ঢাকার টিপকাণ্ড ও নওগাঁর হিজাব ইস্যু নিয়ে দেশে যখন বইছে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়, ঠিক তখন আবারও সামনে আসলো গত মাসে সিলেট তোলপাড় করা সেই নেকাব ইস্যু। এ ঘটনায় গঠিত দুটি কমিটির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে এক কমিটি। আরেকটি কমিটির তদন্ত চলছে।
সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে গত ১৫ মার্চ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুনীল চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ক্লাসে এক ছাত্রীকে নেকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি পরে ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে ওই ছাত্রীর বাবা জানান। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করতে দুটি কমিটি গঠন করে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। একটিতে রাখা হয় স্কুলের গভর্নিং বডি’র কয়েকজন সদস্য ও অপরটিতে উপজেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা। এর মধ্যে গভর্নিং বডি’র কমিটি গত রোববার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
জানা যায়, করোনার ছুটি শেষে গত ১৫ মার্চ নাছির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস শুরু হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ক্ষতি পোষাতে ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করে কর্তৃপক্ষ। ১৫ মার্চ বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক আমিন উদ্দিন অনুপস্থিত থাকায় ক্লাস নিতে যান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুনীল চন্দ্র দাস। ওই ক্লাসেরই এক ছাত্রী তার বিরুদ্ধে নেকাব খুলতে বাধ্য করার অভিযোগ তোলে।
সেদিন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের অক্সিজেনের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য বুকভরে শ্বাস নিতে বলেন সুনীল চন্দ্র দাস। তবে নেকাব খুলতে ওই ছাত্রী আপত্তি জানায়। আপত্তির পরও সুনীল তাকে বার বার নেকাব খোলার কথা বললে অবশেষে ওই ছাত্রী নেকাব খোলে।
পরে বিষয়টি বাড়িতে গিয়ে মা-বাবাকে জানায় মেয়েটি। মা মোবাইল ফোনে বিদ্যালয়ের গভর্নিং বডির সভাপতিকে অভিযোগ করেন। অন্যদিকে তার বাবা আব্দুল হালিম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়ে মেয়ের সঙ্গে শিক্ষকের এই আচরণের বিচার চান।
ওই ছাত্রীর বাবার ফেসবুক স্ট্যাটাসের পর এলাকার অনেকে বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকে লিখতে থাকেন। কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বোরকা ও হিজাব নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তোলা হয় এবং স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
সে রাতেই ওই ছাত্রীর বাসায় যান অধ্যক্ষ সুনীল চন্দ্র দাস ও কয়েকজন শিক্ষক এবং গভর্নিং বডির কয়েকজন সদস্য। মেয়ের বাবার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে বিষয়টি মিটমাট করে নেন তারা।
এরপর স্কুলছাত্রীর বাবা ফেসবুকে আরেকটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘ফেসবুকে আমার মেয়ে ভাদেশ্বর নাছির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০২২ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে নিয়ে সম্পূর্ণ মনগড়া ও ভ্রান্ত কিছু লেখালেখি আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যা অত্যন্ত লজ্জাজনক। শ্রেণিকক্ষে সব ছাত্রছাত্রীর করোনার মাস্ক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করা হয়। এখানে আমার মেয়ের হিজাব খোলার বিষয়টি আদৌ সত্য নয়। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ জানাই।’
এর মধ্যে বোরকা ও হিজাবে মুখ ঢাকা আরেকটি মেয়ের ভিডিওবার্তা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। মেয়েটি নিজেকে ওই ছাত্রীর সহপাঠী দাবি করে ভিডিওতে বলে- ওই ক্লাসে সেদিন সুনীল তার বান্ধবীকে নেকাব খুলতে বাধ্য করেন।
ওই ভিডিওর পর এলাকায় ক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে ২০ মার্চ এলাকাবাসীকে নিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে সভা ডাকেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শামীম আহমদ। সেখানে এলাকাবাসী সুনীল চন্দ্রের শাস্তি দাবি করেন।
পরে এ বিষয়ে দুটি তদন্ত টিম গঠন করা হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির টিম হয় ৫ সদস্যের এবং উপজেলা প্রশাসনের টিম হয় ৩ সদস্যের। এর মধ্যে গভর্নিং বডির তদন্ত কমিটি গত রোববার প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই কমিটির প্রধান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শামীম আহমদ প্রতিবেদনে কী আছে- সেটি এখনই জানাতে চাচ্ছেন না। তিনি বলেন, তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হয়েছে। গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানাবেন।
এই ঘটনা তদন্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. গোলাম কবিরের গঠন করা কমিটির প্রধান উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত কাজ শুরু করেছি। তদন্ত চলমান আছে। এখন কিছু বলার সুযোগ নাই। তদন্ত শেষ হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।’
সিলেটভিউ২৪ডিটকম / ডালিম




