প্রিয় পাঠক
প্রত্যেক শহরেই কিছু কিছু মানুষ থাকে, যারা শিল্পী নন, সাহিত্যিক নন, ডাক্তার নন মোক্তার নন, শিক্ষক নন, অধ্যাপক নন, অভিনেতা নন, নন কোন রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তাদের নিয়ে শহর জুড়ে আলোচনা হয়, আনন্দ-কৌতুক হয় । তাদেরকে নিয়ে, তাদের আচার-আচরণ নিয়ে আবালবৃদ্ধবনিতা নিজের অজান্তে জড়িয়ে যান ওইসব মানুষের দৈনন্দিন হাসিকান্নার সাথে। তারা কখন কিভাবে এই সব আলোচিত চরিত্রে পরিণত হন তা কেউই বলতে পারে না । কিন্তু জীবনের পাঁকেচক্রে জীবন তাদের এমন অবস্থানে দাঁড় করিয়ে দেয় । তারা হয়তো কারো মা বা মাসি, অথবা কারো বাবা বা কাকা। কিন্তু জীবনের কঠিনবৃত্তে এদের সব পরিচয় মুছে যায় । তারা হয়ে যান ওই শহরের বিনোদনের অংশ । প্রত্যেক শহরে, বিশেষ করে গ্রামেগঞ্জের বাজারে তাদের দেখা পাওয়া যায় । সহজ ভাষায় এদের বলা হয় ‘পাগল’।
পঞ্চাশ, ষাট কিংবা সত্তরের দশকে যারা সিলেট শহরে ছিলেন তাদের সাথে আমার আজকের বর্ণিত এই চরিত্রগুলির অবশ্যই কোন না কোনভাবে, কখনো না কখনো পরিচয় হয়ে থাকবে। আগেই বলেছি এরা কোন উল্লেখযোগ্য বিশেষ ব্যক্তি নয়। তবে ঐ সময়, যে সময়ের কথা বলছি, সেই সময় আপনি কোন না কোনভাবে এদেরকে ভয় করেছেন বা এদের নিয়ে, এদের কথাবার্তা নিয়ে, এদের অঙ্গভঙ্গি নিয়ে আনন্দিত হয়েছেন। আজ সেইসব কাহিনী রোমন্থন করে ক্ষণিকের জন্য হলেও আপনি ফিরে যাবেন সেই অতীতে । শুধু তা-ই নয়, যাদের কোন সংশ্রব সিলেটের সাথে নাই, তারাও তাদের এলাকার এরকম কোন এক চরিত্রের কথা মনে করে ফিরে যাবেন আপনার ফেলে আসা সেই সোনালী অতীতে ।
(১)
ছইদ আলি । তার বিচরণক্ষেত্র ছিল শহরের কেন্দ্রস্থল বন্দর বাজার এলাকা । এই এলাকায় রাজা জি.সি. হাই স্কুল, দুর্গাকুমার পাঠশালা এবং একটু দূরে সিলেট সরকারি অগ্রগামী বালিকা বিদ্যালয় । বিশেষ করে দিনের বেশিভাগ সময় এই এলাকা ছিল ছইদ আলী পাগলের আওতাধীন । চেহারা ছিল প্রান উড়ে যাওয়ার মত বীভৎস । গায়ের রঙ ছিল প্রচণ্ড রকমের কালো । দেখলে মনে হবে ঈশ্বর যেন নিজের হাতে রঙের কৌটা উল্টে দিয়েছেন তার গায়ে । সেই সাথে উষ্কখুষ্ক চুল দাড়ি এবং রক্তজবার মত লাল টকটকে চোখ দুটি নিয়ে চোখ মুখ খিঁচিয়ে এসে যখন সামনে দাঁড়াত, তখন ঈশ্বর প্রদত্ত আত্মারাম নামক যে বস্তুটি শরীরের ভেতরে বিদ্যমান থাকতো, তার উড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকতো না । সে শুধু ভয়ই দেখাতো । ধরতো না বা মারামারি করতো না । তার লক্ষ্য থাকত ছোট ছোট স্কুলের ছেলেরা । কারন এরাই তার সাথে পাথর ছুড়াছুড়ি করতো । আর মেয়েরাতো দূর থেকেই ভয় পেতো । কাজেই ছোট বেলায় কখন কোন কাজে একা একা বন্দর বাজার গেলে সব সময় একটা ভয় ভয় কাজ করতো । ৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ছইদ আলীকে আর দেখা যায়নি ।
(২)
চম্পার মা। মদন মোহন কলেজে যারা পড়েছেন তারা আশাকরি চম্পার মাকে মনে করতে পারছেন । তাও স্বাধীনতা যুদ্ধের আগের কথা । কলেজ থেকে বেরোলেই লামাবাজার ভাতালি মোড়ে দেখা মিলত চম্পার মার । কথাবার্তায় খুবই সুন্দর মার্জিত । একা একা বকবক করে যাচ্ছে । কোনদিকে নজর নেই । কেউ কিছু দিলে নিচ্ছে, না দিলে না । কথা বললে জবাব দিচ্ছে সুন্দরভাবে । কিন্তু শহরের একজন বিখ্যাত বাবুর নাম জিজ্ঞাস করলেই চম্পার মা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতো । ‘‘কিতাগো চম্পার মা ভালা আছ নি ?’’
