ছবি: সংগৃহিত
সিলেট মহানগরীর ইলেক্ট্রিসাপ্লাই এলাকার একটি কমিউনিটি সেন্টার। সারাবছর বিয়ের অনুষ্ঠানাদি লেগেই থাকে। তবে শুক্রবার এলেই সেন্টার কর্তৃপক্ষের সাথে সাথে গোটা এলাকাবাসীর মধ্যে কিছুটা চাপা উত্তেজনা বিরাজ করতে শুরু করে। কেউ কেউ হয়ে উঠেন কৌতুহলী। আর তা হিজড়াদের নিয়ে। তারা কখন এসে কি আচরণ করে, এ নিয়ে প্রচন্ড দ্বিধাদ্বন্দ্ব আর আতঙ্ক নিয়েই সময় কাটে কনেপক্ষ, বরপক্ষ এমনকি সেন্টারপক্ষেরও।
সিলেটে বিয়ের অনুষ্ঠানে হিজড়াদের হানা দেওয়া নতুন কিছু নয়। অনেক পুরানো এবং দিনে দিনে তাদের উৎপাত বাড়ছেতো বাড়ছেই। তারা ৫ থেকে ১০ জন একত্রিত হয়ে বিয়ের সেন্টারগুলো বা বরযাত্রীদের গাড়ির গতিরোধ মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ে এমনসব আচরণ করে যা খুবই বিব্রতকর। যন্ত্রনায় অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের বাজেট কর্তন করে হলেও ৫ হাজার থেকে ২০/২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত তাদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন বর বা কনেপক্ষ।
শুধু কমিউিনিটি সেন্টারই নয়, নগরীর বাইরেও সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক, সিলেট-জৈন্তাপুর সড়ক, সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ, সিলেট- জৈন্তাপুর বা সিলেট-গোয়াইনঘাট সড়কসহ বিভিন্ন সড়কে তারা ওঁৎ পেতে বসে থাকে। বরযাত্রীর গাড়িবহর দেখলেই তারা নেমে পড়ে রাস্তায়। তারপর যা করে তা আসলে বর্ণনাযোগ্য নয়। এমনিক, কখনো কখনো অর্থ আদায়ে তারা শিশু বয়স্ক ও নারীদের সামনেই তালি বাজাতে বাজাতে গায়ের বসন খুলতে শুরু করে। মোটামুটি তাদের কারণে, বিয়ের মতো একটি শুভকাজ বিষাদে পরিণত হয়।
এতো গেল বিয়ের সেন্টারের খবর। রাস্তার ফল বিক্রেতা থেকে শুরু করে দোকানে দোকানে তারা দলবেঁধে হানা দিয়ে ‘ছল্লা’ তুলে। মানে, পেঁয়াজ মরিচ রসুন থেকে শুরু করে মাছ-মাংসের দোকানে গিয়ে এসব তুলে নেয়, কখনো নিজ হাতে কখনোবা মালিকপক্ষই তুলে দিতে বাধ্য হন। সিলেটে হিজড়াদের এই উৎপাত বন্ধের কোনো উপায় না দেখে অসহায় বোধ করছেন সাধারণ মানুষ।
তবে সচেতন মহল মনে করছেন, যতক্ষণ তাদের নিরাপদ বাসস্থান আর বেঁচে থাকার জন্য অন্নসংস্থানের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাচ্ছেনা, ততক্ষণ এই যন্ত্রণায় ভোগতে হবে শুধু সিলেটবাসীকে নয়, সমাজের সব মানুষকে।
হিজড়াদের নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে, জন্মগতভাবে হরমোনজনিত কারণে ছেলেরা যখন মেয়েলি আচরণ করে বা মেয়েরা ছেলেদের মতো আচরণ করে বা অন্যান্য শারীরিক ত্রুটি নিয়ে যারা জন্মায়- তাদেরকে আমরা সমাজে বা পরিবারে ধরে রাখতে পারিনা। কুসংস্কারের কারণে বা সমাজের স্বাভাবিক মানুষের অব্যাহত ব্যাংবিদ্রুপে অতিষ্ঠ হয়ে তারা একসময় হিজড়া জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে যেতে বাধ্য হয়। এরপরই একসময় বেঁচে থাকার প্রয়োজনে নানান অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। তাই তাদের ঘরে রাখতে বা সমাজের মূল স্রোতে ধরে রাখার ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আর যারা ‘হিজড়া সংস্কৃতি’তে অব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাদের জন্য সরকারিভাবে হোক আর সামাজিকভাবে হোক- কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত সমাজকে তাদের উৎপাত সইতে হবে।
এ প্রসঙ্গে হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা একটি এনজিওর কর্মকর্তা মশিউর রহমান বলেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশে হিজড়ারা স্বাভাবিকভাবেই জীবন যাপন করে। তাদের নিয়ে ব্যক্তি বা সমাজের কোনো বাড়তি মাথা ব্যথা নেই। তারা আর ১০টা মানুষের মতই স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। কিন্তু আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ছল্লা তোলা বা বিয়ের আসরে গিয়ে চাঁদা চাওয়ার বিকল্প কোনো উপায় নেই। সেই বিকল্পের ব্যবস্থা সমাজকেই করে দিতে হবে। দায়িত্বটা রাষ্ট্রকে নিতে হবে।
এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেটের জেলা প্রশাসক যা বলেছেন, এতে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন সিলেট অঞ্চলের হিজড়ারাসহ সচেতন মহল।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম তার বক্তব্যে আশ্বাস দিয়েছেন, হিজড়াদের আবাসন সমস্যা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে তিনি কাজ করবেন।
তিনি বলেন, সিলেট জেলায় কতজন হিজড়া আছে তার একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিলে তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
আর কর্মসংস্থানের ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসকের বক্তব্য হচ্ছে, কার কি যোগ্যতা ও কে কি কাজে পারদর্শী বা আগ্রহী তার একটি তালিকা তৈরি করে তার কাছে জমা দেওয়া হলে সে অনুয়ায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবেন তিনি।
তার এমন বক্তব্যে সিলেটের প্রকৃত হিজড়ারা আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন। তাদের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি উপাও দেখতে শুরু করেছেন সচেতন সিলেটবাসী।
তবে এরমধ্যেও কথা থাকে। কেবল সরকার আর জেলা প্রশাসকের উদ্যোগই এ সমস্যা সমাধানে যথেষ্ঠ নয়। কাজ করতে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে সমাজের সবাই মিলে। দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, আর ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা নিজোেদর প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতানুযায়ী কাজ দিলে একসময় তারা আর ‘ছল্লা’ তুলতে বা বর কনের গাড়ি থামিয়ে চাঁদাবাজী করতে যাবেনা।
মুক্তির পথ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও কর্মসংস্থান।
সিলেটভিউ২৪ডটকম/ইকে




