সিলেট মহানগরী ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় সিটি করপোরেশনের নির্দেশনা ও সমন্বয়ে পরিচালিত একমাত্র গণপরিবহন ‘নগর এক্সপেস’। উন্নত যাত্রীসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে চালু হওয়া এই ‘নগর এক্সপেসে’ কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে হতাশ সিলেট মহানগরবাসী। রয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তির অভিযোগ।

 


জানা যায়, ২০১৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর সিলেট নগরী ও শহরতলির মানুষের যাতায়াতে দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশনের নির্দেশনায় চালু করা হয়ে ‘নগর এক্সপেস’। সকল ধরনে সুবিধা থাকবে এই বাস সার্ভিসে- এমনটাই কথা ছিল। বলা হয়েছিলো- নগর এক্সপেসে থাকবে ফ্রি ওয়াই-ফাই, নারীদের জন্য আলাদা বাস, নারী চালক ও সহকারী, শিক্ষার্থীদের জন্য থাকবে স্কুল বাস, থাকবে ই-টিকেটের ব্যবস্থা, নিরাপত্তার জন্য থাকবে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা। কিন্তু এসবের কিছুই বাস্থবায়ন হয়নি।

 

৪১টি বাস নিয়ে ‘নগর এক্সপেস’ সার্ভিস চালুর কথা থাকলেও চালু হয় ২১টি বাস নিয়ে। চাহিদা অনুযায়ী বাস সংখ্যা বাড়ানো হবে জানানো হয়েছিল। কিন্তু বাসের অবস্থা ভালো না থাকায় ২০টি বাস ফিরিয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে রাস্তায় যাত্রী পরিবহন করছে ১২ থেকে ১৫টি বাস। বাকিগুলো বিভিন্ন কারণে বন্ধ রয়েছে।

 

সিসিক সূত্র জানায়, সিলেট মহানগরীর সালুটিকর রোড, বটেশ্বর, মোগলাবাজার ও হেতিমগঞ্জ রোডে বর্তমানে চালু আছে ‘নগর এক্সপেস’। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে- যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না ‘নগর এক্সপেস’ কর্তৃপক্ষ।

 

সেলিম আহমদ নামের এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, সময়মতো বাস পাওয়া যায় না। বাসের অবস্থা খুবই বাজে। বেশিরভাগ সিটের অবস্থা ভালো না। এর মধ্যে প্রতিটি পয়েন্টে বাস দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের সময় নষ্ট করে।

 

রেহেনা আক্তার নামের এক নারী যাত্রী বলেন, বাসের কোনো নিজস্ব স্ট্যান্ড না থাকায় আমাদের অসুবিধায় পড়তে হয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বাসের জন্য  অপেক্ষা করতে হয়। অনকে সময় দেখা যায়- মহিলাদের নির্ধারিত আসনে পুরুষরা বসে আছেন। বলার পরও তারা উঠেন না। এসব বিষয়ে ‘নগর এক্সপেস’ কর্তৃপক্ষ কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করে না।

 

এদিকে, অনেকেই মনে করেন- ‘নগর এক্সপেস’ মানে সিলেট সিটি করপোরেশনের নিজস্ব পরিবহন। কিন্তু সিসিক সূত্র জানিয়েছে, এখানে তাদের কোনো লাভ বা ক্ষতি নেই। নগরবাসীকে সুবিধা দেয়ার জন্য শুধু বাস মালিকদের নির্দেশনা দিয়ে বা সমন্বয় করে থাকে মাত্র। ‘নগর এক্সপেস’ পরিচালনা করে ‘নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালকি গ্রুপ’ নামের সংগঠন। ‘নগর এক্সপেস’ পরিবহনের বাস মালিকদের নিয়ে এ গ্রুপ গঠিত।

 

এ ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) পরিবহন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আলী আকবর সিলেটভিউ-কে জানান, ‘নগর এক্সপেস’ পরিসেবাটি সিটি করপোরেশনের নয়। মহানগরবাসীকে একটি ভোগান্তিবিহীন পরিবহনসেবা প্রদানের লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন একটি বাস মালিক গ্রুপের সঙ্গে সমন্বয় করে ‘নগর এক্সপেস’ সার্ভিস চালু করেছে। এই ‘নগর এক্সপেস’ গাড়ি বা বাসগুলো ক্রয়-বিক্রয় কিংবা লাভ-লোকসানের সঙ্গে সিসিক জড়িত নয়। সিসিক শুধু রোড ম্যাপ করে দিয়েছে এবং সমন্বয় করে থাকে।

 

‘নগর এক্সপেস’ সার্ভিসে যাত্রীদের ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন- যাত্রীদের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেটি ‘নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালকি গ্রুপ’র শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে জানালে আশা করি সুরাহা হবে।

 

এসব বিষয়ে ‘নগর এক্সপ্রেস সিটি বাস মালকি গ্রুপ’র আহ্বায়ক, সিসিকের ৯ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মখলিছুর রহমান কামরান বলেন- টোটাল ৪১টি বাস নিয়ে আসা হয়েছিলো। তবে বাসের কন্ডিশন ভালো না থাকায় মালিকপক্ষের পছন্দ হয়নি, তাই প্রায় অর্ধেক ফেরত দেয়া হয়েছে।

 

তিনি বলেন- নগর এক্সপ্রেসের কয়েকটি বাসে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছিলো, কিন্তু ভালো আউটপুট না পাওয়ায় বাকিগুলোতে আর লাগানো হয়নি।

 

এক প্রশ্নের জবাবে মখলিছুর রহমান বলেন- নারী বাসচালক ও সহকারী দিয়ে বাস চালানো হয়েছিলো। নারীচালকদের বাসে বিভিন্ন কারণে নারী যাত্রীরা উঠেন না। সে কারণে ওই সর্ভিসটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তবে প্রতিটি গাড়ির আসনে মহিলাদের জন্য আলাদা আসন আছে।  

 

বাস সার্ভিসের মান ও ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, একটু বিশৃঙ্খলা রয়েছে এটা ঠিক। তবে এই সার্ভিসটি এতদিন যে টিকে আছে এটাই অনেক।  

 

কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সে বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি।  

 

স্ট্যান্ড না থাকার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়- বিষয়টি স্বীকার করে মখলিছুর রহমান জানান, মেয়র মহোদয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। দ্রুতই স্ট্যান্ড এর ব্যবস্থা করা হবে।

 

এটি একটি লস প্রোজেক্ট জানিয়ে মখলিছুর রহমান বলেন- যে উৎসাহ এবং প্রত্যাশা নিয়ে মালিকপক্ষ ‘নগর এক্সপেস’ চালু করেছিলেন, ভালো ব্যবসা না হওয়ায় মালিকরা এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

 

উল্লেখ্য, ‘নগর এক্সপেস’ চালুর সময় সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, বাসগুলো নিটল টাটা কোম্পানির কাছ থেকে নির্ধারিত মূল্যের বিনিময়ে কিনে আনা হচ্ছে। সকল কিছুর তত্ত্বাবধান করবে সিলেট সিটি কর্পোরেশন। বাসগুলো মেরামতসহ রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করবে নিটল টাটা কর্তৃপক্ষ। সিসি ক্যামেরা, ওয়াইফাইসহ সবরকম সুবিধা ভোগ করে নারীরা যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে এজন্য নারীদের জন্য আলাদাভাবে বিশেষ বাসের ব্যবস্থা করা হবে।

 

কিন্তু মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর এমন ‘প্রতিশ্রুতি’ আড়াই বছরে আলোর মুখ দেখেনি।

 


সিলেটভিউ২৪ডটকম/নাজাত/ডালিম/মুন্না