‘‘অয়রে বাবা ভালা আছি। তুমরা ভালা নি?’’
‘‘ওগো চম্পার মা অমুক বাবুয়ে নু তুমার কথা জিগাইচইন।’’
আর যায় কোথায় ।
‘‘তোরে রে তোরে মেথরের জুতা দিয়া মারমু।’’
মনে হতো , চম্পার মার হাতে সবচেয়ে বড় আর শক্তিশালী অস্ত্র ছিল মেথরের জুতা। ৭২ সালে দেশে ফিরে আর চম্পার মা’র দেখা মিলেনি ।
(৩)
দিদিমা। দিদিমার আদি নিবাস ঢাকা জেলায়। থাকতেন জল্লারপাড় এলাকায় । মাঝে মাঝে কাষ্টঘর আসতেন । বাড়ীর কাজে সাহায্য সহায়তা ছিল তার পেশা । সেই সুবাদে বিভিন্ন এলাকায় তাকে দেখা যেতো । অত্যন্ত অমায়িক , গৃহকর্মে পটু ছিলেন এই মহিলা । কিন্তু দিদিমা কয়টা বাজছে বললেই জ্বলে উঠতেন তেলে বেগুনে । অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে, সেই সময় এলাকায় তার সমকক্ষ কেউ ছিল না । বিশেষ করে এলাকার উঠতি বয়সী ছেলে ছোকরারাই সবচেয়ে বেশি জ্বালাতন করতো তাকে। তার গালাগাল আদি রসাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যেতো । আর এইসব শুনে উঠতি বয়সী পোলাপানরা খুবই পুলকিত হত । একদিন আমাদের কৃপেশদা বয়সে অনেক বড় , তখন সে দুই তিনটা বাচ্চার বাবা । একদিন জিজ্ঞেস করে বসলো- ‘‘ও দিদিমা , তোমার দাদামশাই কোথায়?’’
‘‘দেখগা তোর বউয়ের সাথে ঘুমাই রইছে।’’
এই হল দিদিমা। কেউ ১২টা বেজেছে কি না জিজ্ঞেস করলে, প্রশ্নকর্তার কাপড় খুলে ফেলতে চায় এমন অবস্থা ।
(৪)
শাবানা । এই শাবানা বয়সে ছিল তরুণী । তবে সে নায়িকা শাবানা নয়। অভাবের সংসারে বড় হওয়া এই শাবানা মাঝে মাঝে বাসায় আসতো । পাড়ার বাচ্চাশিশুরা তাকে দেখলেই শাবানা বলেই চিৎকার করে উঠত । আর সাথে সাথে শাবানা ও অ্যাকশনে যেতো ।
‘‘ইডিয়ট , ননসেন্স , জানছ নি আমি কে ? আমি কমিশনারর বাতিজি । আমারে তুই শাবানা কছ।’’
এবার দেশে গিয়ে শাবানাকে আর দেখতে পাইনি ।
(৫)
পণ্ডিত। সবচেয়ে নির্বাক ছিলেন এই পন্ডিত । সিলেট জেলখানার আশেপাশে ধোপাদিঘির পাড়ে ছিল তার বিচরণ । অত্যন্ত নীরব এই ব্যক্তিটি কারো কাছে কিছু নিতেন না বা কেউ কিছু দিলে কখনো নিতেন আবার কখনো না । মানুষজন তাকে বেশ সমীহ করতো । কখন খেতেন কখন বা না খেয়েই কাটিয়ে দিতেন । তার জমানো টাকা পয়সা টোকাই ছেলেমেয়েরা কেড়ে নিতো। কখনো নিজ থেকে দিয়ে দিতেন । আবার চিৎকার করে প্রতিবাদ করতেন । ’৭১ সালের পর তাকে আর দেখা যায় নি।
আলোচিত বা বর্ণিত ব্যক্তিদের আচার আচরণ সম্মন্ধে ব্যক্তি বিশেষের উপলব্ধি ছিল ভিন্ন ভিন্ন । যেমন তাদের উপস্থিতি কারো নিকট ছিল ভীতির , কারো কাছে আবার ছিল আনন্দের খোরাক । আবার কারো কারো কাছে ছিল নিতান্তই বিরক্তিকর।
পণ্ডিতের মাঝে কেউ কেউ আবার আধ্যাত্মিকতা খুঁজে ফিরতেন । এরা কেউ যেমন সমাজের অত্যাবশ্যকীয় জন ছিল না তেমনি এদের কাউকে ইতরজন বলেও ভাবার অবকাশ ছিল না ।
