বর্তমানে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ক্ষমতার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে।এক সময় যে ছাত্ররাজনীতি ছিল স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চালিকাশক্তি,এখন তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সহিংসতা,দখলদারিত্ব,ক্ষমতার লড়াই ও দলীয় বলপ্রয়োগের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।ফলে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্বের সুশৃঙ্খল চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।
কল্যাণমুখী রাজনীতির পরিবেশ ও শান্তিপূর্ণ ক্যাম্পাস তৈরির জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ,দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ যেখানে সব শিক্ষার্থীর মতপ্রকাশ,অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্বের সমান সুযোগ থাকবে।এই প্রেক্ষাপটে একটি আইন করা জরুরি যেমন আইনের নাম হবে “কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব আইন”।
বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির সংস্কার ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ার জন্য “কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব আইন” এর ধারা গুলো হতে পারে যেমন:
ধারা ১: সংজ্ঞা
১. ছাত্রসংসদ: সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা।
১.(ক) জাতীয় ছাত্রনির্বাচন কমিশন (NSEC): দেশের সকল সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত স্বাধীন, নিরপেক্ষ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ।
১.(খ) বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচন কমিশন (IEC): সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে গঠিত স্থানীয় নির্বাচন কমিশন, যা NSEC-এর অধীনে কাজ করবে।
১.(গ) প্রার্থী: বৈধভাবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া সক্রিয় শিক্ষার্থী।
১.(ঘ) রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠন: নিবন্ধিত জাতীয় রাজনৈতিক দলের অনুমোদিত ছাত্রসংগঠন।
১.(ঙ)স্বতন্ত্র প্রার্থী: রাজনৈতিক দলের বাইরের যে শিক্ষার্থী নিজ নামে নির্বাচন করে।
ধারা ২: ছাত্রসংসদের কাঠামো
২.প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি মাত্র ছাত্রসংসদ থাকবে, যা সকল শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব করবে।
২.(খ) সদস্য সংখ্যা হবে প্রতি ৫০০ শিক্ষার্থীর জন্য ১ জন প্রতিনিধি, তবে কলেজে ন্যূনতম ৭ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম ১০ জন।
২.(গ)কার্যনির্বাহী কমিটিতে থাকবে— সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ও অন্যান্য সম্পাদক (যেমন: সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সম্পাদক)।
২.(ঘ)প্রতি ১০ জন প্রতিনিধির মধ্যে অন্তত ১ জন নারী প্রতিনিধি নিশ্চিত করতে হবে।
ধারা ৩: জাতীয় ছাত্রনির্বাচন কমিশন (NSEC)
৩. কমিশনের সদস্যসংখ্যা হবে ৭ জন।
৩.(ক) চেয়ারম্যান হবেন একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বা প্রশাসনিক দক্ষতা সম্পন্ন নিরপেক্ষ ব্যক্তি।
৩.(খ) অন্যান্য ৬ সদস্য থাকবেন নির্বাচন,শিক্ষা বা প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন অরাজনৈতিক পেশাজীবীদের মধ্যে থেকে।
৩.(গ) কমিশনের মেয়াদ ৩ বছর।
৩.(ঘ)কোনো ছাত্র বা রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধি কমিশনে রাখা যাবে না।
৩.(ঙ) কমিশনই হবে ছাত্রসংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত সকল নীতিমালা ও শৃঙ্খলা বাস্তবায়নের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ।
ধারা ৪: নির্বাচন পদ্ধতি
৪.ছাত্রসংসদ নির্বাচন প্রতিবছর জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে।
৪.(ক)ভোটাধিকার থাকবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবর্ষে ভর্তি সক্রিয় শিক্ষার্থীদের।
৪.(খ) ভোট হবে গোপন ব্যালটে।
৪.(গ) IEC স্থানীয়ভাবে নির্বাচন পরিচালনা করবে এবং NSEC পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানে থাকবে।
৪.(ঘ)ব্যয়ের সীমা সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা নির্ধারিত থাকবে।
৪.(ঙ) সহিংসতা, হুমকি, ভয়ভীতি ও বিদ্বেষমূলক প্রচার নিষিদ্ধ থাকবে।
ধারা ৫: প্রার্থীর যোগ্যতা
৫.প্রার্থীকে একাডেমিকভাবে সক্রিয় হতে হবে এবং সর্বনিম্ন GPA ২.৫০ থাকতে হবে।
৫.(ক) কলেজে সর্বোচ্চ বয়স ২৩, স্নাতকে ২৫ এবং স্নাতকোত্তরে ২৮ বছর।
৫.(খ) কোনো ফৌজদারি অপরাধের রেকর্ড থাকলে প্রার্থীতা বাতিলযোগ্য।
