তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিপিএলের সফলতম দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। এবার মাঠে নামবে তারা নিজেদের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করতে। সিলেটের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি আগে কখনও ফাইনাল খেলতেই পারেনি। নতুন মালিকানায় নতুন নামে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজির স্বপ্নযাত্রা প্রথমবারেই পৌঁছে গেছে ফাইনালে।
কুমিল্লার চতুর্থ নাকি সিলেটের প্রথম, সেই ফয়সালা হবে আজ বৃহস্পতিবার। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে খেলা শুরু সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়।
বাংলাদেশে মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয়েছে বেশি দিন হয়নি। স্বপ্নের সেই মেট্রোরেলে কাল ট্রফি নিয়ে ফটোসেশন করলেন বিপিএলের দুই ফাইনালিস্ট কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস অধিনায়ক ইমরুল কায়েস ও সিলেট স্ট্রাইকার্সের প্রতিনিধি মুশফিকুর রহিম। বিপিএলের সঙ্গে বিতর্ক যেভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে থাকে, ফটোসেশনের এই ব্যতিক্রম উদ্যোগ নেওয়ায় বিসিবি একটা ধন্যবাদ পেতেই পারে।
শুধু মেট্রোরেলে ফটোসেশন নয়, গতানুগতিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে আসার বিসিবির এই চেষ্টা অন্তত এবার বিপিএলেজুড়েই দেখা গেছে। ডিআরএস ম্যানেজ করতে না পারা, বিকল্প এডিআরএস নিয়ে সংশয়, মাঠেই আম্পায়ারের ওপর ক্রিকেটারদের মেজাজ হারানো—এসব তো ছিলই। তবে এও বলা যায়, খেলার মানে এবারের বিপিএল অতীতের চেয়ে এগিয়ে থাকবে ঢের। তিন ভেন্যুতেই ভালো উইকেটে খেলা হয়েছে। নানা ঘটনায় আলোচিত বিপিএলের নবম সংস্করণ আজ শেষ হচ্ছে কুমিল্লা-সিলেট ফাইনাল দিয়ে।
আয়োজনগত অনেক সমালোচনা থাকলেও বিপিএলে এবার মাঠের ক্রিকেট ভালো হয়েছে বলে টুর্নামেন্ট জুড়েই মাঠে দর্শক ছিল আগের কয়েকটি আসরের তুলনায় ঢের বেশি। ফাইনালের আগে জেমস, মাকসুদ ও ঢাকা ওয়ারফেইজের মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের কনসার্টও হবে ‘হোম অব ক্রিকেট-এ। গান আর ক্রিকেটের এমন ধুন্ধুমার আয়োজন, উপচে পড়া ভীড় থাকার কথা গ্যালারিতে। ফাইনালের আগের দিন স্টেডিয়ামের চারপাশে দেখা গেছে টিকেট না পেয়ে হাহাকার।
দুই দলই ধারাবাহিক ভালো খেলে ফাইনালে উঠেছে। তবে ‘ফাইনালে’র সঙ্গে দুই দলের পরিচয় দুই রকম। কুমিল্লা টুর্নামেন্টের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন। সব মিলিয়ে তিনবার বিপিএলে শিরোপা জেতার অভিজ্ঞতা আছে কুমিল্লার। এর দুটি আবার বর্তমান অধিনায়ক ইমরুল কায়েসের অধীনে। আরেকটি আজ ফাইনালে ইমরুলের প্রতিপক্ষ অধিনায়ক মাশরাফির নেতৃত্বে। সেখানে এবারই প্রথম বিপিএলের ফাইনালে উঠেছে সিলেট। ফাইনালে সঙ্গে সিলেটের পরিচয় নতুন হলেও এই দলের একজন অবশ্য ব্যতিক্রম—মাশরাফি। বিপিএলের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল খেলার রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন মাশরাফি।
বিপিএলে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার ফাইনাল খেলেছেন সাকিব। ফরচুন বরিশাল অধিনায়ক এবার শেষ চার থেকেই বিদায় নিয়েছেন। সিলেট অধিনায়ক মাশরাফির এটি পঞ্চম ফাইনাল। আগের চারবারের ফাইনাল থেকে মলিন মুখে ফিরতে হয়নি তাঁকে। এবারও সেটা না চাওয়ার কোনো কারণ নেই।
কুমিল্লার সাফল্যের শুরুটা ছিল ২০১৫ আসরে মাশরাফির নেতৃত্বেই। পরে ২০১৯ সালে ও গত আসর জিতেছে তারা ইমরুল কায়েসের নেতৃত্বে। মাশরাফি অধিনায়ক হিসেবে কুমিল্লার আগে দুটি ট্রফি জিতেছেন ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটর্সের হয়ে, পরে আরেকটি জিতেছেন রংপুর রাইডার্সের হয়ে। কুমিল্লা অথবা মাশরাফি, ফাইনালে অপরাজেয় পথচলা এবার কারও থামবেই।
