সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রেগুলো ভাতের হাহাকার চলছে। সেই সঙ্গে বন্যা দুর্গতদের মধ্যে চরম দূর্ভোগ দেখা দিয়েছে। এ উপজেলায় সরকারি-বেসরকারি স্কুল কলেজসহ দেড় শতাধিক আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে বন্যা কবলিত লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

 


এছাড়াও উঁচু স্থান হিসেবে খ্যাত ট্যাকেরঘাট ও বাদাঘাট এলাকায় আত্মীয় স্বজনসহ ব্রিজ ও খোলা মাঠে গবাদিপশু নিয়ে তাবু টাঙ্গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক হাজার ভুক্তভোগী। এসব আশ্রয় কেন্দ্রেগুলোতে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, এক মুঠো ভাত ও শুকনো খাবারের জন্য হাহাকার চলছে। কেউ তাদের দেখতে গেলে তালা-বাসন নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন খাবারের জন্য। কোনো কোনো আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ আর গরু একসঙ্গে বসবাস করছেন। খাবার জুটছে না একবেলাও।

 

হঠাৎ এতো বড় বন্যায় হাওরের উত্তাল ঢেউয়ে ঘর বাড়ি হারিয়ে নিশ্ব হয়ে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্থরা। গত তিন দিনের মধ্যে এখনও সরকারি সহায়তা পাননি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থরা। উপজেলা প্রসানের পক্ষ থেকে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

 

বন্যা কবলিতদের উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণে জেলা সদরসহ কয়েকটি উপজেলায় সেনা মোতায়েন করা হলেও তাহিরপুর উপজেলায় সেনা মোতায়েন করা হয়নি। এজন্য বন্যা কবলিতরাসহ স্থায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মাহিনসহ কয়েকজ ছাত্র তাহিরপুর উপজেলায় সেনা ও নৌবাহিনী মোতায়েন করে আশ্রয় কেন্দ্রে ও বন্যা কবলিতদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

রবিবার দুপুরে দুপুরে উপজেলার শ্রীপুর (উত্তর) ইউনিয়নের মন্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়ে কথা হয় সুফিয়া বেগমের সঙ্গে। সুফিয়া বেগম বৃহস্পতিবার রাতের বন্যার বর্ণনা দিতে গিয়ে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলেন।

 

তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি আর হালকা বাতাস হচ্ছিল। সন্ধার দিকে একটু বেশি। এসব দেখে পরিবারের সবাইকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। হঠাৎ রাত একটার দিকে চেয়ে দেখেন ঘরের ভিতরে পানি। তখন দেখতে দেখতে ঘরের মধ্যে হাঁটু পানি বৃদ্ধি পায়। একপর্যায়ে উপায় না পেয়ে সবাইকে নিয়ে এই আশ্রয় কেন্দ্রে এসে  আশ্রয় নেন। ঘরে পানির মধ্যে রেখে আসেন সারা বছরের খোড়াক (ধান)। এখন পরিবারের ৬ জন সদস্য নিয়ে কিভাবে সারা বছর চলবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না।

 

তিনি বলেন, আমার মতো আশপাশের শতাধিক পরিবার এখানে এসে আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচিয়েছেন।

এই আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা রিনা বেগম নামে একজন জানান, গত দুইদিন ধরে এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। এই দুই দিনের মধ্যে শ্রীপুর উত্তর ইউপ চেয়ারম্যান এসে এক কেজি করে শুধু চাল দিয়ে গেছেন। যা দিয়ে একবালাও হয়নি। এছাড়া এখানে উপজেলা প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও এলাকার বিত্তবানরা আসেন নি।

 

বড়দল আশ্রয় কেন্দে ৪টার দিকে গিয়ে দেখা যায়, এখানে আশ্রয় নেয়া কয়েকশো পরিবাবরের মধ্যে তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো.রায়হান কবির নিজ হাতে রান্না করা খিচুড়ি বিতরণ করছেন। তবে, প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সরকারি সহায়তা এখন না পৌঁছায় মারাত্মক খাবার সংকটে ভূগছেন আশ্রয়তরা।

 

এইদিকে আশ্রয় কেন্দ্র ছাড়াও বন্যা কবলিত অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে উপজেলার উচু স্থান ট্যাকেরঘাট ও বাদাঘাট এলাকায় এসে আত্মীয় স্বজন আর পরিচিতজনদের বাড়িত আশ্রয় নিয়েছেন।

অপরদিকে, তাহিরপুর সীমান্তবর্তী বাগলী থেকে লাউড়ের গড় পর্যন্ত পাহাড়ি ঢলে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাস্তা ঘাট, বাড়ি ঘর, ভেঙে গেছে। পুকুর ভেঙে লাখ লাখ টাকার মাছ হাওরে চলে গেছে। ওপার থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালি এসে বসতঘর সহ ফসলি জমি ভরে গেছে। সীমান্তের মানুষ এখন এক অসহনীয় দূর্ভোগ ভোগ করছেন।

সীমান্তবর্তী লাকমা গ্রামের দ্বিন ইসলাম জানান, হাওর এলাকার বন্যা কবলিত ট্যাকেরঘাট স্কুল এন্ড কলেজ ও লাকমা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রায় ৬০০ শত পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের সঙ্গে তেমন কাপড়-চোপড়, খাবার নেই। খাবারের অভাবে খুব কষ্টে আছেন। একবেলা রান্না করা খিচুড়ি দিলেও ৩ বেলা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে তাদের।

 

রবিবার সরেজমিনে বালিয়াঘাট নতুন বাজার ও শ্রীপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি ও পানি বেশি হওয়ায় ঘর থেকে বের হতে পারছেন গ্রামবাসীসহ দোকানীরা। ইউনিয়নের সঙ্গে উপজেলা ও জেলার যাতায়াত ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। বন্যা কবলিত অনেকের ঘরে চাল-সবজি থাকলেও রান্না ঘরে পানি থাকায় সেগুলো রান্না করে খেতে পারছেন না। ভয়াবহ বন্যায় উপজেলার অধিকাংশ হাট বাজার পানিতে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ বাজারগুলোতে এখন হাঁটু থেকে কোমর পানি। এসব বাজারে ছোট ছোট নৌকা দিয়ে চাল, ডাল কিনতে দেখা গেছে। উপজেলার যেসব বাজারে এখনও পানি উঠেনি এসব বাজারে শুকনো খাবার, সিলিন্ডার গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। আবার কোনো কোনো দোকানী  গ্যাস, মুড়ি মম বাতি, কুপী বাতি চড়া ধামে বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে।


 
উপজেলার বানিয়ে গাঁও গ্রামের সুজন মিয়া বলেন, এতো পানি আমার জন্মের পরও দেখেনি।আগের কিছু চাল ছিল, আর সামান্য কিছু বাজার করেছি। পানির জন্য প্রায় দোকানপাট বন্ধ থাকায় মানুষ চড়া দামে চাল, ডাল কিনছেন।

 

বালিয়াঘাট নতুন বাজার চাল ব্যবসায়ি আমিন মিয়া বলেন, হঠাৎ বন্যার পানি এসে আমার দোকানে থাকা প্রায় দুইশতাধিক চাউলের বস্তা পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব চাউলের বস্তা নিয়ে এখন দূর্ভোগ পোহাচ্ছি।

গোলাবাড়ী গ্রামের অন্ধ তোষা মিয়া বলেন, তার শেষ সম্বল ভিটাটুকু বন্যায় হাওরের ঢেউয়ে নিয়ে গেছে। জয়পুর গোলাবাড়ি গ্রামে কোনো আশ্রয় কেন্দ্র নেই। টাঙ্গুয়া ওয়াস টাওয়ারের সঙ্গে একটি আশ্রয় কেন্দ্র সরকার দিলে হাওর পাড়ের কয়েকটি গ্রামের মানুষ এমন বন্যায় আশ্রয় নিয়ে জীবন বাঁচাতে পারবে।

 

বন্যা কবলিত কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের মানুষজন পানি বন্ধি হয়ে আছেন।  চারদিকে পানি আর পানি। রাস্তাঘাট, দোকানপাট এবং বাড়ি ঘরের মধ্যে হাটু পানি থেকে কুমোর পানি। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে এখন পানি কিছুটা কমতে শুরু করেছে।

 

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির বলেন, এখনও আবহাওয়া অনূকূলে নয়। থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, পানি কিছুটা কমলেও দূর্ভোগ কমছে না। চলছে উদ্ধার তৎপরতা ও বন্যার্তদের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ। উপজেলা প্রশাসনের ৫ টি টিম উপজেলাব্যাপী কাজ করছে।

 

তবে, আশ্রয়, খাবার ও  বিশুদ্ধ পানিয় জলের অভাবে বানভাসী মামুষেরা দূর্দশাগ্রস্তের মধ্যে রয়েছেন। প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/এমএআর/এসডি-৩৭