আগামী ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন। এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রতিদিনই ভিড় করছেন নেতাকর্মীরা। সেখানে চলে ব্যক্তি বিশেষ তথা নিজেদের পছন্দের নেত্রীর নামে স্লোগান ও পাল্টাপাল্টি স্লোগান। দলের সভানেত্রীর কার্যালয়ে এমন স্লোগানকাণ্ডে বিব্রত ও ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, প্রতিদিনই বিকালে থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভেতরে ব্যক্তির নামে পাল্টাপাল্টি স্লোগানে দেন মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীরা। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নামে স্লোগান না দিয়ে, বিশেষ কোনো ব্যক্তির নামে স্লোগান দিচ্ছেন তারা, যা অনুচিত। এমন ঘটনা ভালোভাবে নিচ্ছেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। দলের সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এভাবে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির করায় আওয়ামী লীগ নেতারা রীতিমতো বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, সম্মেলনকে কেন্দ্র করে বিকাল থেকেই ধানমণ্ডি আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের ঢল নামে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে আওযামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও আসতে থাকেন। এ সময়ই বিশেষ ব্যক্তির নামে স্লোগানে দেওয়া হয়, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, মাহমুদা আপা- মাহমুদা আপা, মহিলা আওয়ামী লীগে মাহমুদা আপাকে সভাপতিম হিসেবে দেখতে চাই ইত্যাদি। মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদার নামে এভাবেই চলে স্লোগান।
এদিকে বিকালের পরেই কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে পার্টি অফিসে আসতে দেখা যায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজ্জামেল হক, এস এম কামাল হোসেন, মির্জা আজম, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিল্পব বড়ুয়াসহ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাকর্মীদের। আওয়ামী লীগের নেতারা আসার সঙ্গে সঙ্গে সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভিড় করে স্লোগান দিতে থাকেন। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আসার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগানে সেøাগানে মুখরিত হয়ে ওঠে সভানেত্রীর কার্যালয়।
খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচী কোনো এক সময় জাসদ দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এখন মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রী বনে গেছেন। আর তাকেই সম্মেলনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মাহমুদার অনুসারী। এই নিয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে।
স্লোগানকাণ্ড ছাড়াও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতিকে নিয়ে আরও অভিযোগ রয়েছে।
নেতাকর্মীরা বলছেন, সম্মেলন প্রস্তুত করার জন্য মহিলা আওয়ামী লীগের যে উপকমিটি গঠন করা হয়েছে সেখানেও বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের তেমন প্রধান্য দেওয়া হয়নি উপকমিটিতে। হাতেগোণা দুই-একজনকে রাখলেও তারা সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগমের অনুসারী।
সম্মেলন উপলক্ষে গঠিত উপকমিটিগুলো হলো-দপ্তর উপকমিটির, মঞ্চ উপকমিটি, গঠনতন্ত্র উপকমিটির, প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটি, অর্থ উপকমিটি।
মহিলা আওয়ামী লীগের নেত্রীদের অভিযোগ, সম্মেলন উপলক্ষে সবার কাছে থেকে টাকা (চাঁদা) নিচ্ছেন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তাদের প্রশ্ন- আওয়ামী লীগের পক্ষে সম্মেলন করার জন্য সাত লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে তারপরও কোনো সবার থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। সম্মেলন উপলক্ষে জেলা ও উপজেলার নেতাকর্মীদের থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে।
শুধু তাই নয়, সম্মেলনকে সামনে রেখে বিভিন্ন জেলা উপজেলায় কমিটি দিচ্ছে মহিলা আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতারা বলেছেন, সম্মেলনকে সামনে রেখে সংগঠনগুলোর কমিটি ঘোষণা করা তাদের কাজ নয়। তাদেরকে সম্মেলন নিয়ে ভাবতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কথার কোনো তোয়াক্কা না করে সন্মেলনকে সামনে রেখে নতুন করে কমিটি দিয়ে সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বির্তকের জন্ম দিয়েছেন।
মহিলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অর্থ উপকমিটির আহবায়ক নাসিমা ফেরদৌস বলেন, সম্মেলন করার জন্য অর্থ উপকমিটি করা হয়েছে। মহিলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সম্মেলন উপলক্ষে যারা টাকা দেন আমি তাদের নাম লিস্ট করে রাখি। সহ-সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকরা ১০ হাজার করে টাকা দেবে সম্মেলন উপলক্ষে। যারা সদস্য তাদের অর্ধেক। তবে কাউকে টাকা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে না।
জেলা ও উপজেলা মহিলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের থেকে টাকা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বলতে পারবে।
এ বিষয়ে মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা বেগম কৃক বলেন, সম্মেলন উপলক্ষে ১০ হাজার করে টাকা নেওয়া হচ্ছে এমনকি কেউ তো ৫০ হাজার টাকাও দিয়েছে। সংগঠন করতে হলে তো একটা চাঁদা দিতে হবে। সদস্যরা চাঁদা না দিলে সংগঠন চলবে কীভাবে। আমরা বাইরে গিয়ে চাঁদাবাজি করব নাকি? তবে জেলা ও উপজেলার নেতাকর্মীদের কাছে টাকা নেওয়া হয়নি। তাদেরকে বলা হয়েছে তারাও যেন সদস্যের কাছে থেকে টাকা তুলে একটা ফান্ড করে।
সম্মেলনকে সামনে রেখে কমিটির দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সম্মেলনের আগে কোনো কমিটি দেওয়া হয়নি। যা কমিটি দেয়া হয়েছে সেটা অক্টোবরে।
আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ের ভেতরে এখন প্রায় প্রতিদিনই আপনার নামে স্লোগান দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তি বিশেষের নামে স্লোগান দেওয়া কতটা সমুচিত- এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমার নামে নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতেই পারে। আমার নামে কেনো অনেকের নামেই স্লোগান দেয়। আমার নেতাকর্মী একটু বেশি তো, তাই আমার নামে নেতাকর্মী একটু বেশি বলে।
সংগঠনের সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক রোকেয়া প্রাচীকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দপ্তর সম্পাদককে কেন ঘোষণাপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ডেস্ক/ইআ-১০
সূত্র : ঢাকা টাইমস