কাগজ-কলমের শক্তিতে কুমিল্লা এগিয়ে অনেকটাই। বিশেষ করে বিদেশি ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে দুই দলের তুলনাই চলে না। সুনিল নারাইন, আন্দ্রে রাসেলের মতো টি-টোয়েন্টির কিংবদন্তি কুমিল্লার বড় শক্তি। মইন আলি, জনসন চার্লসরাও একাই গড়ে দিতে পারেন ম্যাচের ভাগ্য। তাদের সঙ্গে লিটন কুমার দাস, মুস্তাফিজুর রহমানের মতো দেশের তারকারা তো আছেনই। এমনকি উঠতি তানভির ইসলাম, জাকের আলিরাও দারুণ পারফর্ম করছেন।
সিলেট সেখানে পুরোপুরিই নির্ভর করছে দেশের ক্রিকেটারদের ওপর। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ রান স্কোরার তাদের দলের নাজমুল হোসেন শান্ত, তালিকার তিনে এই দলেরই তৌহিদ হৃদয়। খুব ভালো না হলেও অবদান রেখেছেন জাকির হাসান, মুশফিকুর রহিমরা। বোলিংয়ে অভিজ্ঞ রুবেল হোসেন, তরুণ তানজিম হাসান সাকিব, রেজাউর রহমানরা মেরে ধরেছেন নিজেদের।
লিগ পর্বে অবশ্য মোহাম্মদ আমির ও ইমাদ ওয়াসিমের বড় ভূমিকা ছিল সিলেটের সাফল্যে। তারা বিদায় নেওয়ার পর বোলিং আক্রমণের ধার গেছে কমে। তারপরও দারুণ খেলে তারা রংপুরকে বিদায় করে পৌঁছে গেছে ফাইনালে।
ফাইনালের আগের দিন কাল সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লা অধিনায়ক ইমরুলের কণ্ঠে সিলেটকে নিয়ে সমীহ থাকলেও সম্ভাবনায় নিজেদের এগিয়ে রাখার ব্যাপারটিও স্পষ্ট করেই বললেন তিনি, “যে দলকে আমরা দুইবার ১২০ রানে আলআউট করেছি। প্রথম ম্যাচেও আমাদের ১৪০ রান তাড়ায় ওদের ৬ উইকেট পড়েছিল এবং প্রায় ১৮ ওভার লেগেছিল জিততে। তার মানে, আমাদের বোলিং আক্রমণের ওই শক্তি আছে। কালকে ভিন্ন কিছু্ও হতে পারে। তবে অধিনায়ক হিসেবে তো আমার চাওয়া থাকে, একটা দলকে যখন আমি দুইবার কম রানে অলআউট করি, তখন তো সেই আত্মবিশ্বাস আমার থাকে।”
“তারা যেভাবে গোটা টুর্নামেন্ট খেলেছে এবং ফাইনালে এসেছে, কৃতিত্ব তাদেরকে দিতেই হবে। তারা খুব ভালো ক্রিকেট খেলেছে। বিশেষ করে তাদের কিছু লোকাল ক্রিকেটার আছে, যারা ভালো খেলছে। তবে আমরা তাদেরকে দুটি ম্যাচে হারিয়েছি। তারা শক্তিশালী দল। আমাদেরকে ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে, তাহলে সম্ভব।”
সিলেটের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসা নাজমুল হোসেন শান্ত প্রতিপক্ষের শক্তির কথা না ভেবে বললেন নিজেদের পরিকল্পনায় অটল থাকার কথা, “যে দুই দল ফাইনালে উঠেছে, ভালো খেলেছ বলেই ফাইনালে উঠেছে। আমরা কাদের বিপক্ষে খেলছি, এটা বেশি জরুরি নয়। আমার কাছে বেশি জরুরি কালকের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়ন করব। অবশ্যই তারা ভালো দল। তবে নির্দিষ্ট দিনে যারা ভালো করবে, তারাই ম্যাচ জিতবে। কার বিপক্ষে খেলছি, বিদেশি ক্রিকেটার কী রকম, এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নই আমরা।”
তবে আনুষ্ঠানিক এসব কথার বাইরে, ক্রিকেটে নিজেদের পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেই নামতে হয় মাঠে। কুমিল্লার কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন যেমন মাস্টার ট্যাকটিশিয়ান, তেমনি কৌশলের লড়াইয়ে সিলেট অধিনায়ক মাশরাফির জুড়ি মেলা ভার।
লড়াইটা তাই কৌশলের, লড়াইটা ক্রিকেটীয় সামর্থ্যের, আর ফাইনাল যেহেতু, লড়াইটা অবশ্যই স্নায়ুচাপের। ম্যাচের ভেতর এই ছোট ছোট লড়াইয়ে এগিয়ে রাখবে যারা নিজেদের, ফাল্গুনের রাতে সাফল্যের রঙে রঙিন হবে হয়তো তারাই।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/আরআই-কে




