সিলেটের মহাসড়ক, আঞ্চলিক সড়ক ও উপজেলা সড়কগুলো মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। এতে মারা যাচ্ছেন অনেকেই। আবার বহু মানুষ আহত/গুরুতর আহত হচ্ছেন। এরা কেউ কেউ পঙ্গুত্ব বরন করছেন আবারও কেউ বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে গেল ১৯ দিনে সিলেটের সড়কগুলো দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মারা গেছেন অন্তত ২৫ জন। আহত হয়ে অসংখ্য লোকজন। এমন তথ্য সিলেটভিউ’র অনুসন্ধানে উঠেছে এসেছে। তবে হাইওয়ে পুলিশ বলছে- অদক্ষ চালকদের কারণে ঘটছে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা। তবে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে এসব বেপরোয়া চালক ও বাহনের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চালকদের অতিরিক্ত ডিউটি ও আয় করার প্রবণতায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। ভাঙাচোরা ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক, ভুয়া লাইসেন্সধারী চালক, গাড়ির অতিরিক্ত গতি, ওভার টেকিং, নিয়ম না মানার প্রবণতা এবং জনসচেতনতার অভাবে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া যানজটে পড়ে সময় ক্ষেপণ হওয়ায় পরবর্তীতে দ্রুত চালিয়ে তা পুষিয়ে নেয়ার মানসিকতাই আর চালকদের বেসামাল আচরণের কারণে ঘটছে বেশির ভাগ দুর্ঘটনা। তারমধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াদের মধ্যে বেশি রয়েছেন রং সাইড দিয়ে দ্রুত যাওয়া আরোহীরা।


আমাদের প্রতিবেদক ও সিলেটভিউ২৪ডটকমের প্রতিনিধিদের তথ্যানুসারে দেখা গেছে- গত ৩ জুলাই সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের জৈন্তাপুরের চিকনাগুলে ট্রাক-মোটরসাইকেল সংঘর্ষে ৩ বন্ধু নিহত হন। তারা হলো- জসিম উদ্দিন (১৬), আজিম উদ্দিন (১৬) ও ফহিদ রহমান অমি (১৬)। নিহতরা সকলেই জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী।

৪ জুলাই মহাসড়কের ওসমানীনগর উপজেলার বেগমপুর সংলগ্ন ভাঙা নামক এলাকায় সবজী বহনকারী ট্রাক উল্টে ৩ জন নিহত হন। তারা হলেন- সাজিদ মিয়া, ছালিক মিয়া ও আরকান হোসেন।

৬ জুলাই সকালে হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে সিমেন্ট বোঝাই কাভার্ডভ্যানের চাপায় পায়েল মিয়া (২০) নামে ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক নিহত হয়েছেন। নিহত পায়েল মিয়া আজমিরিগঞ্জ পৌরসভার নগর গ্রামের কুদ্দুছ মিয়ার ছেলে।

৭ জুলাই সন্ধ্যায় হবিগঞ্জের মাধবপুরের দেবপুর মদিনা মার্কেট এলাকায় মোটরসাইকেলের চাপায় সিরাজুল ইসলাম শেরু মিয়া (৬৫) নামে এক পথচারী নিহত হয়েছেন। একই দিন দুপুর ২টায় হবিগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কে ছেলের মাছ ধরা দেখতে গিয়ে মানিক মিয়ার (৫৫) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী মারা গেছেন। তিনি উপজেলার কাতুকর্নপাড়া মহল্লার মৃত ছমেদ মিয়ার ছেলে।

৯ জুলাই শনিবার সন্ধ্যায় সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের কানাইঘাট জুলাই ব্রিজ সংলগ্ন সড়কের বাজারে দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে তাওহিদ আহমদ (১৭) নামের এক কিশোর মারা যান। তিনি উপজেলার সাতবাঁক ইউনিয়নের জুলাই মাঝরচটি গ্রামের কটাই মিয়ার ছেলে।

১১ জুলাই সোমবার সকাল ১১টার দিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ফয়েজ আহমদ (২৩) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার গোড়াগ্রামের নুর ইসলামের ছেলে।

১৩ জুলাই বুধবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার রতনপুর নামক স্থানে কাভার্ড ভ্যানের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন- উপজেলার ছাতিয়াইন ইউনিয়নের এক্তারপুর গ্রামের মহিউদ্দিনের ছেলে আরিফ (১৯) ও ফরাশ উদ্দিনের ছেলে লিটন (২০)।

১৭ জুলাই ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নবীগঞ্জ উপজেলার রুস্তমপুর টোল প্লাজা এলাকায় বাস ও সিএনজির মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩ জন নিহত হয়েছে। তারা হলেন- ছাত্রদল নেতা এহিয়া চৌধুরী ওরফে জাবেদ (২৪), তার চাচী বকুল বেগম (৫৫) এবং সিএনজি চালক রব্বান মিয়া (৪০)।

একই দিন সিলেট-বারইগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে কাসেম আহমদ নামের এক বৃদ্ধ মারা যান।

১৮ জুলাই দুপুর ২টার দিকে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বাখরনগর গেইট নামক স্থানে বাস ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ঘটনাস্থলে চারজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন, নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার ফহেতপুর গ্রামের আব্দুর রউফের ছেলে মুরাদ মিয়া (২২), একই গ্রামের সুরুজ আলীর স্ত্রী দিলারা বেগম (৪০) ও ইমরুল মিয়ার স্ত্রী হেলেনা আক্তার (২৫)। নিহত অপর একজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

১৯ জুলাই মঙ্গলবার দুপুরে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট পৌর এলাকার লক্ষীপুর নামক স্থানে বালুবাহী ট্রাক চাপায় হিরা মিয়া (৬৫) নামের এক বৃদ্ধ রিকশা চালক নিহত হয়েছেন। তিনি ধলাইপার গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদের ছেলে।

একই দিনে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কান্দিগাঁও নামক স্থানে পিকআপ ভ্যানের চাপায় বাবা ও ছেলে নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- কান্দিগাঁও গ্রামের ইউসুফ আলী (৫০) ও তার ছেলে মোহাম্মদ আলী (৫)।

গত ২০ জুলাই দুপুরে ওসমানীনগর উপজেলার সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের তাজপুর দিগর-গয়াসপুর এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এনাম বকস (২৬) নামের একজনে নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রামের ছালিক বকসের ছেলে।

একই দিন সিলেট-বারইগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে ঔষধ কোম্পানির গাড়ি ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে আসাদুজ্জামান মুন্না (২২) নামের এক মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার শেওলা ইউনিয়নের বাসিন্দা।

এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেটের সভাপতি ময়নুল ইসলাম বলেন, ঠিকঠাকভাবে গন্তব্যে পৌঁছানোর লক্ষ্যেই চালকরা গাড়ি চালান। এর মধ্যেই কিছু দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তবে কিছু সচেতন থাকেন না। এর দায় তো চালকদের আছেই।

তিনি বলেন, হাইওয়েতে যেসব যানবাহন চলাচল করে সেগুলোর চালক আলাদাভাবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। এছাড়া বড় বড় কোম্পানির বাস চালকদের জন্য নিজস্ব প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও রয়েছে।

এ বিষয়ে সিলেট হাইওয়ে পুলিশের এসপি মো. শহিদুল্লাহ সিলেটভিউ’কে বলেন, রাস্তায় উঠতি বয়সী ছেলেরা মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়। তাদের নাই লাইসেন্স। সঙ্গে থাকে না হেলমেট। রাস্তায় গতির প্রতিযোগিতা করে। ফলে অনাখাঙ্খিত দুর্ঘটনা ঘটে। অনেকেই আবার সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। আমরা তাদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করি।

তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে সিএনজি চালিত অটোরিকশা, ত্রি-হুইলার চলাচলের অনুমতি নেই। তবুও এরা উঠে যায়। এদের যানবাহন চালানোর লাইসেন্স নেই। লাইসেন্সবিহীন এসব দক্ষ ড্রাইভারদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছি। আবার এসব অদক্ষ ড্রাইভারদের কারণে কারো মৃত্যু হলে আমরা তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করি।

হাইওয়ের এই পুলিশ সুপার বলেন, আমরা গত তিন মাসে স্পিড গানে ১ হাজার ৬৮৫ টি, ১ হাজার ৭১৫ টি ত্রি-হুইলার ও ৮১১ টি মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছি। আমাদের এসব কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

এসপি শহিদুল্লাহ আরও বলেন, অনেক সময় পথচারীদের ভুলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। যে যেভাবে পারছে সড়ক পার হচ্ছে। আমরা সচেতনতা বৃদ্ধি করতে কাজ করছি। বিভিন্ন সময় সভা-সেমিনার করছি। চালক ও হেলপারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তবে আমাদের সকলকে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে সচেতন হতে হবে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/মুন্না/