মানসিক রোগ এখন আর শহরকেন্দ্রিক কোনো সমস্যা নয় গ্রামবাংলাতেও দিন দিন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে | এর মধ্যে Schizophrenia একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ, যা রোগীর চিন্তা, আচরণ, আবেগ ও বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে | গ্রামীণ সমাজে এখনো এই রোগ নিয়ে রয়েছে নানা ভুল ধারণা, ভয় ও কুসংস্কার | অনেকেই এটিকে জিন-ভূত, যাদু-টোনা বা “পাগলামি” মনে করেন | ফলে রোগীরা প্রাথমিক পর্যায়েই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন |


একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য  চিকিৎসক হিসেবে আমাদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ |  কারণ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ প্রথমে কমিউনিটি ক্লিনিক, ফার্মেসি বা প্রাথমিক স্বাস্থ্য  চিকিৎসকের কাছেই আসে | তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা, রোগী ও পরিবারকে সচেতন করা এবং সময়মতো রেফার করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব |


???? সিজোফ্রেনিয়া কী?

সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ, যেখানে রোগীর বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা ব্যাহত হয় | রোগী অনেক সময় অদৃশ্য শব্দ শুনতে পারে, অযৌক্তিক সন্দেহ করতে পারে অথবা আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখাতে পারে | সাধারণত কৈশোরের শেষভাগ বা তরুণ বয়সে এই রোগ শুরু হয় |


 রোগের সাধারণ লক্ষণ
গ্রাম পর্যায়ে নিচের লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হতে হবে
অকারণে অতিরিক্ত সন্দেহ করা

অদৃশ্য কণ্ঠস্বর শোনা

এলোমেলো কথা বলা

একা একা কথা বলা বা হাসা

মানুষের সাথে মিশতে না চাওয়া

আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন

অতিরিক্ত রাগ বা উত্তেজনা

কাজকর্মে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা

অনেক পরিবার প্রথমদিকে এসব লক্ষণ গুরুত্ব দেয় না | ফলে রোগ ধীরে ধীরে জটিল হয়ে ওঠে |

 প্রাথমিক স্বাস্থ্য চিকিৎসক  করণীয়
 ১. রোগী পর্যবেক্ষণ ও ইতিহাস গ্রহণ
প্রথমে রোগীর আচরণ ও কথাবার্তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে | পরিবারের কাছ থেকে জানতে হবে
কতদিন ধরে সমস্যা চলছে
রোগী ঘুমায় কি না
ওষুধ খাচ্ছে কি না
আত্মহানির ঝুঁকি আছে কি না

 ২. রোগী ও পরিবারকে কাউন্সেলিং
পরিবারকে বুঝাতে হবে
এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য মানসিক রোগ
রোগীকে অপমান বা মারধর করা যাবে না
নিয়মিত চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
রোগীকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করা ভালো

 ৩. মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া ওষুধ গ্রহণ নিশ্চিত করা
বেশিরভাগ রোগী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের দেওয়া ওষুধ নিয়মিত খেলে ভালো থাকে | কিন্তু অনেক সময় কিছুটা সুস্থ হলেই ওষুধ বন্ধ করে দেয় |


প্রাথমিক চিকিৎসকের দায়িত্ব
নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো
নিজেরা ডোজ পরিবর্তন না করা

 জরুরি রেফারাল লক্ষণ

নিচের পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত উপজেলা বা জেলা হাসপাতালে পাঠাতে হবে
আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা
অতিরিক্ত সহিংস আচরণ
বাস্তবতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলা
খাবার ও ঘুম বন্ধ হয়ে যাওয়া
হঠাৎ অবস্থার দ্রুত অবনতি |


পরিবারের ভূমিকা
সিজোফ্রেনিয়া রোগীর চিকিৎসায় পরিবারই সবচেয়ে বড় সহায়ক |
রোগীর সাথে শান্ত আচরণ করতে হবে
নিয়মিত ওষুধ খাওয়াতে হবে
রোগীকে ভয় দেখানো যাবে না
পরিবারকে ধৈর্যশীল হতে হবে |

সামাজিক সচেতনতার গুরুত্ব

গ্রামীণ সমাজে এখনো মানসিক রোগ নিয়ে লজ্জা ও কুসংস্কার রয়েছে | একজন প্রাথমিক স্বাস্থ্য  চিকিৎসক হিসেবে আমাদের উচিত
মানুষকে সচেতন করা
মানসিক রোগকে সাধারণ রোগ হিসেবে উপস্থাপন করা
ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করা |

সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি কিন্তু চিকিৎসাযোগ্য মানসিক রোগ | গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসকই রোগীর প্রথম আশ্রয়স্থল | সঠিক পর্যবেক্ষণ, পারিবারিক কাউন্সেলিং, নিয়মিত ফলোআপ এবং সময়মতো রেফারালের মাধ্যমে একজন রোগীর জীবন অনেকটাই স্বাভাবিক করা সম্ভব |
 মনে রাখতে হবে
“মানসিক রোগ লুকিয়ে নয়, চিকিৎসার মাধ্যমেই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।”

লেখক: মনজুরুল মাআবুদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ (পুষ্টি ও স্বাস্থ্য), এসএমসি ব্লুস্টার স্বাস্থ্য সেবা দান।