সিলেটে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি আক্রমণ। নির্বাচন সামনে রেখে দল গোছানোয় মনোযোগী আওয়ামী লীগ। নতুন নেতৃত্বে প্রাণ ফিরেছে বিএনপিতে। নেতারা রাজপথে নামায় উজ্জীবিত দলটির কর্মীরাও। তবে জাতীয় পার্টি পথ চলছে দিশাহারাভাবে।

আওয়ামী লীগ :
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার সবকটি আসনে জয় চায় সিলেট আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে তৃণমূলে দল আরও সুসংগঠিত করায় মনোযোগী দলটির নেতারা বলে মন্তব্য করেছেন জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান চৌধুরী।


২০২১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্বে সিনিয়র সহসভাপতি শফিকুর রহমান চৌধুরী। এরপর সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খানকে সঙ্গে নিয়ে জোরেশোরে দল গোছানোর কাজ শুরু করেন তিনি। শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, এখন ওয়ার্ড কমিটি গঠনের কাজ চলছে। এক্ষেত্রে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিতদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি গঠনের ক্ষেত্রেও একই ধারা বজায় থাকবে।

তিনি বলেন, নেতা-কর্মীদের শুধু কেন্দ্রীয় কিংবা দিবসকেন্দ্রিক কর্মসূচি পালনে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না; সরকারের উন্নয়ন বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে লাগানো হচ্ছে। তিনি বলেন, দুই দফা বন্যায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ঘরে বসে থাকেননি। তারা যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগ ত্রাণ কার্যক্রম মনিটরিং করেছে। এতে ব্যক্তি উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতা বেড়েছে। শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, মানুষের প্রত্যাশার বেশি উন্নয়ন হচ্ছে। উন্নয়নের স্বার্থে মানুষ শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখেছে, আগামীতেও রাখবে। সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বর্তমানে পাঁচটিতে আওয়ামী লীগ ও একটিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক গণফোরামের সংসদ সদস্য রয়েছেন। সিলেট-২ আসনটি মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী পরাজিত হন গণফোরামের মোকাব্বির খানের কাছে। আগামী নির্বাচনে দলীয় নেতা-কর্মীরা সব আসনে নৌকার প্রার্থী চান বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের মধ্যে বিভেদ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি থাকলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব ফেলবে না। সবার কাছে সিগন্যাল গেছে, আওয়ামী লীগ করতে হলে শেখ হাসিনার নির্দেশ মতো চলতে হবে। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বিএনপি রাজপথে নৈরাজ্য করলে আওয়ামী লীগ মাঠেই তার মোকাবিলা করবে।

বিএনপি :
বিএনপির প্রধান টার্গেট দলনিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন আদায়। দলীয় ঐক্যের শক্তিতে রাজপথে এখন নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত। সিলেট থেকে সরকার পতনের চূড়ান্ত বাঁশি বাজাতে চায় বিএনপি নেতা-কর্মীরা। সিলেটে দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ড সম্পর্কে এমন মন্তব্য করলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল। দলের ভিতরও এর চর্চা রয়েছে। গেল সম্মেলনে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে জেলার শীর্ষ নেতৃত্ব বাছাই করা হয়েছিল। একইভাবে এখন ওয়ার্ড, উপজেলা কমিটি গঠন করা হচ্ছে। জেলার ১৩টি উপজেলা ও পাঁচটি পৌরসভায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাই করা হয়েছে।  তিনি বলেন, ভয়াবহ বন্যায় কেন্দ্রের নির্দেশে বিএনপি নেতা-কর্মীরা বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষের আরও বেশি মন জয় করতে পেরেছে দলটির নেতা-কর্মীরা।

কাইয়ূম চৌধুরী বলেন, জেলায় নতুন নেতৃত্ব আসায় দলের নেতা-কর্মীদের প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। একইভাবে দলের সাংগঠনিক ভিত শক্তিশালী হয়েছে। যে কোনো সময়ের চেয়ে সিলেটে বিএনপি এখন শক্তিশালী।

তিনি বলেন, পুলিশি বাধা, হয়রানি, মামলা, নির্যাতন উপেক্ষা করে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা এখন রাজপথমুখী। দলে এখন কোনো বিভক্তি নেই। সবাই যার যার অবস্থান থেকে দলের জন্য কাজ করছেন। দলের মধ্যে ঐক্য আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই ঐক্যই সিলেট বিএনপির বড় শক্তি। এই ঐক্যের শক্তিতে রাজপথে নেতা-কর্মীরা উজ্জীবিত।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। মানুষ তাদের ভোটাধিকার ফেরত চায়। জনগণের ভোটাধিকার আদায়ের দাবিতে সারা দেশের মতো সিলেটেও বিএনপি রাজপথে আছে। বাধাবিপত্তি কিংবা জুলুম-নির্যাতনে নেতা-কর্মীরা মাঠ ছাড়বে না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি করছে না। লোডশেডিংয়ের নামে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে দেশকে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে সরকার এতদিন যে লুটপাট করেছে তা প্রমাণিত হয়ে গেছে। জ্বালানি সংকটে পাম্প বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে এখন আর নিত্যপণ্য নেই। সাধারণ মানুষকে বিষয়গুলো বোঝানো হচ্ছে। তাই তারা বিএনপির আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করছে। আগামীতে নিশ্চয় তারাও মাঠে নামবে।

জাতীয় পার্টি :
সিলেট জাতীয় পার্টির দ্বিতীয় দুর্গ ছিল। এখানের মানুষ এখনো এরশাদকে ভালোবাসেন। জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করেন। কিন্তু অতীতের সাংগঠনিক বিভিন্ন ভুল সিদ্ধান্ত, নেতৃত্বের দুর্বলতায় দল সুসংগঠিত করা যায়নি। আবারও তৃণমূলে জোয়ার উঠবে। ফিনিক্স পাখির মতো সিলেটে জাতীয় পার্টি জেগে উঠবে এমন আশা ব্যক্ত করেছেন দলটির জেলা শাখার সদস্য সচিব সাইফুদ্দিন খালেদ।

তার মতে, দীর্ঘদিন দল ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতা-কর্মীরা রাজনীতিতে আগ্রহ হারিয়েছেন। একসময় সিলেটের প্রবীণ ব্যক্তিরা জাতীয় পার্টির কর্ণধার ছিলেন। তাদের মৃত্যুর পর নতুন প্রজন্মকে সেভাবে দলে টানা যায়নি। এতে নেতৃত্ব সংকট তৈরি হয়। যা দিন দিন প্রকট হয়ে দাঁড়ায়।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এরশাদ কারান্তরীণ অবস্থায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগে বাজিমাত করে জাতীয় পার্টি। কারাবন্দি এরশাদ সিলেটের মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলেন। এরপর ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে সাংগঠনিক অবস্থা। তিনি বলেন, সিলেটের মানুষ এরশাদকে স্বজনদের মতো ভালোবাসেন। এরশাদও সিলেটকে তার দ্বিতীয় বাড়ি বলতেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাংগঠনিক দিক দিয়ে অন্য বড় দলগুলো থেকে জাতীয় পার্টি কিছুটা পিছিয়ে। তবে এখনো সমর্থক কমেনি। দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব পেলে আবারও জাতীয় পার্টি জেগে উঠবে। সব উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী নভেম্বর মাসে জেলা সম্মেলন হবে। এর মাধ্যমেই সিলেট জেলাজুড়ে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীদের মাঝে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ফিরবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেউ কেউ দলীয় মনোনয়ন নিয়ে শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকেননি। এদের কেউ ভয়ে আবার কেউ লোভে পড়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এখন অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, কোনো জোটের শরিক হয়ে নির্বাচনে গেলেও সিলেটের বেশির ভাগ আসন জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। সিলেট-৩, ৪, ৫ ও ৬ সংসদীয় আসনে জাতীয় পার্টির শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে। এসব আসনে দলীয় প্রার্থী দেওয়া ও জয় নিশ্চিতে কাজ চলছে।

সিলেটভিউ২৪ডটকম/শাদিআচৌ /ডালিম