স্বাধীনতাত্তোরকালে এদের অনেকেরই উপস্থিতি ছিল না। এতে কারো মনে কোন অনুশোচনা রেখাপাত করে নাই । কিন্তু কিছু কিছু অনুসন্ধানী মন এদের অভাবও বোধ করতেন । উল্লেখিত ব্যক্তিদের বর্ণনাতে আমার ভুল ত্রুটি মার্জনা করবেন । ভুল বা ত্রুটি ইচ্ছাকৃত নয় । জানার অপ্রতুলতা অথবা স্মৃতির দুর্বলতা ।
উপরে উল্লেখিত মানুষগুলো হয়তো সাধারণ জীবনাচরনের বাইরে অবাঞ্ছিত কিছু চরিত্র । পাগল নামে তাদেরকে আমরা উপহাস করি,তামাশা করি। মনোবিজ্ঞানীরা হয়তো জানেন তাদের মনোবিকারের কারণ । এদের কেউ হয়তো জন্মগত পাগল । কেউ হয়তো কোনো এক গভীর বেদনায় জীবনের খেই হারিয়েছেন । কেউবা কোনো এক প্রচন্ড মানসিক আঘাতে অথবা বিরহ বেদনায় বিত্ত বৈভবের আয়েশী জীবনকে তুচ্ছ করে ঘরহীন হয়েছেন । অবারিত প্রান্তরকে করেছেন আপন ঠিকানা । কিন্তু এরকম সংজ্ঞায়িত পাগলের বাইরেও কী পাগল নেই ?
পৃথিবী জুড়ে আমরা গৃহবাসী, সমাজবাসী লোকজনও তো মাঝেমাঝে পাগলের উপাধি পাই। নানা কারণে একজন আরেকজনকে প্রায়শঃই কী বলি না, ‘তুমি তো দেখছি বড্ড পাগল’। কেউ পাগল অর্থের, কেউ যশ-খ্যাতির, অধুনা ফেসবুকে আত্মপ্রচারণার । মাঝেমধ্যে মনে হয়, পৃথিবীর এই রঙ্গশালায় আমরা হয়তো সকলেই কোনো না কোনোভাবে পাগল।
জীবনের পড়ন্তবেলায় প্রচুর অবসর । হয়তো বা তাই অপ্রয়োজনীয় ভাবনাগুলো ঘুরপাক খায় একইবৃত্তে । মন্ট্রিয়লে আমার বাসার পাশে একটি ম্যাকডোনাল্ড আছে । প্রায়ই কফি নিয়ে গিয়ে বসি এর বারান্দায় । কখনও বিধায়ক আসে, মাঝেমধ্যে আসে আরো কেউ । সূচিহীন আলাপচারিতা । তবে বেশিরভাগ সময়ই একাকী । তখন, কফির ধুমায়িত বাষ্প নর্তকীর মতো ঢেউ তুলে যেমন দূরাকাশে উবে যায়, তেমনি আমার অসংলগ্ন ভাবনাগুলোও মনটাকে কেমন উতলা করে দিয়ে একেবেঁকে মিলিয়ে যায় সীমানাহীন উপরে । পেছনের অনেক কথা মনে হয় । জীবনপথের দীর্ঘ দূরত্ব কাছাকছি আসে । সামনের সড়কপথে কতো যান, কতোজন যাওয়া আসা করে । অবলোকন করি চঞ্চল গতিতে চলমান এই জীবন । কখনো দৃষ্টি যায় আকাশে । আকাশের মেঘগুলো যখন উড়ে উড়ে যায। ভাবি, এই মেঘমঞ্জরী কী ছুঁয়ে এসেছে আমার ফেলে আসা প্রিয় স্বদেশ! বিড়বিড় করে কথা বলি- স্বগতঃ।
নিউম্যান স্ট্রিটের এপথে এখন অনেক বাঙালির আনাগোনা । আমার উদাস আর স্থিরদৃষ্টি, আনমনে একাকী কথা দেখে সেসব পথচারীর কেউ যে আমাকেও পাগল ভাবছে না– তারই বা নিশ্চয়তা কী?
আসলে আমরা তো পাগলই । বেশভূষাধারী পাগল। ঐ যে লালন বাউলের গান আছে “এতো দেখছি সব পাগলের মেলা । পাগলের সঙ্গে যাবি পাগল হবি, বুঝবি শেষে, তোরা সব যাসনে ঐ পাগলের কাছে…”।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিডি




