সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার যুবক মো. বাচ্চু মিয়া। ২০২১ সালের শুরুতে সদ্য বিয়ে করা স্ত্রীকে বাড়িতে রেখে জীবন-জীবিকার তাগিদে পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। কিন্তু প্রবাসে যাওয়ার পরই বাড়িতে রেখে যাওয়া নববধূর সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদের সমস্যার সৃষ্টি হয়। বাচ্চু মিয়া বিষয়টি পারিবারিকভাবে সমাধান করতে চাইলেও হয়নি।

এভাবে কেটে যায় দেড় বছর। এ দীর্ঘ সময়ে সমাধান তো হয়-ই-নি, বরং সমস্যা বেড়েছে। এ অবস্থায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে সিলেট জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ চালু হওয়ার খবর পান বাচ্চু। পারিবারিক সমস্যা হওয়ায় প্রথমে দ্বিধা হলেও অনেক ভেবে-চিন্তে অবশেষে গত বছরের ২৭ অক্টোবর সেই ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’র নাম্বারে কল দিয়ে তিনি বিস্তারিত খুলে বলেন।


বাচ্চু সমস্যা জানানোর এক সপ্তাহের মধ্যে তার বাবা ও ভাইসহ পরিবারের সদস্যদের কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে এসে সমস্যাটি সমাধানের উদ্যোগ নেন সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। এর কিছুদিনের মধ্যেই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় বিষয়টি পুরোপুরি সমাধান করে দেওয়া হয়।

শুধু গোলাপগঞ্জের বাচ্চু মিয়াই নন, সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলার যুক্তরাজ্য প্রবাসী সৈয়দ হাবিবুর রহমান এবং একই উপজেলার সৌদি আরব প্রবাসী আব্দুল হাই জাকির জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ নাম্বারে এভাবে প্রবাস থেকে কল দিয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধান করিয়েছেন। এই তিন প্রবাসীর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানান- সিলেট জেলা পুলিশ সুপারের এই যুগান্তকারী উদ্যোগে তাদের জীবনের বড় একেকটি সমস্যা সমাধান হয়েছে। ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ চালু না করলে হয়তো এ সমস্যা কখনও সমাধান হতো না। 

গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রবাসী ও বিদেশে গমনেচ্ছুদের জন্য ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ ও ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস ফর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ নামে দুটি হেল্প ডেস্ক চালু করে সিলেট জেলা পুলিশ। উদ্যোগটি নেন নবাগত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন। চালুর পর থেকে ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’-এ দুই শিফটে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রবাসীদের কল রিসিভের মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হচ্ছে। 

জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় সূত্র জানায়, এ হেল্প ডেস্কে একজন ইন্সপেক্টর, একজন এস.আই, দুইজন পুরুষ কনস্টেবল ও চারজন নারী কনস্টেবল নিয়োজিত। এর মধ্যে শিফট ভাগ করে তারা ডিউটি দায়িত্ব পালন করেন। তবে হট লাইনে যারা প্রবাসীদের কল রিসিভ করেন তারা সবাই সিলেটি। নারী প্রবাসীদের অভিযোগ বা সমস্যার কথা শুনতে রয়েছে নারী পুলিশ সদস্য।

সূত্র জানায়, গত বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ চালু হওয়ার পর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ২৪২টি কল আসে। এর মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া ও ২৮টি পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ পাওয়া যায়। এই ২৮টি অভিযোগের মধ্য থেকে ১৪টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং বাকি ১৪টি তদন্তাধীন।

মাসভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’-এ সেপ্টেম্বর মাসে কল আসে ১৪২টি, এর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ পাওয়া যায় ১৭টি। অক্টোবরে কল আসে ৩৮টি, পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ মিলে ৩টি। নভেম্বরে কল আসে ৪০টি, পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ মিলে ৪টি। আর ডিসেম্বরে কল আসে ২২টি, পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ মিলে ৪টি। বেশিরভাগ কল আসে যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, কাতার, দুবাই ও কুয়েত প্রবাসীদের কাছ থেকে। অভিযোগগুলোর মধ্যে বেশি রয়েছে জায়গ-জামি ও টাকা লেনদেন সংক্রান্ত সমস্যা।

‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’র ইনচার্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু সুফিয়ান সিলেটভিউ-কে বলেন- প্রবাসীর কল করে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগ বা সমস্যা জানানোর পরই যথাযথ গুরুত্বসহকারে বিষয়টির তদন্ত শুরু করা হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজনে স্থানীয় থানাপুলিশ ও জনপ্রতিনিধির সহযোগিতা নেওয়া হয়।

তিনি জানান- ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’র সেবা নেওয়ার জন্য বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালানো হয়। ফেসবুক পেইজ, জেলা পুলিশের মাসিক কল্যাণ সভাসহ বিভিন্ন আয়োজন এবং জেলার সকল থানার মাধ্যমে চালানো হয় প্রচারণা।

সিলেট জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) শাহরিয়ার বিন সালেহ সিলেটভিউ-কে জানান, প্রবাসীদের অনেকেই দেশে থাকা জায়গা-সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা পড়েন। বাসা-বাড়ি ও জায়গা দখল হয়ে যাওয়াসহ নানারকম সমস্যায় তারা পড়ে থাকেন। অনেক প্রবাসী বিদেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে দেশে সম্পদ ক্রয় করেন। কিন্তু দেশে ফিরে তা পান না। আর্থিক লেনদেন নিয়েও অনেক প্রবাসী সমস্যায় পড়েন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যদের সাথে এরকম ঝামেলা হয়ে থাকে। কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে অনেক সময় প্রবাসীরা বুঝতে পারেন না তারা কোথায় কিভাবে সহায়তা পেতে পারেন। তাই প্রবাসীদের আইনী সহায়তা দিতে বর্তমান পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন দায়িত্ব নিয়েই ‘হেল্প ডেস্ক’ চালু করেন। প্রবাসীদের জন্য একটি হটলাইন খুলেন। ২৪ ঘন্টা এই হটলাইন চালু থাকে। এই হটলাইনের মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়।’

শাহরিয়ার বিন সালেহ আরও জানান, প্রবাসীদের সমস্যা যে থানার অন্তুর্ভুক্ত সেই থানার ওসিকে দ্রুত সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া হয়। উপকার পাওয়ায় দিন দিন এই সেবা কার্যক্রম প্রবাসীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। তাই সেবাগ্রহিতার সংখ্যাও বাড়ছে। 

প্রসঙ্গত, সিলেটে আসার আগে আব্দুল্লাহ আল মামুন ফেনী জেলা পুলিশ সুপার ছিলেন। সেখানে তিনি প্রথম ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ চালু করেন। এতে প্রবাসীদের প্রশংসা কুড়ান তিনি। প্রবাসী অধ্যুসিত জেলা সিলেটে এসেই তিনি এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং কিছুদিনের মধ্যে (১৫ সেপ্টেম্বর) প্রবাসী ও বিদেশে গমনেচ্ছুদের জন্য ‘প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক হটলাইন’ ও ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস ফর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ নামে সিলেট জেলা পুলিশে দুটি হেল্প ডেস্ক চালু করেন। হটলাইন নাম্বারটি হচ্ছে- ০১৩২০ ১১৭৯৭৯। হটলাইন চালুর সময় আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন- প্রবাসীরা দেশে এসে কোনো সমস্যায় পড়লে বা বিদেশ থেকেই কোনো সমস্যা সমাধানের বিষয়ে পুলিশকে অবগত করতে সিলেট জেলা পুলিশে এ সেবা চালু করা হয়েছে। এই হটলাইনে রাত-দিন, সপ্তাহের ৭দিনই যোগাযোগ করে সেবা নিতে পারবেন। নারীদের জন্য ডেস্কে আলাদা নারী অপারেটর থাকবে। তিনি আরও বলেন- বিদেশে পড়তে যাওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী বা অনেক গমনেচ্ছুদের জন্য ‘পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট’ লাগে। এ বিষয়ে অনেকে অনেক কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করেন, এমনকি হয়রানিরও শিকার হন। তবে এবার থেকে জেলা পুলিশের ‘ওয়ানস্টপ সার্ভিস ফর পুলিশ ক্লিয়ারেন্স’ সেবার মাধ্যমে এ ভোগান্তি থেকে লোকজন রেহাই পাবেন।


সিলেটভিউ২৪ডটকম / ডালিম