৫.(গ) বৈধ রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সদস্য হতে পারবে,তবে বেআইনি দলীয় প্রভাব নিষিদ্ধ।
ধারা ৬: নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব
৬. নির্বাচন তফসিল ঘোষণা, মনোনয়ন যাচাই, ভোটগ্রহণ, ফলাফল ঘোষণা করবে।
৬.(ক) আচরণবিধি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
৬.(খ) নির্বাচনকালীন বা পরবর্তী অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
৬.(গ) প্রশাসনের সাথে নিয়মিত সমন্বয় সাধন করবে।
ধারা ৭: আপিল ব্যবস্থা
৭.নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ৭ কার্যদিবসের মধ্যে আপিল করা যাবে।
৭.(ক) আপিল বোর্ড গঠিত হবে NSEC ও প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে।
৭.(খ)আপিল নিষ্পত্তি হবে ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে।
ধারা ৮: ছাত্রসংসদের কার্যক্রম
৮. শিক্ষার্থীদের দাবি,সমস্যা ও মতামত কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করবে।
৮.(ক)শিক্ষা,সংস্কৃতি,ক্রীড়া ও গবেষণা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করবে।
৮.(খ)যৌন হয়রানি, সহিংসতা ও বৈষম্য প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
৮.(গ)মতবিনিময়, বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক সংলাপ আয়োজন করবে।
ধারা ৯: স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
৯. বাজেট ব্যবহারে বার্ষিক নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
৯.(ক)কার্যক্রম ও ব্যয়ের বিস্তারিত প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও NSEC-এ দাখিল করতে হবে।
৯.(খ)প্রতিবেদন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকাশযোগ্য রাখতে হবে।
ধারা ১০: নিষিদ্ধ কার্যকলাপ
১০.অস্ত্র বহন, সহিংসতা, জোরপূর্বক ভোট আদায়, হুমকি,এবং ক্লাস বর্জনের হুমকি নিষিদ্ধ।
১০.(ক)ভোট কেনাবেচা বা ঘৃণামূলক প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
১০.(খ)ধর্মের নাম ব্যাবহার করা যাবেনা।
ধারা ১১: পুনঃনির্বাচন
১১. সংসদ বিলুপ্ত হলে ৬ মাসের মধ্যে পুনঃনির্বাচন হবে।
১১.(ক)জরুরি পরিস্থিতিতে অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক কমিটি অনুমোদনযোগ্য।
ধারা ১২: রাজনৈতিক অংশগ্রহণ
১২.রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের সদস্য প্রার্থী হতে পারবে।
১২.(ক) সহিংসতা বা বেআইনি হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ থাকবে।
১২.(খ) NSEC রাজনৈতিক মতামত গ্রহণ করলেও সিদ্ধান্ত নেবে নিরপেক্ষভাবে।
ধারা ১৩: শিক্ষা ও রাজনীতির ভারসাম্য
১৩.নির্বাচিত সদস্যদের ৭৫% ক্লাস উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
১৩.(ক)পরীক্ষাকালীন সময়ে দায়িত্ব পালনের অনুমতি পাওয়া যাবে।
১৩.(খ)দায়িত্বে অবহেলা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ধারা ১৪: সহিংসতায় জড়িতদের শাস্তি
১৪. সহিংসতায় প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল ও বিজয়ী হলে পদচ্যুতি।
১৪.(ক)গুরুতর ঘটনায় বহিষ্কার ও ফৌজদারি মামলা।
১৪.(খ) তদন্ত করবে NSEC ও প্রশাসনের যৌথ কমিটি।
১৪.(গ) ৭ দিনের মধ্যে আপিল এবং ১০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি।
ধারা ১৫: বেআইনি কার্যকলাপে শাস্তি
১৫.বাজেট অপব্যবহার, হুমকি, যৌন হয়রানি, সহিংসতায় জড়ালে পদচ্যুতি, অযোগ্যতা ও বহিষ্কার।
১৫.(ক) যৌথ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তদন্ত হবে।
১৫.(খ)৭ কার্যদিবসের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে।
একটি বড় প্রজন্ম শিক্ষা,নেতৃত্ব ও নৈতিক রাজনীতির চর্চা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।এই অবস্থার স্থায়ী সমাধান একমাত্র সম্ভব একটি সুষ্ঠু,নিরপেক্ষ,আইনবদ্ধ ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে।“কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন ও প্রতিনিধিত্ব আইন” প্রনয়ণ করা হলে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি হবে,সহিংসতা ও দমনমূলক আচরণ কমবে এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা ও নেতৃত্ব বিকশিত হবে দায়িত্বশীল প্রক্রিয়ায়।এই আইন ছাত্ররাজনীতিকে পুনরায় সম্মান, আস্থা ও অংশগ্রহণের জায়গায় ফিরিয়ে আনবে, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব ক্যাম্পাসেই গড়ে উঠতে পারে যুক্তি, আদর্শ ও গণতন্ত্রের ভিত্তিতে এবং শান্তিতে পরিপূর্ণ হবে ক্যাম্পাস।
লেখক: আরিফ রশিদ (শিক্ষার্থী), আইন ও বিচার বিভাগ, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট




