মাসিক (ঋতুস্রাব) নারীর প্রজননস্বাস্থ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। সাধারণত ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে মাসিক হওয়াকে স্বাভাবিক ধরা হয়। কিন্তু অনেক সময় মাসিক দেরিতে হওয়া, আগেভাগে হয়ে যাওয়া, বা কয়েক মাস বন্ধ থাকা—এই সমস্যাগুলো দেখা যায়। এই অবস্থাকে মাসিক অনিয়ম বলা হয়। বর্তমান সময়ে এই সমস্যা অনেক নারীর মধ্যে দেখা যায় এবং এর সমাধানে ঔষধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে মনে রাখতে হবে ঔষধের মাধ্যমে মহিলাদের মাসিক নিয়মিত করার আগে এর কারণ জানা অত্যন্ত জরুরি।


মাসিক অনিয়মের পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে | এর মধ্যে অন্যতম হলো হরমোনের ভারসাম্যহীনতা | নারীদেহে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের সমন্বয় ঠিক না থাকলে মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায় | এছাড়া Polycystic Ovary Syndrome একটি সাধারণ কারণ, যেখানে ডিম্বাশয়ে ছোট ছোট সিস্ট তৈরি হয় এবং ডিম্বস্ফোটন বাধাগ্রস্ত হয় |  এর ফলে মাসিক নিয়মিত হয় না | এছাড়া থাইরয়েডের সমস্যা, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পুষ্টির অভাব, হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া,   কোষ্ঠকাঠিন্য, অনিয়মিত ঘুম —এসব কারণও মাসিকের ওপর প্রভাব ফেলে |
ঔষধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিত করার ক্ষেত্রে সাধারণত কয়েকটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় |  এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো হরমোনাল পিল বা জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি | এই বড়িগুলোতে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন থাকে, যা শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে | নিয়মিত এই পিল খেলে মাসিক একটি নির্দিষ্ট চক্রে আসে | অনেক ক্ষেত্রে এই পিলগুলো মাসিকের ব্যথা কমাতেও সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ করে |
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঔষধ হলো প্রোজেস্টেরন গ্রুপের ট্যাবলেট, যেমন Medroxyprogesterone। এই ঔষধ সাধারণত তখন ব্যবহার করা হয় যখন অনেকদিন মাসিক বন্ধ থাকে | রোগীকে কয়েকদিন এই ঔষধ খাওয়ানো হয়, এবং ঔষধ বন্ধ করার পর মাসিক শুরু হয় | এটি “withdrawal bleeding” নামে পরিচিত |  তবে এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সঠিক ডোজ ও সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা অবশ্যই গাইনি  চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয় |
যেসব নারীর Polycystic Ovary Syndrome রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রায়ই Metformin ব্যবহার করা হয় | এই ঔষধ মূলত ডায়াবেটিসের জন্য ব্যবহৃত হলেও PCOS রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমিয়ে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক করতে সাহায্য করে | এর ফলে ডিম্বস্ফোটন স্বাভাবিক হয় এবং মাসিক নিয়মিত হতে শুরু করে |
থাইরয়েড সমস্যার কারণে যদি মাসিক অনিয়ম হয়, তাহলে থাইরয়েড হরমোন নিয়ন্ত্রণের জন্য Levothyroxine ব্যবহার করা হয় | এই ঔষধ শরীরের থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি পূরণ করে এবং ধীরে ধীরে মাসিক স্বাভাবিক করে তোলে |

এছাড়া আয়রন বা ভিটামিনের অভাব থাকলে সেগুলো পূরণের জন্য সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়, রক্তস্বল্পতা থাকলেও মাসিক অনিয়ম হতে পারে।
তবে শুধু ঔষধই নয়, জীবনযাত্রার পরিবর্তনও মাসিক নিয়মিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে |  নিয়মিত ব্যায়াম শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে | অতিরিক্ত ওজন থাকলে তা কমানো এবং ওজন খুব কম হলে তা বাড়ানো দরকার | পুষ্টিকর খাবার যেমন শাকসবজি, ফলমূল, ডিম, মাছ, দুধ,  পর্যাপ্ত পানি ইত্যাদি খাওয়া উচিত |
 পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোও খুবই গুরুত্বপূর্ণ |
ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। অনেকেই ফার্মেসি থেকে নিজের মতো করে ঔষধ কিনে খেয়ে ফেলেন, যা খুবই বিপজ্জনক হতে পারে। ভুল ঔষধ বা ভুল ডোজ গ্রহণ করলে হরমোনের সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব, অতিরিক্ত রক্তপাত, বা অন্যান্য জটিলতা দেখা দিতে পারে |
এছাড়া মাসিক বন্ধ থাকলে প্রথমেই নিশ্চিত হতে হবে যে রোগী গর্ভবতী কিনা | অনেক সময় গর্ভধারণের কারণে মাসিক বন্ধ থাকে, কিন্তু তা বুঝতে না পেরে ঔষধ খেলে ক্ষতি হতে পারে | তাই যেকোনো ঔষধ শুরু করার আগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি |
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা কার্যকর নয় | একজনের জন্য যে ঔষধ কাজ করে, অন্যজনের ক্ষেত্রে তা কাজ নাও করতে পারে | তাই ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা নির্ধারণ করা উচিত। একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ রোগীর ইতিহাস, শারীরিক অবস্থা এবং পরীক্ষার ফলাফল দেখে সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণ করেন।
সবশেষে বলা যায়, ঔষধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিত করা সম্ভব, তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সমস্যার কারণের উপর | সঠিক রোগ নির্ণয়, উপযুক্ত ঔষধ নির্বাচন এবং নিয়মিত ফলোআপ—এই তিনটি বিষয় একসাথে থাকলে ভালো ফল পাওয়া যায় | এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে মাসিক নিয়মিত রাখা সম্ভব |
অতএব, মাসিক অনিয়মিত হলে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন হওয়া জরুরি | সঠিক তথ্য জানা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ গ্রহণ করলে এই সমস্যা সহজেই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।

এসএমসি ব্লুস্টার সেবা কেন্দ্র,  ঘরের কাছেই মনের মত সেবা।
 


লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য) এসএমসির ব্লু স্টার স্বাস্থ্য সেবা দানকারী। Marie  Stopes , বাংলাদেশ হতে ঔষধের মাধ্যমে মহিলাদের মাসিক নিয়মিতকরণে বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত।