সিলেট জেলা বিএনপির সম্মেলন তৃণমুল নেতাকর্মীদের মধ্যে সাড়া ফেলতে পারেনি। যতটা উৎসবমুখর হওয়ার কথা ছিলো বাস্তবে হয়েছে এর উল্টো। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটি গঠনে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ ওঠেছে। এই অবস্থায় ঠিক আগের দিন সম্মেলন স্থগিত করেছে কেন্দ্র।
জানা গেছে, সম্মেলনের দু-তিন আগে থেকেই বিভিন্ন উপজেলা কমিটি গঠন নিয়ে তৃণমুলে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অনেক উপজেলা থেকে জেলা কমিটির কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে- বিয়ানীবাজার উপজেলার সম্মেলনও হয়নি, পকেট কমিটি অনুমোদন করিয়ে নেয়ার চেষ্টা হয়েছে। আর কোম্পানীগঞ্জে চোর-ডাকাত ও মাদকসেবীদের পদ-পদবি দিয়ে কমিটি জমা দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে তৃণমুলে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, দীর্ঘ দিন থেকে জেলা পর্যায়ে শীর্ষ পদ-পদবি দখলকারীরা উপজেলা পর্যায়ে কাউন্সিলে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে বের করিয়ে নিয়ে আসতে প্রভাব বিস্তার করেন জেলা বিএনপির শীর্ষে থাকা বর্তমান কাউন্সিলের সভাপতি প্রার্থী এক নেতা। বিভিন্ন উপজেলায় সফলও হয়েছিলেন তিনি। এমন অসংখ্য অভিযোগ ছিলো কেন্দ্রে। কাউন্সিলে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী- এমন মনোভাব ছিল ওই শীর্ষ নেতার। বিষয়টি আচ করতে পেরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির সকল নেতাকর্মী ভোট দিতে পারবেন এমন নির্দেশনায় ঘুরে যায় মোড়।
এছাড়া শেষ পর্যায়ে এসে সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও কাইয়ুম চৌধুরী প্রার্থী হওয়ার পর শুরু হয় নতুন করে হিসেব-নিকেশ। কাউন্সিলের মাধ্যমে করা ৫ সদস্যের কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার নির্দেশনা আসলে নতুন রঙ ধরে পরিস্থিতি। এরই মধ্যে সিলেট জেলা পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের পছন্দের নির্বাচিত উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা মেতে উঠেন নিজেদের কর্মী দিয়ে কমিটি গঠনে। বিষয়টি এক পর্যায়ে চরম গোলাটে পরিস্থিতির জন্ম দেয়।
অভিযোগ রয়েছে- উপজেলা পর্যায়ে শীর্ষ ৫ পদে কাউন্সিল হওয়ার কারণে দুটি প্যানেলে বিভক্ত হয়ে বেশিরভাগ উপজেলায় সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত হন। সাধারণত একটি প্যানেল জয়ী হয়। দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। উল্টো অপদস্ত করা হচ্ছে। তেমনি ঘটনা ঘটেছে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে।
বিএনপির তৃণমুলের শীর্ষ নেতাদের বাদ দিয়ে পছন্দের কর্মীদের দিয়ে কমিটি গঠন করে জেলার আহবায়কের কাছে অনুমোদনের জন্য জমা দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই কমিটিতে যারা সম্মেলনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হয়েছিলেন, তাদের করা হয়েছে চরম অবমল্যায়ন। তৃণমূলের কর্মীদের কমিটিতে রাখাই হয়নি। এ নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি শওকত আলী বাবুল জেলা বিএনপির আহবায়কের কাছে একটি লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেছেন, কোনো প্রকার সমন্বয় না করেই চাচাতো দুই ভাই সভাতি ও সাধারণ সম্পাদক মনগড়া কমিটি জমা দিয়েছেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সভাপতি শাহাব উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক আলী আকবরের জমা দেয়া কমিটিতে বিগত উপজেলা কাউন্সিলের সভাপতি প্রার্থী অ্যাডভোটে কামাল উদ্দিনকে রাখা হয়েছে সদস্য হিসেবে।
সাধারণ সম্পাদক প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী কামাল উদ্দিনকে করা হয়েছে ৮১ নং সদস্য। যুগ্ম সম্পাদক প্রার্থী ছিলেন তাজ উদ্দিন আহমদ- তাকে করা হয়েছে ৯২ নং সদস্য। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে- বাবুল মিয়া নামের একজনকে ৯৪ নং সদস্য করা হয়েছে, যার বিরুদ্ধে এলাকায় গরুচুরির একাধিক অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ তিন দিন আগে মাদকসহ গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপির আহবায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার সিলেটভিউ-কে বলেন, আমার কাছে বিভিন্ন উপজেলা থেকে অভিযোগ এসেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, আগামীকাল সোমবার (২১ মার্চ) সিলেট জেলা বিএনপির সম্মেলন ও কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিলো। সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে সোমবার সকালে সম্মেলন ও দুপুর থেকে কাউন্সিলরদের ভোট প্রদানের সময় নির্ধারণ করেছিলেন নেতৃবৃন্দ। সব ঠিকঠাক থাকলে, সোমবার কাউন্সিলররা গোপন ভোটের মাধ্যমে জেলা বিএনপির শীর্ষ ৩টি পদে নেতা নির্বাচন করতেন।
কিন্তু হঠাৎ করে আগের দিন (আজ রবিবার) দুপুর ১টার দিকে কেন্দ্রের নির্দেশে এই সম্মেলন ও কাউন্সিল স্থগিত করা হয়েছে। বিষয়টি সিলেটভিউ-কে নিশ্চিত করেছেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কামরুল হুদা জায়গীরদার।
কী কারণে হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত? এমন প্রশ্নের সুস্পষ্ট কোনো উত্তর আনুষ্ঠানিকভাবে না মিললেও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র সিলেটভিউ-কে জানিয়েছে, বিয়ানীবাজার উপজেলা বিএনপির নতুন কমিটি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণে জেলার সম্মেলন ও কাউন্সিল স্থগিত করা হয়েছে। একপক্ষের অভিযোগ- বিয়ানীবাজারে 'পকেট কমিটি' প্রদান করা হয়েছে।
তবে অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সময়মতো প্রকাশ করতে না পারায় স্থগিত করা হয়েছে সম্মেলন ও কাউন্সিল।
আরও জানা গেছে, জেলা বিএনপির কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলটির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলনকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে কাদের এবং কোন নির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে তা এখনও বিস্তারিত জানা যায়নি।
সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম




