যে দাম বেড়েছে, সেটি কেজিতে ৫০ পয়সার বেশি হবে না। ফলে একে তো দাম বাড়া বলে না।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/জিএসি-৩৯


সূত্র : কালের কণ্ঠ