ছবি: সিলেট ভিউ গ্রাফিক্স ও এআই।
সিলেটে দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার বিস্তার। মহানগরী থেকে শুরু গ্রাম পর্যন্ত কোথাও বাদ পড়েনি এই আসক্তিতে। মহানগরীর বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, রাস্তার মোড় ও আড্ডাস্থলে প্রকাশ্যে আবার গোপনেও চলছে এই ভাসমান জুয়ার আসর। সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত দেদারসে চলে এই লুটতরাজের খেলা। একই সঙ্গে মোবাইলফোন ভিত্তিক বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার অ্যাপস সহজলভ্য হওয়ায় কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ, মধ্যবয়সী এমনকি বৃদ্ধদের মধ্যেও বাড়ছে জুয়ার আসক্তি।
জানা যায়, অল্প সময়ে বেশি লাভের আশায় প্রতিদিনই বাড়ছে জুয়াড়ির সংখ্যা। অনেকেই প্রথমে কৌতূহলবশত শুরু করলেও পরবর্তীতে সেই খেলা মারাত্মক নেশায় রূপ নিচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবারগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধও বাড়ছে। জুয়ার কারণে অনেকেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। প্রথমে সামান্য টাকা দিয়ে শুরু করলেও পরবর্তীতে বড় অঙ্কের অর্থ হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়ে সর্বহারা হচ্ছেন। আর তাইতো সংসারে অশান্তি, ঋণের বোঝা, পারিবারিক কলহ এবং সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলেছে। কেউ কেউ স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করছেন, কেউ বাড়িঘর বন্ধক রাখছেন, আবার কেউ সুদে টাকা এনে জুয়ার পেছনে বিনিয়োগ করছেন। দ্রুত লাভের আশায় শুরু করা এই খেলা এখন অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার বিস্তারের কারণে সমাজে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জুয়ার আসক্তির সঙ্গে সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি ও ডাকাতির মতো অপরাধও বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে মাদক সেবন ও মাদক ব্যবসার বিস্তারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। ফলে সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণতা দিন দিন আরও জটিল আকার ধারণ করছে। আর এসব অপরাধের সঙ্গে জুয়ার অর্থ জোগানের সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, জুয়ার নেশা পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই সুদে টাকা ধার করছেন। আবার কেউ কেউ সর্বস্ব হারিয়ে অপরাধের পথেও পা বাড়াচ্ছেন। সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত অসাধু সুদের কারবারিরা নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে ঋণগ্রহীতাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার অ্যাপস ইনস্টল করে দিচ্ছেন। পরে জুয়ার মাধ্যমে দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের আরও বেশি অর্থ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এতে সহজেই নতুন খেলোয়াড় তৈরি হচ্ছে এবং জুয়ার জাল আরও বিস্তৃত হচ্ছে ঠিক তেমনি অনেক পরিবার ঋণ ও জুয়ার দ্বৈত ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
আখতার হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী জানান, ‘প্রথমে বন্ধুদের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার একটি অ্যাপ ব্যবহার শুরু করি। কয়েকবার সামান্য লাভ হওয়ায় মনে হয়েছিল সহজেই টাকা আয় করা যাবে। পরে ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের টাকা হারাতে থাকি। এক পর্যায়ে ব্যবসার মূলধনের একটি অংশও হারিয়ে ফেলি। এখন ঋণের বোঝা নিয়ে চলতে হচ্ছে।’
মূসা আলী নামের এক যুবক বলেন, ‘আমি প্রায় দুই বছর জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলাম। শুরুতে কয়েক হাজার টাকা দিয়ে খেলা শুরু করলেও পরে লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ হয়ে গেছে। এখন বুঝতে পারছি এটি শুধু একটি খেলা নয়, এটি একটি ভয়ংকর আসক্তি।’
ফাহিমা নামের এক গৃহবধূ বলেন, ‘আমার স্বামী অনলাইন জুয়ার কারণে ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। সংসারের বাজার খরচের টাকা পর্যন্ত জুয়ায় হারিয়েছেন। এ নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হচ্ছে। জুয়ার টাকা দিতে আমার স্বামী আমার স্বর্ণের গহনা পর্যন্ত বিক্রি করেন। আমার সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কায় আছি। আমরা চাই প্রশাসন এসবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা করেন।’
সজিব নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে মজা করে বিভিন্ন স্থানে বসে ছোট ছোট বাজি ধরে খেলতাম। কয়েকবার লাভও হয়েছিল। পরে বেশি লাভের আশায় আমরা বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে খেলা শুরু করি। একসময় হারাতে হারাতে ধার-দেনা করে খেলতে থাকি। এতো হারার পরও এই সব ফিরে আসবে এমন আশায় প্রতিনিয়তই এই খেলায় মেতে থাকি। এখন প্রায় তিন লাখ টাকার ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পরিবার-পরিজনের কাছে ছোট হয়ে গেছি।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, ‘জুয়া এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। অনলাইন ও অফলাইন জুয়ার বিস্তার বর্তমানে একটি গুরুতর সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে জুয়ার আসক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সহজলভ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে এই অপসংস্কৃতি দ্রুত সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আমাদের আগামী প্রজন্ম আরও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে। এ অবস্থা মোকাবিলায় পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এডিসি মিডিয়া মো. মনজুরুল আলম বলেন, ‘অফলাইন ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের আটক করা হচ্ছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কেউ যদি কোথাও জুয়ার আসর কিংবা অনলাইন জুয়ার কার্যক্রমের তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবগত করার জন্য আহ্বান করেন তিনি।’
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ এহিয়া




