বন্যার পানিতে ভেসে গেছে হাওরের জেলা সুনামগঞ্জের প্রায় দুই হাজার পুকুরের মাছ। মৎস্য খামারীরা বলছেন এতে প্রায় ৫ কোটি টার্কা ক্ষতি হয়েছে।
হাওর ডুবির লোকসান কাটিয়ে উঠার আগেই বন্যায় এমন ক্ষতিতে দিশেহারা তারা। ক্ষতি পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে সরকারের সহায়তা চান তারা।
বছরের ছয় মাস ধান আর বাকি ছয়মাস মাছ চাষ-আহরণের জীবিকা নির্বাহ করেন হাওর অঞ্চলের মানুষ। হাওর ডুবির পর নিত্য পণ্যের বাজারে মাছকে ঘিরে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছিলেন খামারীরা। তবে উজানের পানি এসে দানবের মতো চিনিয়ে নিলো মাছ চাষীদের মুখের হাসি।
বন্যার পানিতে ভেসেগেছে সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়ারাবাজার, ও সদর উপজেলা, বিশ্বম্ভরপুরসহ কয়েকটি উপজেলার প্রায় দুই হাজারের অধিক পুকুরের মাছ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন উজানের ছাতক ও দোয়ারাবাজার উপজেলার খামারীরা।
খামারিরা বলছেন, আর কয়েকদিন পড়েই মাছ বাজারে বিক্রি করতে পারতেন তারা। টানা কয়েকদিনের ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পুকুরের পানি উপচে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ও বড় মাছ বেরিয়ে গেছে। এতে কয়েক কোটি টাকার ক্ষতিও হয়েছে।
এমন অবস্থায় পরিবারের জীবিকা সংগ্রহ আর ঋণ শোধ করা নিয়ে দুঃ চিন্তায় দিন কাটছেন তারা।
সদর উপজেলার জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়নের দুর্লভপুর গ্রামের মাছ চাষী চাঁন মিয়া। ৫টি পুকুরের ২৬ খানি পুকুরে মাছ চাষ করেছিলেন তিনি। ২টি পুকুরে ছিল মাছের রেনু। বাকি তিন পুকুরের মাছ বড় হয়ে আসছিল। আরও দুইতিন সপ্তাহ পড়েই পুকুরের মাছ বিক্রি করতে পারতেন তিনি। বন্যার পানিতে এসব পুকুরের মাছ ও রেনু হারিয়ে ক্ষতিরমুখে এই মাছ খামারীর।
চান মিয়া বলেন, বন্যায় আমারে নিঃস্ব করে গেছে। আমার প্রায় ৮-১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠা অসম্ভব।
একই গ্রামের কাওসার জানান, তার একটি পুকুরে রই, কাতলা, ষড়পুঁটি, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ছিল। আর কয়েকদিন পরেই বিক্রি করার কথা ছিল তার। যার আয় দিয়ে তার সংসার চলতো এখন সেই পুকুরে একটাও মাছ নেই। প্রায় ৪ লাখ টাকার মাছ বন্যায় ভেসে গেছে। আগামীতে যদি মাছ ঘুরে দাঁড়াতে হয় তাহলে সরকারি সহযোগিতা প্রয়োজন বলে জানান কাওসার।
সুরমা ইউনিয়নের ভৈষাড়পার গ্রামের মাছচাষী মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতি বছরই মাইর খাই। এবারও বন্যায় মাইর খেলাম। চোখের সামনে পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। জাল দিয়ে অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু পারিনি। প্রায় ৭০ ভাগ মাছ ভেসেগেছে।
জেলা মৎস্য বিভাগ বলছে বন্যার পনিতে এ পর্যন্ত ১২৫০ পুকুর ভেসে গেছে। এর মধ্যে ১৫০ মে.টন মাছের পোনা ও ৫০ মে.টন বড়মাছ ভেসে গেছে। জেলার ছাতক উপজেলায় ৭৫০ টি, দোয়াবাজার উপজেলায় ৪৩৫টি এবং সদর উপজেলায় ৬৫টি পুকুরের মাছ ভেসেগেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে তিন কোটি ৩৭ লাখ টাকার ক্ষতি হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রকৃত পক্ষ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন হাওর সংশিষ্ট সংগঠনের নেতারা।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, বন্যায় সুনামগঞ্জে প্রায় ২ হাজার পুকুরের মাছ ভেসেগেছে। এতে অনেক মৎস্যচাষী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মাছ চাষীদের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সরকারের নিকট তুলে ধরে খামারিদের ঘুরে দাঁড়াতে ব্যাংক থেকে বিনা সুদে ঋণ দিতে হবে। নতুবা খামারীরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না।
খামারিদের ক্ষতির কথা স্বীকার করে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা করে প্রনোদনা দিতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবা পাঠানোর কথা জানিয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সুনীল মন্ডল বলেন, বন্যায় যে খামারিরা ক্ষতিগস্ত হয়েছেন তাদের তালিকা তৈরী করে মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। যাতে সরকার খামারিদের প্রনোদন প্রদান করেন সেই ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করবো।
টানা ভাড়ি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃুনামগঞ্জে বিস্তির্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। তলিয়ে যায় কয়েক শতাধিক গ্রাম। তবে বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতির কিছৃুটা উন্নতি হয়েছে।
সরকারের সহায়তায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষীরা আবার ঘুরে দাঁড়াবেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/জেসি/এসডি-৩০




