এয়োদশ সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই দেখা দিয়েছে ভোটের মাঠে উত্তাপ। রাজনীতিতে স্বামী সক্রিয় থাকলেও সম্পদের পাহাড় গড়েছেন স্ত্রীরা। আসন্ন নির্বাচনের হলফনামায় এমন চিত্রই ফুটে উঠেছে। প্রভাবশালী প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, তাদের স্ত্রীর নামে রয়েছে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ও অঢেল নগদ টাকা। প্রার্থীদের তুলনায় তাদের স্ত্রীরা বেশি সম্পদশালী। স্ত্রীরা কীভাবে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি অনেক প্রার্থীর হলফনামায়। সম্পদের এই বিশাল ফারাক নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মনে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল।


এদিকে, সিলেটের ছয়টি আসন থেকে ৪৭ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে ৫ জনের মনোয়নপত্র স্থগিত ও ৭ জনের বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। অবশিষ্ট ৩৫ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষিত হয়েছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এসব তথ্য জানান সিলেটের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। সিলেটে মনোয়ন স্থগিত ৫ জনের মধ্যে দুজন বিএনপির প্রার্থী। এদের একজন সিলেট-৩ আসনের প্রার্থী এম এ মালিক, অপরজন সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী ফয়সল চৌধুরী। এছাড়া সিলেট-১ আসনের এনসিপির প্রার্থী এহতেশামুল হক, সিলেট-৪ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মুজিবুর রহমান ও সিলেট-৬ আসনের গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী জাহিদুর রহমানের মনোনয়নপত্র স্থগিত করা হয়েছে।



সামার সম্পদ বেড়েছে
সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। হলফনামায় তিনি প্রায় সাড়ে ৮ একর জমির দাম দেখিয়েছেন মাত্র ২০ লাখ ১৫ হাজার ২৮২ টাকা। পাঁচ হাজার ৩৫ বর্গফুটের অ্যাপার্টমেন্টের দাম দেখিয়েছেন ৩২ লাখ ৩৩ হাজার ৭৩০ টাকা। স্ত্রী সামা হক চৌধুরীর নামে আছে ১৯ হাজার ৫৯৩ বর্গফুট বাড়ি, যার দাম দেখানো হয়েছে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ এক হাজার ২৬০ টাকা। ছয় কোটি ৮৬ লাখ ৪৪ লাখ ৮৮২ লাখ টাকার সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখানো হয়ছে ১৫ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হাজার ৮৮২ টাকা। আর স্ত্রীর নামে থাকা পাঁচ কোটি ৭৫ লাখ ১৩ হাজার ২০৭ টাকার সম্পদের বর্তমান মূল্য ছয় কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ২০৭ টাকা দেখানো হয়েছে। আরও দেখা গেছে, ২০১৮ সাল থেকে ২৩ সাল পর্যন্ত সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। ওই সময় তার বার্ষিক আয় ছিল সাত লাখ ৫৮ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে এসে তার আয় বেড়েছে ৪ গুণ। স্বশিক্ষিত আরিফের বর্তমান আয় ৩১ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ টাকায়। ৭ বছর আগে স্ত্রী সামা হক চৌধুরীর নামে স্থাবর সম্পদ ছিল না। এখন তিনি কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক। আরিফুল হক চৌধুরী যে গাড়িতে চড়েন সেটির দাম এক কোটি ৬৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৮ টাকা। অপর আরেকটি গাড়ির দাম দেখিয়েছেন ১২ লাখ টাকা। তার কাছে থাকা ১০ ভরি স্বর্ণের দাম ৩০ হাজার টাকা। আর স্ত্রীর ২৭ ভরি স্বর্ণের দাম দেখিয়েছেন এক লাখ ৯৮ হাজার ৪৫০ টাকা।


শিশির মনিরের স্ত্রীর আয় বেশি

সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শিশির মনিরের স্থাবর কোনো সম্পত্তি নেই। তবে তিনি ৫১ লাখ ৪ হাজার ৩০৪ টাকা মূল্যের অস্থাবর সম্পদের মালিক। এদিকে শিশির মনির কোটির ঘর ছুঁতে না পারলেও তার স্ত্রী সুমাইয়া সাদিয়া রায়হান একজন কোটিপতি। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ৭৭ লাখ ৪৮ হাজার ২৬৩ টাকা। পেশায় আইনজীবী শিশির মনিরের বার্ষিক আয় ৫২ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার নিজের নামে কোনো স্থাবর সম্পদ নেই। অন্যদিকে, তার স্ত্রী সুমাইয়া সাদিয়া রায়হান একজন বেসরকারি চাকুরিজীবী। শেয়ার, বন্ড ও সঞ্চয়পত্র, চাকুরি এবং অন্যান্য উৎস থেকে তার বার্ষিক আয় ৮৯ লাখ ২৭ হাজার ৫১৫ টাকা। হলফনামায় দেওয়া তথ্যে দেখা গেছে, সুমাইয়া সাদিয়া রায়হানের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯৫ লাখ ৬০ হাজার ৮৪৩ টাকা। একইসঙ্গে তিনি ১ কোটি ৮১ লাখ ৮৭ হাজার ৪২০ টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদের মালিক। অন্যদিকে, স্থাবর সম্পত্তি না থাকলেও শিশির মনিরের অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৫১ লাখ ৪ হাজার ৩০৪ টাকা। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৩০০ টাকা। তার হাতে নগদ অর্থ রয়েছে ৯ লাখ ৫২ হাজার ৪ টাকা এবং বিভিন্ন যানবাহন বাবদ তার সম্পদের মূল্য ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ৪ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক পণ্য এবং উপহার হিসেবে প্রাপ্ত ২৫ ভরি স্বর্ণসহ তাঁর অর্জনকালীন ও বর্তমান মোট অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫১ লাখ ৪ হাজার ৩০৪ টাকা। হলফনামায় শিশির মনির তার নামে দুটি মামলার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে একটি মামলা তদন্তাধীন ও অন্যটি বর্তমানে স্থগিত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।


মালিকের স্ত্রীর আছে পাউন্ড
সিলেট-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মোহাম্মদ আব্দুল মালিক। স্বশিক্ষিত হলেও তার ও স্ত্রীর নামে অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—স্ত্রীর নামে রয়েছে ৬ লাখ পাউন্ড বৈদেশিক মুদ্রা। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ‘নির্যাতিত’ সিলেট-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল মালিক। দীর্ঘ ১৯ বছর পর দেশে মালিক নির্ভার। তার বিরুদ্ধে একটিও মামলা নেই।


ইলিয়াসের স্ত্রী লুনা
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং নিখোঁজ বিএনপি নেতা ও সাবেক সাংসদ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা। সম্পদের আর্থিক মূল্যে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে আছেন বিএনপির এই প্রার্থী। তার ১ কোটি ৫০ লাখ টাকার অস্থাবর ও ৭৫ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদসহ মোট সম্পদ ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে।


মোস্তাকিম রাজার স্ত্রীর নামে সম্পদ
সম্পদের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন সিলেঠ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী। এলএলবি ডিগ্রিধারী এই ব্যবসায়ীর বার্ষিক আয় ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার বেশি। তার নিজ নামে অস্থাবর সম্পদ ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ১০ কোটি টাকা। স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের নামেও রয়েছে স্থাবর সম্পদ।


খেলাফতের প্রার্থীর স্ত্রীর নামে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ

সিলেট-৩ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী দিলওয়ার হোসাইনের ১ কোটি ৫৬ লাখ ৪৮ হাজার ৯৯২ টাকার অস্থাবর সম্পদ ও দেড়কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও রয়েছে আড়াই লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ।


জাপার আতিকের স্ত্রীও বিত্তবান

সিলেট-৩ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মোহাম্মদ আতিকুর রহমানের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে এক কোটি ১৭ লাখ ১৯ হাজার ১৬৩ টাকার। তার স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬২ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। এছাড়াও আতিকুর রহমানের নিজের নামে স্থাবর সম্পদ রয়েছে ১ কোটি ০৬ লাখ ৮৮ হাজার ৫২৫ টাকার। তার স্ত্রীর ৬৮ লাখ ৮২ হাজার ৫২৫ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।

 

সিলেটভিউ২৪ডটকম/পিটি/এসডি-৪০