মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে গত রবিবার প্রত্যাহার করায় হইচই শুরু হয়েছে। অনেকে তাঁর প্রত্যাহারাদেশ বাতিল করে সিলেটের জেলা প্রশাসক পদে রাখতে রাজপথে নেমে পড়েছেন। অপরদিকে অনেকে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন।


সিলেটের ডিসিকে নিয়ে মাতামাতি এবারই প্রথম নয়। ৪৬ বছর আগে সিলেটের তৎকালীন ডিসি মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহকে নিয়েও এমন অবস্থা হয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৭৯ সালের ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত সিলেটের ডিসি ছিলেন। অর্থাৎ, বর্তমান সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলা নিয়ে সিলেট জেলা ছিল। জেদি, একরোখা ও ড্যামকেয়ার মনোভাবের সেই ডিসি সিলেটে অবকাঠামোগত বেশ উন্নয়ন করেছিলেন। সিলেট শহরে ফুটপাত তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয়। জিন্দাবাজারে প্রবাসীদের কল্যাণার্থে তাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় 'ওভারসিজ সেন্টার।' তিনি সিলেট থেকে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও প্রকাশ করিয়েছিলেন।  কিন্তু হঠকারিতামূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি নিন্দাও কুড়িয়েছিলেন। তিনি হাইকোর্টের নির্দেশেরও পরোয়া করতেন না। দেশে সেসময় সামরিক আইন চালু থাকায় প্রকাশ্যে কেউ তাঁর সমালোচনা-বিরোধিতা করতেন না। তাঁকে আড়ালে-আবডালে বলা হতো 'পাগলা ডিসি।' সেই ডিসি সিলেট ও সিলেটের বড়ো 'সাং' মেরে গিয়েছেন। এজন্য সিলেট ও সিলেটিদের অনন্তকাল ভুগতে হবে।

মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ সিলেট এসে দেখতে পেলেন, সিলেটের বিভিন্ন স্থানে আবাদযোগ্য অনেক জমি পড়ে আছে, চাষাবাদ করা হচ্ছে না। কারণ এসব জমির অধিকাংশ খাসজমি আর কিছু অর্পিত সম্পত্তি। এসব জমি আবাদ করার জন্য তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্টে জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুকরণে পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের জমিজমা দিয়ে স্থায়ী বসতির ব্যবস্থা করে দেন। বিভিন্ন জেলার ভূমিহীন লোকেরা সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করে। সিলেটের তখনকার ডিসি ফয়জুল্লাহ এই নীতি গ্রহণ করেন। সিলেটের অনাবাদি খাসজমি বিভিন্ন জেলার ভূমিহীন কৃষকদের স্থায়ী বন্দোবস্ত দেওয়া শুরু হয়। বিশেষত নোয়াখালী, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকজন দলে দলে আসতে শুরু করে। ফয়জুল্লাহর বাড়ি ছিল নোয়াখালীতে। জমির জন্য আবেদন দাখিলের পর দ্রুতগতিতে তা মঞ্জুর করা হয়। তৎকালীন সিলেট জেলার চার মহকুমায়ই বিভিন্ন জেলার লোকেরা খাসজমি বরাদ্দ পান। তবে সিলেট সদর মহকুমার গোয়াইনঘাট, সুনামগঞ্জ মহকুমার তাহিরপুর, জামালাগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও ছাতক থানায় এবং মৌলভীবাজার মহকুমার কিছু এলাকায় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত লোক বসতি স্থাপন করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিশ্বম্ভরপুর নামে নতুন একটি থানাও (১৯৭৯) প্রতিষ্ঠা করতে হয়।

যারা তখন সিলেট এসে বসবাস শুরু করেছিলেন, বর্তমানে তাদের দ্বিতীয়-তৃতীয় প্রজন্ম চলছে। সিলেটি ভাষায় তারা কথা বলে, অনেকে আদি সিলেটিদের সাথে আত্মীয়তাও করেছে। জন্মগতভাবে তারা সিলেটি, কথাও বলে সিলেটি ভাষায় এবং সিলেটে তাদের বাড়ি ও ভূসম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও তারা আসল তথা বংশানুক্রমিক সিলেটি নয়। তাদের চালচলন সিলেটি সংস্কৃতি ও আচার-আচরণ থেকে ভিন্ন। তাদেরকে 'আবাদি' বলা হয়। তারা কোনো কোনো এলাকায় আদি সিলেটিদের চেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ।

মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ ডিসি থাকাকালে এভাবে সিলেট ও সিলেটিদের 'সাং মারা' বা ক্ষতি করা সত্ত্বেও তাঁর স্তাবক ছিল অনেক। প্রায় তিন বছর সিলেটের ডিসি থাকার পর স্বাভাবিক নিয়মে বদলি হওয়ায় তাঁকে চলে যেতে হয়। সেসময় তাঁর মোসাহেবরা হায় হায় শুরু করেছিল। এমনকি তাঁকে আরও তিন বছর সিলেটের ডিসি রাখার দাবিও করা হয়েছিল। তাদের হাউকাউয়ে মনে হয়েছিল, ফয়জুল্লাহ যেন মহাপুরুষ এবং তিনি সারা জীবন যেন সিলেটের ডিসি থাকেন।


 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক